সাম্প্রতিক

আব্দুল গণি গাজীর টাইগার গণি হয়ে উঠার গল্প

সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের পাগড়াতলী খালে গত ২০ ডিসেম্বর কাঁকড়া সংগ্রহে যান সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের মজিবুর রহমান ও ইসমাইল হোসেন। সেখানে বাঘের শিকার হন মজিবুর। প্রাণ বাঁচিয়ে এলাকায় ফিরে সে খবর জানান ইসমাইল। পরদিনই মজিবুরকে উদ্ধার অভিযানে যায় সাত সদস্যের একটি দল। মজিবুরের ক্ষত-বিক্ষত মরদেহ বাঘের কাছ থেকে উদ্ধার করে তারা এনে দেন পরিবারের কাছে।

দলটির এই অভিযান ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার পর প্রশংসিত হচ্ছে দলনেতা টাইগার গনির সাহসী নেতৃত্ব। বাঘের মুখ থেকে জীবিত মানুষ অথবা ছিন্নভিন্ন মরদেহ ফিরিয়ে আনার ভয়ংকর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। আব্দুল গণি থেকে টাইগার গণিতে পরিণত হওয়ার সেই ভয়ংকর পথের গল্প নিয়েই আজকের আয়োজন। 

আব্দুল গণি গাজী ওরফে টাইগার গণি ১৯৭৭ সালে, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার রমজাননগর ইউনিয়নের কালিঞ্চি গ্রামে জন্মগ্রহণ করে। তার বাবার নাম বদরউদ্দীন গাজী এবং মা আমেনা বেগম। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া জেলে আব্দুল গণি গাজীর অভাবের তাড়নায় লেখাপড়া করা হয়নি। ছোটবেলায় বাবার কাছ থেকে নদীতে মাছ ধরার কৌশল শেখেন। শুরু হয় সংগ্রামী জীবন। 

তার এ কাজের শুরু কিভাবে জানতে চাইলে আব্দুল গণি জানান, জ্ঞানবুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই তিনি জেলে। সুন্দরবন ও সুন্দরবন উপকূলীয় নদীতে মাছ ধরেই চলে সংসার। তবে সুন্দরবনে গিয়ে যে কোনো জেলে বাওয়ালিদের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তেন সব সময়। এসব করতে গিয়েই ঘটনাক্রমে ২০০৭ সালে সুন্দরবন নিয়ে কাজ করা সংগঠন ওয়াইল্ড টিমে তার চাকরি হয়। তাদের এলাকার ফরেস্ট অফিস থেকে অনুমতিপত্র নিয়ে ৭ সদস্যের একটি দল মধু সংগ্রহ করতে সুন্দরবনে যান। এদের মধ্যে দুইজনকে বাঘে ধরে। একজন জীবিত ফিরলেও আরেকজন বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারান। 

মরদেহটি উদ্ধার করতে টাইগার টিমের সদস্য, ফরেস্ট টাইগার রেসকিউ টিমসহ স্থানীয়দের সঙ্গে তিনিও ঘটনাস্থলে যান। সেখানে তিনি সহযোগিতা করেছিলেন সেই মরদেহটি উদ্ধার করতে। ওই দলকে তিনি জানান কীভাবে মরদেহটি  উদ্ধার করতে হবে বা কীভাবে সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এরপর তার কার্যক্রম পছন্দ হওয়ায় ওয়াইল্ড টিমের ফরেস্ট টাইগার রেসপন্স টিমে চাকরি দিল তারা। এক বছর পর ২০০৮ সালে টিম লিডারের দায়িত্ব দেয় তাকে। তারপর থেকেই সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে কেউ বিপদগ্রস্ত হলেই তাকে দায়িত্ব নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়। যদিও ২০১৯ সালে, ওয়াইল্ড টিমের ফরেস্ট রেসপন্স টিমের প্রজেক্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় সেই চাকরিটা এখন আর নেই। তবে তার কার্যক্রম থেমে নেই।

সর্বশেষ গত ২১ ডিসেম্বর মঙ্গলবার, বাঘের আক্রমণে নিহত বনজীবী মুজিবর রহমানের মরদেহটি উদ্ধার করেন আব্দুল গণি গাজী। তিনি জানান, আগের দিন সন্ধ্যার আগে মুজিবর রহমানকে সুন্দরবনের পায়রাটুনি খাল এলাকায় বাঘে ধরে নিয়ে যায়। শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই মরদেহটি উদ্ধার করে ফিরিয়ে দিয়েছেন পরিবারটিকে। বাঘটি মুজিবর রহমানের একটি পা পুরোটাই খেয়ে ফেলেছিল। বনের মধ্যে খুঁজতে খুঁজতে মরদেহটি উলঙ্গ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন তারা। আশপাশে বাঘের উপস্থিতি থাকতে পারে, চারপাশে একটু নজর দিয়েই মরদেহটি ঘাড়ে তুলে নিয়ে ফিরে আসেন নৌকায়। 

২০০৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ১০০ থেকেও বেশি মানুষকে উদ্ধার করেছেন টাইগার গণি। এর মধ্যে ৮০-৮৫ জন মৃত। বাকি ১৫-২০ জনকে জীবিত। তবে জীবিত উদ্ধারের বিষয়টি হচ্ছে যখনই কেউ বাঘের আক্রমণের শিকার হন তাৎক্ষণিক তাকে রেসকিউ করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা বা নানাভাবে সহযোগিতা করা। এসবগুলোকে জীবিত উদ্ধার হিসেবে ধরে নেয় তারা।

এই কাজ করতে গিয়ে কখনো বাঘের মুখোমুখি হতে হয়েছে কিনা জানতে চাইলে আবদুল গণি জানান এক রোমহষর্ক গল্প। ২০০৯ সালে, ডিঙ্গিমারি নামক একটি খাল এলাকায় একজনকে বাঘে ধরে। তাকে উদ্ধার করতে গেলে সেখানে বাঘের মুখোমুখি হন। বাঘ ওই মানুষটাকে খেতে খেতে শুধু বুকের পাঁজর আর মাথাটুকু বাকি রেখেছিল। সুন্দরবনে গাছের গায়ে থাকা রক্ত, মাংস ও বাঘে টেনে নিয়ে যাওয়ার স্পটগুলো চিহ্নিত করেই মূলত মরদেহ শনাক্তের কাজ করে তারা। ৩-৪ ঘণ্টা খোঁজাখুঁজির পর মরদেহটির সন্ধান পান। তার থেকে ১০-১২ হাত দূরে ছিল মরদেহটি। হঠাৎ দোয়েল পাখির মতো কী যেন একটা সামনে দিয়ে উড়ে যাওয়ায় থমকে যান তিনি। এক মিনিটের মধ্যেই বাঘ সামনে হাজির। তার দিকে ভয়ঙ্কর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল বাঘটি আর গর্জন করছিল। 

কিন্তু ভয় পেয়ে গেলেও সাহস হারাননি তিনি। বাঘের চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে মাটিতে গড়াগড়ি শুরু করেন তিনি। তখন বাঘ ও গর্জন করছিল। তিনিও চিৎকার শুরু করলেন এবং হাতে থাকা লাঠি দিয়ে শব্দ করতে থাকলেন। কয়েকবার শব্দ করতেই বাঘের গর্জন থেমে গেল। বাঘটি চলে গেল। মরদেহের অবশিষ্ট থাকা বুকের পাঁজর ও মাথাটুকু নিয়ে দ্রুত নৌকায় ফিরলেন তারা।

চাকরি গেলেও কাজ থেকে সরে দাঁড়াননি গনি। কোথাও কোনো খবর পেলে এখনো তিনি ছুটে যান। কখনও মানুষের হাত থেকে প্রাণীকে উদ্ধার করে বনে ফিরিয়ে দেন, কখনও হিংস্র প্রাণীর কাছ থেকে ছিনিয়ে আনেন মানুষকে বা অন্তত নিথর দেহকে। প্রতিটি কাজই এখন করেন বিনা পরিশ্রমিকে।

তার জীবন এখন কিভাবে চলছে তা জানতে চাইলে তিনি জানান, ২০১৯ সালে চাকরি চলে যাওয়ার পর, বন বিভাগের এক স্যারের সহযোগিতায় ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে কাজ করেন ১ বছর ৩ মাস। এরপর বন বিভাগের একটি বোটে ড্রাইভার হিসেবে কাজ পেলেও তার ভালো না লাগায় কাজ করতে পারছিলেন না। খবর পেলেও চাকরি ফেলে কোথাও বন্যপ্রাণী বা আক্রান্ত মানুষকে উদ্ধারে যেতে পারতেন না বলে আট দিনের মাথায় চাকরি ছেড়ে দেন তিনি।

তিনি জানান, এলাকার লোকজনই ভালোবেসে তাকে টাইগার গনি উপাধি দিয়েছে। এখন সাতক্ষীরা রেঞ্জে তিনি এ নামেই পরিচিত।

উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালে বাবা এবং ২০২০ সালে মা কে হারান গণি। পরিবারে এখন তার স্ত্রী শাহিদা বেগম, ছেলে শাহিনুর আলম, মেয়ে মুক্তা খাতুন ও মানসিক ভারসম্যহীন খাদিজা খাতুন নামে র এক বোন রয়েছে। ছেলে শাহিনুর আলম এইচএসসি পাস করেছে। এরপর অভাবের তাড়নায় আর লেখাপড়া করাতে পারিনি। তাকে তিনি তার মত হয়ে উঠতে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে তার ছেলে যেনো পরবর্তী টাইগার হয়ে উঠতে পারে, এটাই তার ইচ্ছা।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button