ইতিহাস

ইরাকের কুখ্যাত আবু গারিব-কারাগার!

ইরাকের আবু গারিব শহরে অবস্থিত আবু গারিব কারাগারটি বাগদাদের ৩২ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। ১৯৫০-এর দশকে ২৮০ একর জমির ওপর এর কার্যক্রম শুরু হয়।

কারাগারটি সাদ্দাম হুসাইনের আমলে পৃথিবীর অন্যতম কুখ্যাত কারাগার হিসেবে পরিচিত ছিল। এই কারাগারে সাদ্দাম হুসাইনের সময় প্রায় ৫০০০০-এর মতো বন্দী আটক ছিল। আটককৃত বন্দীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানোর জন্যই কুখ্যাতি অর্জন করে এই কারাগার। এটি তৎকালীন ইরাকে নির্যাতন, সাপ্তাহিক মৃত্যুদণ্ড এবং অসহায় জীবনযাত্রার সাথে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত কারাগার ছিল। 

২০০৩ সালে, ইঙ্গ-মার্কিন বাহিনী ইরাকে আগ্রাসন চালায়। সাদ্দাম সরকারের পতনের পর জনগণ কারাগারটির সবকিছু লুট করে নিয়ে যায়।

পরবর্তীতে মার্কিন বাহিনী দখল করে নেয় কারাগারটি। তারা কারাগারটিকে নিজেদের মতো গুছিয়ে নেয় এবং একে একটি মিলিটারি বন্দীশালা হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। এরপরও আবু গারিব কারাগারের দুর্নাম ঘোচেনি। মার্কিন সেনারাও কারাগারটিকে বন্দি-নির্যাতন কেন্দ্রে পরিণত করে। 

পরবর্তীতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন দখলদার বাহিনী দ্বারা পরিচালিত কারাগার কমপ্লেক্সের অংশে রক্ষীদের দ্বারা নির্যাতন ও নির্যাতনের সাথে জড়িত একটি কেলেঙ্কারী প্রকাশ পেলে আবু গারিব কারাগার আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

ইরাক জুড়ে আমেরিকার যতগুলো আটক কেন্দ্র ছিল তার মধ্যে আবু গারিব ছিল সবচেয়ে বড়। ২০০৪ সালের দিকে, ঐ কারাগারে ৭,৪৯০ জনের মতো বন্দী আটক ছিল। 

আবু গারিব কারাগারে সাধারণত তিন ধরনের বন্দীদের আটক রাখা হত। সাধারণ চোর-ডাকাত, বিভিন্ন বিদ্রোহী গ্রুপের নেতা এবং মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলাকারী বিভিন্ন সন্ত্রাসীরা ছিল এই তিন শ্রেণীর অন্তর্গত। বন্দীদের মধ্যে ৭০%-৮০% ই ছিল নিষ্পাপ এবং সন্দেহের বশে আটককৃত। বন্দীদের মার্কিন আর্মি এবং সিআইএ’র সদস্যরা বিভিন্নভাবে শারীরিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, অত্যাচার, ধর্ষণ এবং হত্যা করতো। 

২০০৪ সালের ২৮ এপ্রিল, মার্কিন টেলিভিশন নিউজ-ম্যাগাজিন ৬০ মিনিট, দ্য নিউ ইয়র্কার পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন করে। যাতে মার্কিন সৈন্যদের দ্বারা ইরাকি বেসামরিক বন্দীদের অমানবিক নির্যাতন ও নিপীড়নের বর্ণনা দেয়া হয়। ওই অনুষ্ঠানে প্রচারিত নির্যাতনের ছবিগুলো গোটা পৃথিবীকেই যেন নাড়িয়ে দিয়ে যায়। এত নিষ্ঠুরভাবেও যে মানুষ মানুষকে নির্যাতন করতে পারে তা দেখে হতবাক হয়ে যায় বিশ্ব। ছবিগুলো আমেরিকা এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচনার ঝড় তোলে। চারদিক থেকে সমালোচনা ধেয়ে আসতে থাকে নির্যাতনকারী সৈন্যদের দিকে। এর জের ধরে একে একে বেরিয়ে আসে কারাগারে ইরাকি বন্দিদের সাথে ঘটে যাওয়া নৃশংস সব ঘটনা।

এই ঘটনার জের ধরে আমেরিকান প্রতিরক্ষা দপ্তর সতেরজন সৈন্য এবং অফিসারকে বাহিনী থেকে অপসারণ করা হয়। কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে তাদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়। কিন্তু এসব কিছুই যেন ছিল অনেকটা লোক দেখানো। কারণ বন্দী নির্যাতনের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠা উচ্চপদস্থ অনেক কর্মকর্তাই থেকে যায় ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

জানা যায়, তৎকালীন সময়ে স্পেশালিস্ট সাবরিনা হারমান এবং স্টাফ সার্জেন্ট ইভান ফ্রেড্ররিক এক বন্দীর হাত-পায়ের আঙুল এবং পুরুষাঙ্গের সাথে বৈদ্যুতিক তার লাগিয়ে দেয়। সাবরিনা এ সময় ওই বন্দীকে বলে, যদি সে বক্স থেকে নিচে পড়ে যায় তাহলে সাথে সাথে বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে মারা যাবে। প্রচন্ড আতঙ্কে ওই বন্দী ঐ অবস্থায় প্রায় এক ঘন্টার মতো দাঁড়িয়ে ছিল।

আবু গারিব কারাগারে ঘটে যাওয়া নির্যাতন সম্পর্কে তদন্ত করতে গিয়ে জানা যায়, নেভি সিলের একটি দল মান্দেলকে আল-জামাদিকে আবু গারিব কারাগারে ধরে আনে। কারাগারে আনার পরপরই শুরু হয় নির্যাতন। নেভি সিলের সদস্যরা অনবরত তাকে ঘুষি মারছিল, কেউ একজন তার গলা টিপে ধরে এবং তার চোখে আঙুল ঢুকিয়ে দেয়। নির্যাতনের প্রতিবাদ করতে গেলে একজন তার মাথায় বন্দুকের বাট দিয়ে সজোরে আঘাত করে। পরবর্তীতে সিআইএ এবং আর্মি ইন্টিলিজেন্সের কয়েকজন সদস্য তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা শুরু করে। জিজ্ঞাসাবাদ শুরুর এক ঘন্টারও কম সময়ের মধ্যে মান্দেল আল-জামাদির মৃত্যু ঘটে।

বন্দীদের ওপর বিভিন্নভাবে যৌন নির্যাতন করা ছিল আবু গারিব কারাগেরর আরেকটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। ২০০৯ সালের দিকে, বিশ্ববাসী জানতে পারে, আবু গারিবে বন্দীদের ওপর ভয়াবহ যৌন নির্যাতন চালানো হয়েছিল। বিভিন্ন ছবি এবং প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় এর প্রমাণ পাওয়া যায়।

১২ জানুয়ারি ২০০৫ সালে, নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকা আবু গারিব কারাগারে কাটানো কয়েকজন বন্দীর সাক্ষ্য প্রকাশ করে। পত্রিকাটির ওই রিপোর্ট থেকে জানা যায়, বেশ কয়েকজন আমেরিকান সৈন্য কারাবন্দীদের ওপর নির্যাতন চালাত। তারা বন্দীদের শরীরে মূত্র ত্যাগ করত, আহত অঙ্গে লোহার রড দিয়ে প্রহার করত, বন্দীদের ওপর ফসফরিক এসিড ঢেলে দিত, অনেকের পায়ে এবং পুরুষাঙ্গে দড়ি বেধে টেনে নিয়ে যেত অনেক দূর।

ইরাক আগ্রাসন শুরু হয় দুই হাজার তিন সালের ২০ শে মার্চ। সে আগ্রাসনের অন্যতম বড় ক্ষত আবু গারিব কারাগার। অনেকের মতে, এই কারাগার ছিল সাক্ষাৎ জাহান্নাম ; আধুনিক মানুষের অসুস্থতা ও বর্বরতার প্রত্যক্ষ সাক্ষী। আধুনিক মানুষের মনের মধ্যে আছে ঘৃণা, বর্ণবাদ ও অসুস্থতা; সবমিলিয়ে আবু গারিব ছিল ইসলামোফোবিক জাহান্নাম।

মূলত পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি নিজেদের অপকর্ম ঢেকে রাখতে এই ফোবিয়ার ধারণাকে জনপ্রিয় করেছে। এবং এর মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের জুলুম ও শত্রুদের ওপর প্রতিশোধের পথকে সুগম করেছে। ইরাকের আবু গারিব কারাগার হচ্ছে এমনই একটি ইতিহাস, যেটা ইসলামোফোবিয়ার ফলে একটি পাশবিক দোজখে পরিণত হয়েছে।

একবার কারাগারে একজন ইমামকে বন্দী করা হয়। এক নারী সৈনিক এই মুসলিম ধর্মগুরুর ওপর ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে একটি কৃত্রিম পুরুষাঙ্গ দিয়ে তার উপর ঘৃণ্যতম অত্যাচার চালায়।

বস্তুত যেসকল ঘটনা সামনে এনে পশ্চিমা মিডিয়া ইসলামোফোবিয়ার ধারণাকে মজবুত করে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নাইন/ইলেভেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো–আফগান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন ইত্যাদি তুলে রাখি–শুধুমাত্র আবু গারিবের মুসলিমদের ওপর অত্যাচারের মাত্রাই বহু আগে নাইন-ইলেভেন অতিক্রম করে ফেলেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে কারাগারটিতে সাদ্দাম-যুগের অনেক গণকবর আবিষ্কৃত হয়েছে। বাগদাদের পশ্চিমে অবস্থিত খান ধারী – বাগদাদের আবু গারিব কারাগার থেকে রাজনৈতিক বন্দীদের লাশ নিয়ে গঠিত গণকবর। এখানে ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর, ১৫ জন বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় এবং কারা কর্তৃপক্ষ অন্ধকারের আড়ালে নিহতদের সমাহিত করে।

এছাড়াও, বাগদাদের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত আল-জাহেদি – একটি বেসামরিক কবরস্থানের কাছে গোপন কবরে প্রায় ১,০০০ রাজনৈতিক বন্দীর দেহাবশেষ পাওয়া গেছে। একজন প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, আবু গারিব কারাগার থেকে ঐ স্থানে একসাথে ১০ থেকে ১৫ টি লাশ এসে পৌঁছায় এবং স্থানীয় বেসামরিক নাগরিকরা তাদের কবর দেয়। ১৯৯৯ সালের ১০ ডিসেম্বর, আবু গারিবে এক দিনে ১০১ জনের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। ২০০০ সালের ৯ মার্চ, এক সাথে ৫৮ জন বন্দীর মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকর হয়। সর্বশেষ মৃতদেহটি ছিল ৯৯৩ নম্বর।

অবশেষে ২০১৪ সালের ১৫ এপ্রিল, আইএসের হামলার আশঙ্কায় ইরাক সরকার আবু গারিব কারাগারকে বন্ধ ঘোষণা করা। সেই সময় কারাগারে থাকা ২,৪০০ বন্দীকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়।

সেই সাথে শেষ হয় ইতিহাসের এক নৃশংস অধ্যায়!

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button