জীবনী

মাসুদ রানা এবং তার স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেন

বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে একসময় গোয়েন্দা, কিংবা রহস্য উপন্যাস ছিল হাতেগোনা। থ্রিলার পড়ার জন্য অনেকেই বুভুক্ষু হয়ে থাকলেও মিলত না মনমতো থ্রিলার বই। আর সেই জায়গাটিই দখল করে নিয়েছিলো কাজী আনোয়ার হোসেনের অমর সৃষ্টি বাংলার প্রথম স্পাই থ্রিলারধর্মী সুপারহিরো চরিত্র মাসুদ রানা।

তাই মাসুদ রানা কেবল এক গোয়েন্দা কিংবা গুপ্তচরই নয়, বাংলার কৈশোরের এক অনিন্দ্য চরিত্র। দিনের পর দিন বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজ ‘মাসুদ রানা’ কে ভেবে নিয়েছে এক স্বপ্নের নায়ক হিসেবে।

কিন্তু মাসুদ রানার স্রষ্টার সম্পর্কে কতটুকুই বা জানি আমরা!

কাজী আনোয়ার হোসেন, যিনি প্রায় এক হাতেই আমাদের দেশে দাঁড় করিয়েছেন রহস্য–রোমাঞ্চ গল্পের জনপ্রিয় সাহিত্যধারা। ছিলেন একাধারে একজন লেখক, অনুবাদক এবং প্রকাশক। রহস্যভেদী মাসুদ রানার স্রষ্টা ছিলেন, কিন্তু নিজেকে রেখেছিলেন অনেকটাই রহস্যে মুড়িয়ে।

১৯৩৬ সালের ১৯ জুলাই, ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন বরেণ্য এই লেখক-প্রকাশক। তার পুরো নাম কাজী শামসুদ্দিন আনোয়ার হোসেন। ডাক নাম নবাব। ছদ্মনাম হিসেবে বিদ্যুৎ মিত্র ও শামসুদ্দীন নওয়াব নামগুলো ব্যবহার করতেন তিনি। তার বাবা প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেন, মা সাজেদা খাতুন। তাদের সাত ছেলে, চার মেয়ের একজন কাজী আনোয়ার হোসেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের পূর্ব সীমানায় উত্তর ও দক্ষিণ কোণে যে দুটি দোতালা গেস্ট হাউজ আছে, সেখানেই উত্তরের দালানটিতে কেটেছে আনোয়ার হোসেনের ছেলেবেলা।

১৯৫২ সালে, সেন্ট গ্রেগরি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন কাজী আনোয়ার হোসেন। এরপর জগন্নাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং বিএ পাস করেন। পরবর্তীতে ১৯৬১ সালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে এমএ পাস করেন। পড়াশুনা শেষ হওয়ার পর রেডিওতে তিনি নিয়মিত গান গাইতে শুরু করেন। ১৯৬০ এর দশকে, সুভাষ দত্ত পরিচালিত বাংলা ছবি ‘সুতরাং’-এ নেপথ্য গায়ক হিসেবে তার গান আছে।

কিন্তু কাজী আনোয়ার হোসেন সংগীত ছেড়ে দেন হুট করেই। ১৯৬৩ সালের মে মাসে, সেগুনবাগিচায় প্রেসের ব্যবসা শুরু করেন তিনি। অথচ কাজী আনোয়ার হোসেনের লেখার জগতে আসার কথাই ছিলো না। নিয়মমাফিক কোনো প্রশিক্ষণ না নিলেও তাদের বাড়িতে গানের চর্চা সবসময় ছিলো। কাজী আনোয়ার হোসেনের  তিন বোন সনজীদা খাতুন, ফাহমিদা খাতুন ও মাহমুদা খাতুন এখনও রবীন্দ্র সঙ্গীতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আবার তার স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিনও ছিলেন বেতার ও চলচ্চিত্রের  নিয়মিত শিল্পী। তাই আনোয়ার হোসেনের সেই পথে হাঁটাই হয়তো গন্তব্য ছিলো। অনেকাংশে ঠিক হয়েছিলোও তাই। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত, তিনি ছিলেন ঢাকা বেতারের তালিকাভুক্ত সংগীত শিল্পী। কিন্তু এরপরেই তিনি  বেছে নিলেন তার বাবার পথ। রক্তে যে সাহিত্যের নেশা। পড়েছেনও বাংলা সাহিত্যে। মাথায় তখন তার একটিই চিন্তা। প্রেসের ব্যবসায় করবেন তিনি। বাবা কিংবদন্তী পরিসংখ্যানবিদ ও সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেনকে বলা মাত্রই তিনিও রাজি হয়ে গেলেন।  

১৯৬৩ সালের মে মাসে, বাবার দেওয়া ১০ হাজার টাকা সম্বল করে ৮ হাজার টাকা দিয়ে কেনেন একটি ট্রেডল মেশিন আর বাকি টাকা দিয়ে কিনে আনলেন  টাইপপত্র। মাত্র ২ জন কর্মচারীকে সঙ্গী করে শুরু হলো নতুন এক অভিযাত্রা। জন্ম নিলো সেগুনবাগান প্রকাশনীর। যা ১৯৬৪ সালের জুন মাসে, কুয়াশা-১ সিরিজের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছিলো। কুয়াশা চরিত্রটি নিয়ে কাজী আনোয়ার হোসেন প্রায় ৭৬টির মতো কাহিনী রচনা করেছেন।

পরবর্তীতে তিনি নিজেই নাম পাল্টে নতুন নাম রেখেছিলেন সেবা প্রকাশনী। পরবর্তী ৬ দশকে, তার প্রকাশনা সংস্থা বাংলাদেশে পেপারব্যাক গ্রন্থ প্রকাশ, বিশ্ব সাহিত্যের প্রখ্যাত উপন্যাসের অনুবাদ এবং কিশোর সাহিত্যের ধারাকে অগ্রসর করার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। 

সেবা প্রকাশনীর কর্ণধার হিসাবে তিনি ষাটের দশকের মধ্যভাগে মাসুদ রানা নামক গুপ্তচর চরিত্রটিকে সৃষ্টি করেন। জনপ্রিয় চরিত্র মাসুদ রানা’র নামকরণ করা হয়েছিল ২ জন বাস্তব মানুষের নামের অংশ মিলিয়ে। কাজী আনোয়ার হোসেন স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিনের সঙ্গে পরামর্শ করে নামটি নির্বাচন করেছিলেন। তাদের ২ জনেরই বন্ধু ছিলেন  স্বনামধন্য গীতিকার মাসুদ করিম। মাসুদ করিমের নাম থেকে ‘মাসুদ’ আর ছেলেবেলার ইতিহাসে পড়া মেবারের রাজপুত রাজা রানা প্রতাপ সিংহ থেকে ‘রানা’ নিয়ে  আনোয়ার হোসেন  চরিত্রের নামকরণ করেছিলেন ‘মাসুদ রানা।

এই  মাসুদ রানা চরিত্র সৃষ্টির ধারণা আনোয়ার হোসেন পেয়েছিলেন ১৯৬৫ সালের কোনো একদিন। তখন তিনি কুয়াশা সিরিজের জন্য নিয়মিত লিখছেন।  অন্যদিনের মতো সেদিনও কুয়াশা সিরিজের জন্য লিখছিলেন কাজী আনোয়ার হোসেন। তার বন্ধু মাহবুব আমীন এসময়ে ঘরে ঢুকে বললেন, ‘ওটা না লিখে আগে একটা বই পড়ো। বইটা দারুণ। মুগ্ধ হবে নিশ্চিত।’  বলেই বাড়িয়ে দিলেন ইয়ান ফ্লেমিংয়ের লেখা জেমস বন্ড সিরিজের ‘ডক্টর নো’ বইটি। বইটি পড়ে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন আনোয়ার হোসেন, যে তিনি ঠিক করলেন বাংলা ভাষাতেই এই ধরনের একটি গোয়েন্দা চরিত্র লিখবেন। লিখবেন বললেই তো হবে না। সেজন্য চাই পড়াশোনা। আর এজন্য গোটা বাংলাবাজার তন্ন তন্ন করে বইয়ের পিছু ছুটেছেন তিনি।

টানা ৭ মাস পরিশ্রমের পর অবশেষে  জন্ম নিলো ‘ধ্বংস-পাহাড়’। ১৯৬৬ সালের মে মাসে, বাংলা সাহিত্যে প্রথম স্পাইধর্মী থ্রিলার গোয়েন্দা কাহিনী  ‘ধ্বংস-পাহাড়’ প্রথম প্রকাশিত হলো।

এরপর একে একে জন্ম হয়েছে মাসুদ রানা সিরিজের সাড়ে চারশোরও বেশি বইয়ের। এই মাসুদ রানা সিরিজের সৃষ্টির পথও সবসময় মসৃণ ছিলো না। বেশ কয়েকবার  বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছিল।

তবে প্রথম ২টি ছাড়া একসময় মৌলিক লেখা বাদ দিয়ে মাসুদ রানার বাকি বইগুলো বিদেশি কাহিনীর ছায়া অবলম্বনেই লিখেছিলেন কাজী আনোয়ার হোসেন। কিন্তু তাতেও মাসুদ রানার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি। বিদেশি কাহিনী অবলম্বনে লেখা প্রসঙ্গে কাজী আনোয়ার হোসেন জানান, এর মূল কারণ, তার অভিজ্ঞতার অভাব। মাসুদ রানা বইয়ে যেসব দেশের কথা, অভিজ্ঞতার কথা, ঘটনার কথা, জটিল পরিস্থিতির কথা থাকে, সেসব সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা একজন মধ্যবিত্ত বাঙালির পক্ষে অর্জন করা প্রায় অসম্ভব। তাই বিদেশি কাহিনির সাহায্য তাকে নিতেই হয়েছে। 

আমাদের কৈশোরে যেমন আমরা বুঁদ ছিলাম মাসুদ রানায়, তেমনই কাজী আনোয়ার হোসেন মুগ্ধ হয়েছিলেন হেমেন্দ্র কুমার রায়ের লেখায়, কখনোবা রবিনহুডে। 

কাজী আনোয়ার হোসেনের এক মেয়ে ও দুই ছেলে আছে। তার মেয়ে শাহরীন সোনিয়া কণ্ঠশিল্পী। বড় ছেলে কাজী শাহনূর হোসেন এবং ছোট ছেলে মায়মুর হোসেন লেখালেখি এবং সেবা প্রকাশনীর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

গত ৩১ অক্টোবর, কাজী আনোয়ার হোসেনের প্রোস্টেট ক্যানসার ধরা পড়ে। মাঝে পাঁচ বার হসপিটালাইজড ছিলেন। চিকিৎসার সুযোগ খুব একটা পাওয়া যায়নি। একটা ব্রেন স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাক ও করেন তিনি। ১০ জানুয়ারি থেকে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। অতঃপর গত ১৯ জানুয়ারি, বুধবার বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটে মৃত্যুবরণ করেন এই জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button