খেলাধুলাসংবাদসাম্প্রতিক

মোহাম্মদ শামসুজ্জামান আরাফাতঃ বাংলাদেশের আয়রনম্যান

সাধনা করলে সবই সম্ভব। কথাটির সত্যতা নতুন করে যাচাইয়ের কোনো প্রয়োজন হয় না। যুগ যুগ ধরে সাধনা করেই অসাধ্য সাধন করে আসছে অসাধারণ মানুষেরা। মোহাম্মদ শামসুজ্জামান আরাফাত এমনই একজন। অনেক কষ্টের পথ পাড়ি দিয়ে ‘আয়রনম্যান’ খেতাব অর্জন করেছেন বাংলাদেশের এই বিস্ময় বালক। মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন দেশের মোট ১০০৮ জন প্রতিযোগীর মধ্যে ২৭৪তম হয়েছেন বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিযোগী।

আরাফাত প্রথম ২০১৭ সালে মালয়েশিয়ায় আয়রনম্যান আয়োজনে অংশ নেন। এরপর ২০১৯ সালে আয়রনম্যান ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেন। একই বছর আয়রনম্যান মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আয়রনম্যান ৭০.৩ বাংসায়েনেও অংশ নিয়েছেন।

রোমাঞ্চপ্রিয় আরাফাত এরপর পথ ধরেছেন মার্কিন মুলুকের। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয়, আয়রনম্যান ৭০.৩ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেন তিনি। আয়রনম্যান প্রতিযোগিতা নামক এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা গত কয়েক বছর যাবত চালু হয়েছে। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্যে লাগে বিশেষ শারীরিক মানসিক যোগ্যতা।

যেখানে রয়েছে সাঁতার, সাইক্লিং ও দৌড় প্রতিযোগিতার মত তিনটি ধাপ। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট জর্জ ইউটা শহরের আয়রনম্যান ৭০.৩ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে প্রত্যেক প্রতিযোগীকে কিছু শর্ত পূরন করতে হয়। 

এটি একধরনের প্রতিযোগিতা। যেখানে প্রতিযোগীদের টানা ৩.৮ কিলোমিটার সমুদ্রের মধ্যে সাঁতার কাটতে হয়, ১৮০ কি.মি. পাড়ি দিতে হয় সাইকেল আর ৪২.২ কি.মি. দূরত্ব অতিক্রম করতে হয় ম্যারাথন দৌড়ে। আর এই পুরো কাজ টি করতে হয় মাত্র ১৭ ঘন্টায়।যা একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ।

আরাফাত এই কঠিন চ্যালেঞ্জটি অতিক্রম করেছেন মাত্র ১২ ঘণ্টা ৪৩ মিনিট ২৭ সেকেন্ড সময় নিয়ে। অনেক দিন ধরেই আয়রনম্যান খেতাব অর্জনের জন্য পরিশ্রম করে যাচ্ছিলেন।

এ অর্জনের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে আরাফাত জানান, ‘আয়রনম্যান ৭০.৩ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে প্রতিযোগী নির্বাচিত করা হয় বছরব্যাপী আয়োজিত বিভিন্ন আয়রনম্যান ইভেন্টে অংশগ্রহণকারী অ্যাথলেটদের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে। সেই হিসেবে তিনিও সুযোগ পেয়ে যান। প্রস্তুতিতে কোন ঘাটতি রাখেন নি তিনি। আয়রনম্যান অভিযানের লক্ষ্যে দীর্ঘদিন কঠিন অনুশীলন করে চলেছেন তিনি। তার লক্ষ্য ছিলো, সাড়ে ৫ ঘণ্টার মধ্যে এই কঠিন চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করা।’ 

বাংলাদেশে বসবাসরত প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে এটি সাফল্যের সাথে শেষ করেন মোহম্মাদ শামসুজ্জামান আরাফাত। যদিও বাংলাদেশী আরেকজন আয়রনম্যান আছেন। যার নাম সুমিত পাল। তিনি একজন প্রবাসী।

উল্লেখ্য, মুহাম্মদ সামসুজ্জামান আরাফাত হচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক। আরাফাত পিকেএসএফের তৃণমূল পর্যায়ের ক্রীড়া কর্মসূচীর ২০১৭ সালের ক্রীড়াদূতের সম্মানে ভূষিত হন। 

পেশায় ব্যাংকার মুহাম্মদ সামসুজ্জামান আরাফাত জানান, তিনি সুস্থ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন। সে স্বপ্ন পূরণে কাজ করে যেতে চান। রোমাঞ্চকর নানা আয়োজনের মাধ্যমে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করতে চান।

মুহাম্মদ সামছুজ্জামান আরাফাতের অর্জন শুধু এটাতেই সীমাবদ্ধ নয়। এর আগে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে, তিনি দৌড়ে বাংলাদেশের দুই প্রান্ত টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পাড়ি দেবেন বলে লক্ষ্য স্থির করেন। তাঁর উদ্দেশ্যে ছিলো রোজ ৫০ কিলোমিটার দৌড়ানো। ২০ দিনে হাজার কিলোমিটার। এই কাজ করার জন্য অনেক আগে থেকেই নিজেকে প্রস্তুত করেন। ওই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি, টেকনাফের নোয়াপাড়া পরিবেশ টাওয়ার এলাকা থেকে দৌড় শুরু করেন তিনি। টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিনস বাংলা চ্যানেল সাঁতরে পার হন। কিন্তু দৌড়ে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পাড়ি দিতে গিয়ে পড়েন অভাবনীয় এক বাধার সম্মুখে। বঙ্গবন্ধু সেতু যানবাহনে ছাড়া পার হওয়ার নিয়ম নেই। তাহলে কি স্বপ্ন পূরণ হবে না আরাফাতের? না, আরাফাত হেরে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি ঝাঁপ দেন যমুনা নদীতে। সাঁতরে ৪.৮ কিলোমিটার যমুনা পার হয়ে ওপারে ওঠেন। তারপর আবারও দৌড়। ২০ দিনে প্রায় ১ হাজার ৪ কি.মি. রাস্তা পাড়ি দিয়ে ৬ মার্চ তেঁতুলিয়া উপজেলার বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টে পৌঁছান তিনি। তখন তাঁর সাথে অনেকেই যোগ দেয়। এজন্যে বাংলাদেশের অনেক মানুষ ই তাকে বাংলাদেশের ফরেস্ট গাম্প (টম হ্যাংকস অভিনীত ছবি ফরেস্ট গাম্প-এ একই রকমের দৃশ্য ঘটে, টমের হাঁটার সঙ্গে আরও মানুষ যোগ দেয়) বলে অভিহিত করেন।

বাংলাবান্ধা পৌঁছানোর পর তাঁর বাবার বন্ধু বীর প্রতীক আবদুল মান্নান তাঁর হাতে বাংলাদেশের পতাকা তুলে দেন।

এরপর থেকে দেশ-বিদেশে নানা অভিযানে অংশ নিয়েছেন তিনি। গত বছরেই সপ্তমবারের মতো বাংলা চ্যানেল সাঁতরে পাড়ি দিয়েছেন। তার ইচ্ছা ভবিষ্যতে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেয়া। বোঝাই যাচ্ছে অসাধ্যকে সাধন করাই আরাফাতের লক্ষ্য।

আরাফাতের বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা মোশাররফ আর তাঁর বাবার বন্ধু বীর প্রতীক আবদুল মান্নানেরা শহীদের রক্তে আঁকা পতাকা দিয়েছেন আরাফাতের হাতে। আরাফাত সেই পতাকা দিয়ে যাবেন তার ছেলে আহিয়াশকে। এই লাল-সবুজের মানে বাধা না মানা, থেমে না যাওয়া। আরাফাতরা বাধা পেলে দমে যান না। আহিয়াশরাও দমবে না। বাংলাদেশ দমবে না। বাধা আসবে। বাংলাদেশ বাধা পেরোবেই। বাংলাদেশ বিজয়ী হবে। এই বাংলাদেশ তারুণ্যের বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ী বাংলাদেশ।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button