জীবনীপ্রযুক্তি

ইলিয়াস কাঞ্চনঃ বাংলা চলচ্চিত্রের সুপারস্টার

বাংলা চলচ্চিত্রের ভক্তদের কাছে ইলিয়াস কাঞ্চন অত্যান্ত পরিচিত একটি নাম। নব্বইয়ের দশকের একজন জনপ্রিয় চলচ্চিত্র অভিনেতা তিনি। তাকে বাংলা চলচ্চিত্রের সুপারস্টার, চির সবুজ নায়ক হিসেবে অভিহিত করা হয়। শুধু অভিনেতা নয়, একজন সমাজসেবক হিসেবেও ব্যাপক জনপ্রিয় এই ব্যাক্তি।

ইলিয়াস কাঞ্চন ১৯৫৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর, কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার আশুতিয়াপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পারিবারিক নাম ইদ্রিস আলী। তার বাবার নাম হাজি আব্দুল আলী এবং মা সরুফা খাতুন। ১৯৭৫ সালে, কবি নজরুল সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন ইলিয়াস কাঞ্চন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান থেকে স্নাতক শুরু করলেও এই পাট চুকাতে পারেননি।

চলচ্চিত্রে ইলিয়াস কাঞ্চনের আবির্ভাব হয়েছিলো অনেকটা নাটকীয় ভাবেই। ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি দুর্বলতা ছিল তার, সেই হিসেবে কিছু নাট্য সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি। ১৯৭৬ সালে, পুরান ঢাকায় অবস্থানকালে ওয়াপদা মিলনায়তনে একটি মঞ্চনাটকে কাজ করেন তিনি। সেই মঞ্চনাটকের অতিথি ছিলেন সুভাষ দত্ত। নাটকটি দেখার পর সুভাষ দত্ত কাঞ্চনকে তার সাথে দেখা করতে বলেন এবং সাহিত্যিক আলাউদ্দিন আল আজাদের তেইশ নম্বর তৈলচিত্র উপন্যাস অবলম্বনে ‘বসুন্ধরা’ (১৯৭৭) চলচ্চিত্রের পাণ্ডুলিপি দেন। এটি ছিল তার অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র। ছবিটিতে তার বিপরীতে অভিনয় করেন ববিতা। 

সেই শুরু… এরপর কেটে গেছে প্রায় চার দশক। ৩০০ টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের অফুরন্ত ভালোবাসা কুড়িয়েছেন তিনি। ছড়িয়েছেন প্রাণবন্ত অভিনয়ের বর্ণচ্ছটা। রোমান্টিক, সামাজিক, অ্যাকশন, এমনকি কমেডি চরিত্রেও তার অভিনয়ের কোন জুড়ি ছিল না। বিশেষ করে নিম্ন মধ্যবিত্ত পারিবারিক টানাপোড়েনে বিদ্ধ সংগ্রামী পুরুষ চরিত্রে তার পর্দা কাঁপানো অভিনয় ছিল অভিভূত করার মতো। 

এ সময়ে তার আরও কিছু চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো শেষ উত্তর, নালিশ, অভিযান। ১৯৮৪ সালে, রাজ্জাক পরিচালিত ‘অভিযান’ ছায়াছবিতে রাজ্জাক ও জসিমের পাশাপাশি তার অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করে। ১৯৮৬ সালে, আলমগীর কবির পরিচালিত ”পরিণীতা চলচ্চিত্রে অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি। এতে তার বিপরীতে অভিনয় করেন অঞ্জনা রহমান। ১৯৮৭ সালে, মুক্তি পায় কাজী হায়াত পরিচালিত ”দায়ী কে? চলচ্চিত্রটি। যেখানে তার বিপরীতে প্রথমবারের মত অভিনয় করেন অঞ্জু ঘোষ।

ইলিয়াস কাঞ্চনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বছর ছিল ১৯৮৮ সাল, সেইসাথে ১৯৮৯ সালের কথাও বলতে হয়। কারণ ১৯৮৯ সালে, বাংলা চলচ্চিত্রে ঘটে যায় এক অবিস্মরণীয় ঘটনা, এই সালের ১ জুন মুক্তি পাওয়া ‘বেদের মেয়ে জোছনা’ দেশের চলচ্চিত্রের ব্যবসায়ের হিসেব-নিকেশ পাল্টে দিয়েছিল। তুমুল জনপ্রিয় এ ছবিটি এখনও দেশের সব্বোর্চ আয়ের রের্কড হয়ে আছে। তোজাম্মেল হক বকুলের পরিচালনায় সহশিল্পী অঞ্জু ঘোষকে নিয়ে ছবিটির এমন সফলতা বাংলা চলচ্চিত্র জগতে বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। এছাড়াও ‘জীবন বাজী’, ‘বিধাতা’, ‘শিকার’, ‘গৌরব’, ‘দুর্নাম’, ‘নিকাহ’, ‘এক দুই তিন’, ‘ছেলে কার’, ‘খুনী’, ‘শর্ত’, ‘সহধর্মিনী’র মতো ছবিগুলোও ছিল একই বছরের তালিকায়।

অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র প্রযোজনাও করেছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। ১৯৯২ সালে, ‘মাটির কসম’ দিয়ে যাত্রা করে তার চলচ্চিত্র, যেখানে পরিচালক ছিলেন কামারুজ্জামান। পরবর্তীতে ‘বেনাম বাদশা’, ‘খুনী আসামী’, ‘শেষ রক্ষা’সহ কয়েকটি ছবি প্রযোজনা করেন তিনি। এছাড়াও ২০০৮ সালে, প্রযোজনার পাশাপাশি ‘বাবা আমার বাবা’ ও ‘মায়ের স্বপ্ন’ দুটি চলচ্চিত্র পরিচালনাও করেন। তিনি একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও বাচসাস পুরস্কার অর্জন করেন।

১৯৭৯ সালে, জাহানারা কাঞ্চনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন ইলিয়াস কাঞ্চন। এই দম্পতির ঘরে জন্ম নেয় একটি পুত্র এবং একটি কন্যা সন্তান। তার স্ত্রী ১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর, বান্দরবানে ইলিয়াসের চলচ্চিত্রের দৃশ্যায়ন দেখতে যাওয়ার পথে চট্টগ্রামের অদূরে চন্দনাইশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন। 

পরবর্তীতে চলচ্চিত্র অভিনেত্রী পারভীন সুলতানা দিতি কে বিয়ে করেন তিনি। যদিও তাদের সম্পর্ক বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।এছাড়াও ইলিয়াস কাঞ্চন সামাজিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছেন। তার প্রথম স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চনের মৃত্যুর পর তিনি নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন গড়ে তুলেন। তার স্ত্রীর মৃত্যুর পর ২২ অক্টোবর কে ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

১৯৯৩ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে “নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ জীবন” শ্লোগানে দীর্ঘদিন কাজ করে যাচ্ছেন তার প্রতিষ্ঠিত নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)। নিসচা আন্দোলন বাংলাদেশে ব্যাপক ভাবে পরিচিতি লাভ করে এবং এর সাথে বিভিন্ন মহল একাত্মতা ঘোষণা করেছে। তিনি বর্তমানে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও প্রধান কান্ডারী।

বাংলাদেশের সড়কে চার লেন তৈরি, সড়কে ডিভাইডার তৈরি, মহাসড়ক থেকে নসিমন-করিমন উঠিয়ে নেওয়া, প্রতিবছর নিরাপদ সড়ক দিবস পালন ইত্যাদিতে তিনি ও তার সংগঠন মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

২০১৫ সালের ৪ মে, জাতিসংঘের ‘রোড সেফটি ফর আওয়ার চিলড্রেন’ কর্মসূচিতে অংশ নেন ইলিয়াস কাঞ্চন। রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল, খিলগাঁও, কাকরাইল, উত্তরা ও ধানমন্ডির পাঁচটি স্কুলের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিয়ে এই কার্যক্রম চলে। এর স্লোগান- “ভবিষ্যতের জন্য নিরাপদ সড়ক চাই”। সংগঠনের কর্মকাণ্ড জাতিসংঘেও প্রশংসিত হয়।

সমাজসেবায় তার এই অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০১৭ সালে তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করে।

ইলিয়াস কাঞ্চন জানান, তিনি চলচ্চিত্রে এসেছিলেন জীবনকে দেখার জন্য। ভেবেছিলেন, অভিনেতা হলে চরিত্রগুলোকে উপভোগ করতে পারবেন। ডাক্তার বা অন্য কিছু হলে একটাই হতেন। কিন্তু অভিনেতারা সব চরিত্রে থাকতে পারে। তিনি এটা চেয়েছিলেন মনে প্রাণে। সেই অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চনের জীবনের গতিপথ পরিবর্তন হয়ে গেলো ১৯৯৩ সালের সেই দুর্ঘটনায়।

সেইসাথে অভিনেতা ইলিয়াস হয়ে গেলেন বাংলাদেশের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্বে।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button