জানা-অজানা

কেয়া কসমেটিকস এর আদ্যোপান্ত

দেশের কসমেটিকস ও টয়লেট্রিজ জগতে অন্যতম জনপ্রিয় এবং স্বনামধন্য একটি প্রতিষ্ঠান কেয়া কসমেটিকস লিমিটেড। ইত্যাদির টাইটেল স্পন্সরশিপের মাধ্যমে কেয়া কসমেটিকস শক্তিশালী ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরী করে মূলত বাঙালির প্রতি ঘরে পরিচিত হয়ে উঠে। এছাড়া কেয়া সুপার বিউটি সোপ, কেয়া লন্ড্রি সাবান, কেয়া লিপজেলের তৎকালীন সুপারস্টার নোবেল ও মৌয়ের আকর্ষনীয় জিঙ্গেলের বিজ্ঞাপনগুলোও ছিল তাক লাগানোর মত। আর ফলস্বরূপ কেয়া কসমেটিকস তুলনামূলক কম সময়েই কসমেটিকস ইন্ডাস্ট্রিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল এবং প্রায় পনের শতাংশ মার্কেট শেয়ার দখল করেছিল। বলতে গেলে সমসাময়িক অন্য সব কসমেটিকস ব্র্যান্ডের মধ্যে মোটামোটি শীর্ষ অবস্থান দখল করে নিয়েছিল।

কিন্তু আজ কোথায় সেই কেয়া কসমেটিকস? প্রতিষ্ঠানটি ২০০৯ সাল পর্যন্ত দাপটের সঙ্গে ব্যবসায় করলেও এই শিল্পে ধীরে ধীরে তার মার্কেট শেয়ার এবং গ্রহণযোগ্যতা হারাতে থাকে। স্থানীয় বিপণন ও পণ্য স্বল্পতার কারণে ২০১৬ সাল পর্যন্ত কোম্পানিটির লোকাল বিক্রয়ের পরিমাণ ছিল বেশ অসন্তোষজনক।

কিন্তু কেনো!

এর  উত্তর জানতে আমদের যেতে হবে অনেকটাই পিছনে। ১৯৮৩ সালে, কেয়া গ্রুপের শুরু হয় বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল খালেক পাঠানের হাত ধরে, যা ছিল তৎকালীন খালেক এন্ড কোং। ইটের ব্যবসায়ের মাধ্যমে যাত্রা শুরু হলেও ১৯৯৬ সালে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রতিষ্ঠানটির সিস্টার কন্সার্ন হিসেবে কেয়া কসমেটিকসের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৯৭ সালে, এ কেয়া কসমেটিকস বিউটি সোপ প্রোডাকশনের মাধ্যমে কমার্শিয়ালি যাত্রা শুরু করে এবং মূল কোম্পানি খালেক এন্ড কোং নাম পরিবর্তন করে “কেয়া গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিস” হয়ে যায়। 

কেয়া গ্রুপ চারটি সাব-ডিভিশনে তাদের কাজ পরিচালনা করতে থাকে। ১৯৯৯ থেকে ২০০৮ সালে, এই চারটি সেক্টরে ব্যবসায় বিস্তার করতে করতে কেয়া গ্রুপ এগিয়ে চলে। এর মধ্যে ১৯৯৯ সালে কেয়া কসমেটিকস “পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০০১ সালে কেয়া গ্রুপ শেয়ার বাজারে অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০১৫ সালে এই সব কোম্পানিকে কেয়া কসমেটিকস অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

কেয়ার পোর্টফোলিও তে প্রথমেই আসে কেয়া সুপার বিউটি সোপের কথা। এছাড়াও কেয়া লেমন বিউটি সোপ, হারবাল বিউটি সোপ, বল সাবান, ডিটারজেন্ট এর ক্ষেত্রে কেয়া ফ্রেগ্রেন্স এবং সাইজে ভিন্নতা এনে সমসাময়িক বাজারে বেশ খ্যাতি অর্জন করে। ২০০৪ সালে, সাবানের কাচামাল উৎপাদনের “ব্যাক ওয়ার্ড লিংকেজ কোম্পানি” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় কেয়া সোপ ক্যামিকেলস লিমিটেড। এছাড়াও, এটি তখন সাবান উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল সোপ নুডলস তৈরি করে দেশে অন্য সাবান উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে বিক্রি করত।

এভাবে ১৯৯৯ থেকে ২০০৯ সালে কেয়া কসমেটিকস মার্কেটে বেশ ভালো অবস্থান অর্জন করে এবং ২০১৬ সালে ১৬% মার্কেট শেয়ার অর্জন করে। এর জন্যে যে জিনিসগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তা হলোঃ 

-আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন ভিত্তিক মার্কেটিং 

-সমসাময়িক অন্যদের তুলনায় ৫-৬% কম দাম

সব শ্রেণীর কাস্টমার বেস ধরতে চেষ্টা করা;

-জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান “ইত্যাদি”-র টাইটেল স্পন্সর হওয়া।

সফলতার কারণগুলোর পাশাপাশি ব্যর্থতার কারণগুলো বিশ্লেষণ করতে গেলে দেখতে হবে তাদের স্ট্রেটেজির অভাবগুলো।

কসমেটিকস ব্যবসায় শক্ত অবস্থান পাওয়ার আগেই গার্মেন্টস ব্যবসায়ের মতো ক্যাপিটাল ইন্টেন্সিভ ব্যবসায়তে ঝুঁকে পড়ার কারণে কসমেটিকস ব্যবসায় থেকে ফোকাস সরে যায়। ফলে কসমেটিকস ব্যবসায়ের অবস্থা খারাপ হতে থাকে। ২০১৫ সালে, কসমেটিকস সেক্টরে কোম্পানিটির শেয়ার দাঁড়ায় ৫%। ২০১২-১৩ অর্থবছরে কেয়ার লোকাল বিক্রয় ছিল ২৬০ কোটি টাকা, সেখানে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা প্রায় অর্ধেকে নেমে ১৪০ কোটি টাকাতে দাঁড়ায়। 

দেশে বর্তমানে কসমেটিকস বিজনেস অত্যন্ত ভাল অবস্থানে থাকার পরেও, কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের কসমেটিকস ব্যবসায় সম্প্রসারণের প্ল্যানিং এর অভাব ছিলো। গার্মেন্টস ব্যবসায় সম্প্রসারণের জন্য কোম্পানিটি অনেক বেশী টাকা লোন নিয়ে মার্কেট ভোলাটিলিটির সময় অনেক উচ্চ মূল্যে কটন কিনে ফেলে, এতে পরবর্তীতে প্রোডাকশন খরচ বেড়ে যায় এবং সেই হিসেবে আশানুরূপ লাভ হয়না।

২০১০-১১ অর্থবছরে, কোম্পানিটির প্রায় ৫০০ কোটি টাকার এক্সপোর্ট অর্ডার ক্যান্সেল হয়। এছাড়াও ব্যার্থতার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা যায়, ২০১০ সালের পর কেয়া তাদের পণ্যের ক্যাটিগরি উন্নতকরণ নিয়ে কোন কাজ করেনি। যেখানে হালের নামি কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের গুণগত মানের পাশাপাশি প্রোডাক্টের মোড়ক, বয়স ও লিঙ্গ ভিত্তিক সেগমেন্টেশন নিয়ে কাজ করছে, সেখানে কেয়া তাদের পুরনো পণ্যই সীমিত আকারে উৎপাদন করে যাচ্ছে।

কোন কোম্পানির শেয়ার অফ ভয়েস হল কোম্পানিটির মার্কেটিং। বিগত এক দশকে দেশে মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি ও প্রোডাক্ট প্রমোশন ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমানে টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের চেয়ে স্যোশাল মিডিয়া মার্কেটিং অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং, বড় বড় অনুষ্ঠান এন্ডর্সমেন্ট, পাবলিক ফিগারের উপস্থিতি ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়াতে অনেকাংশে সাহায্য করে। একটি মাধ্যমে নির্ভরশীল থেকে বর্তমানে ব্র্যান্ডিং সম্ভব নয়। ৩৬০ ডিগ্রি অথবা টিটিএল মার্কেটিং জরুরি। এক্ষেত্রে কেয়া একদম ই যুগের সাথে তাল মিলাতে পারেনি।

শেয়ার বাজারেও কেয়ার অবস্থান নাজুক। জানা যায়, ২০১০ সালের পর কোম্পানিটি কোন ডিভিডেন্ট দেয়নি। সবমিলিয়ে কেয়া’র ব্যর্থতার পাল্লা যে ভারি তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

তবে এখানেই শেষ নয়। বর্তমানে কেয়া কসমেটিকসের পরিচালক এম মিরাজ হোসেনের মাধ্যমে কেয়া কসমেটিকসের শেয়ার ‘জেড’ ক্যাটাগরি থেকে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত হয়েছে। এখন দেশজুড়ে প্রায় ৪০০-এর অধিক ডিস্ট্রিবিউটর রয়েছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কোম্পানিটি যুক্ত হয়েছে স্বপ্ন, আগোরা এবং ল্যাভেন্ডারের মতো জনপ্রিয় সুপার শপগুলোর সঙ্গে। কেয়া কসমেটিসক ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম প্রিন্টাররেস্ট ইউটিউবসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এবং অনলাইন মার্কেটপ্লেস উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারা, সমন্বয়হীনতার অভাব, পণ্যের পোর্টফোলিওতে বৈচিত্র্য না থাকা এবং পণ্যের ডেলিভারির অনিয়মের কারণে কোম্পানিটি তার আগের অবস্থান হারিয়ে ফেলে বলে, নতুন নীতি ও কৌশল প্রয়োগ করার মাধ্যমে কোম্পানিকে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। তাই আশা করা ই যায়, ভুল সংশোধন করলে আবার আশার আলো দেখা সম্ভব।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also
Close
Back to top button