জীবনী

কে এই জয়নাল হাজারী!

“আমি যুদ্ধ শেষে দেশ জয় করে এসে দেখি প্রেমিকাকে জয় করে নিয়েছে অন্য কেউ।” 

এক মনভাঙা প্রেমিকের এই উক্তি একসময় বেশ নাড়া দিয়েছিলো বাংলাদেশের মানুষ কে। বলছিলাম এক সময়ের দোর্দণ্ড প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জয়নাল হাজারীর কথা। যার নাম শুনলে এক সময় কেঁপে উঠতো অনেকেই। রাজনৈতিক জীবনের পুরো সময়টুকুই আলোচনা-সমালোচনায় ছিলেন ফেনীর এক সময়ের ‘গডফাদার’ খ্যাত নেতা এবং সাবেক সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন হাজারী। বিশেষ করে ১৯৯৬ সালে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি ফেনীতে ‘হাজারী রাজত্ব’ কায়েম করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ইতিহাস, ধর্ম, সাহিত্য বা বিশ্বের যেকোনো বিল্পবী নেতাদের সম্পর্কে তিনি ছিলেন জ্ঞানগর্ভ।’

কিন্তু কে ছিলেন এই জয়নাল হাজারী!

১৯৪৫ সালের ২৪ আগস্ট, ফেনী শহরের সহদেবপুরের হাবিবুল্লাহ পণ্ডিতের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন হাজারী। তার বাবার নাম আব্দুল গণি হাজারী ও মা রিজিয়া বেগম।

মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গনে হাজারী ছিলেন পাক হানাদার বাহিনীর সাক্ষাৎ যম। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী তিনি ছিলেন রাজাকার, স্বাধীনতাবিরোধীদের যম। বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল হাজারী ছিলেন একজন বহুল আলোচিত, সমালোচিত দেশপ্রেমিক এবং এক সাহসী রহস্যময় পুরুষ।

তিনি ১৯৭১ সালে ২ নং সেক্টরের অধীনে ক্যাপ্টেন জাফর ইমামের পরামর্শে রাজনগর এলাকায় সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন। ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার পর রাজনগরে গিয়ে ওই এলাকার বেকার যুবকদের নিয়ে তিনি একটি সিভিল ডিফেন্স টিমও গঠন করেছিলেন।

ছাত্রাবস্থায় ফেনী কলেজে তৎকালীন ছাত্র মজলিশের (বর্তমান ছাত্র সংসদ) জিএস ছিলেন হাজারী। এরপর বৃহত্তর নোয়াখালী জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হন তিনি। পরে যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য পদেও দায়িত্বপালন করেন জয়নাল হাজারী। 

জয়নাল হাজারী ১৯৮৪ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ফেনী-২ (সদর) আসন থেকে ১৯৮৬, ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালে তিন মেয়াদে টানা ২০ বছর সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি।  এছাড়াও, ফেনী-২ (সদর) আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে একাধিকবার এমপি নির্বাচিত হন জয়নাল হাজারী।

জানা যায়, ১৯৯৬ সালের পরই তিনি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। হাজারীর বিরুদ্ধে বিরোধী রাজনৈতিক দল এমন কি নিজ দলের নেতাকর্মীদেরও নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ আছে। তার এই নির্যাতন ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে খবর পরিবেশন করতে গিয়ে সাংবাদিকেরাও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অনেককে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত, সর্বশেষ সংসদ সদস্য থাকাকালে তিনি ও তার বাহিনীর নির্যাতনের কথা সংবাদ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রকাশ হয়। তিনি আওয়ামী লীগের বাইরে ‘স্টিয়ারিং কমিটি’ নামে একটি নিজস্ব বাহিনী গড়ে তুলে সন্ত্রাসের রাজত্ব গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

১৯৯৬-২০০১ সালে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় ফেনীতে রাজনৈতিক সন্ত্রাসের শিকার হয়ে প্রায় ১২০ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী মারা যান। এই প্রেক্ষাপটের পেছনে হাজারীকে সন্দেহ করা হয়। এছাড়াও, রাজনৈতিক কারণে একে একে অনেক মামলার আসামি হন তিনি।

ফেনীর রাজনীতির একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা রয়েছে। বেগম খালেদা জিয়া বগুড়া কেন্দ্রীক রাজনীতির পাশাপাশি ফেনীর রাজনীতিতেও একটা প্রভাব রেখেছিলেন। তার পৈত্রিক নিবাস, এই বিবেচনায় তিনি ফেনীতে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। এই সময়ে খালেদা জিয়াকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো একমাত্র নেতা ছিলেন জয়নাল হাজারী। এজন্য হয়তো হাজারী বাহিনী বা তার নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী গড়ে তুলতে হয়েছিলো।

২০০১ সালে, তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ১৬ আগস্ট রাতে হাজারীর বাসভবনে অভিযান চালায় যৌথ বাহিনী। ১৭ আগস্ট, দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয় জয়নাল হাজারী।  ২০০৪ সালে, দল থেকে বহিষ্কার করা হয় জয়নাল হাজারীকে।‌ এরপর দীর্ঘদিন রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় ছিলেন তিনি। 

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ফের ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে ফিরেন তিনি। ওই বছরের ২২ ফেব্রুয়ারী হাইকোর্টে আত্মসমর্পণ করেন। পাঁচটি মামলায় ৬০ বছরের সাজা হয় তার। কিন্তু ৮ সপ্তাহের মাঝেই জামিন পান। পরে ১৫ এপ্রিল নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তাকে পাঠানো হয় কারাগারে। চার মাস কারাভোগের পরে ২০০৯ সালের ২ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্ত হন তিনি।

আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার দেড় দশক পর ২০১৯ সালে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদে ঠাঁই পান। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা হাজারীর চিকিৎসার জন্য একই বছরের সেপ্টেম্বরে ৪০ লাখ টাকা অনুদান দেন।

রাজনৈতিক জীবনের বাইরেও হাজারীর একটি ব্যক্তিগত জীবন ছিলো। আপাত দৃষ্টিতে তাকে লৌহ মানব মনে হলেও তিনি ছিলেন আপাদ মস্তক প্রেমিক মানুষ। এই প্রেমে ব্যর্থ হয়েই রয়ে যান চিরকুমার। একটি স্যাটেলাইট টেলিভিশনের একটি টকশো তে হাজারী কথা বলেছিলেন তার প্রেমিকা বিজুকে নিয়ে। বিজু নামের কেউ একজন, ওয়াদা করেছিল, কোনদিন বিয়ে করবে না তাকে ছাড়া, কিন্তু বিজু বিয়ে করেছেন। ওয়াদা ভঙ্গ করেছেন। সেকারণে বিজুর বিচার চেয়েছিলেন তিনি।

বিভিন্ন সময়ে রাজনীতিকদের ৬০ পেরোনো বয়সে বিয়ে ও ঘর-সংসার করতে দেখা গেলেও এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আমৃত্যুই ছিলেন ‘চিরকুমার’। অবশ্য মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি বলেছিলেন ধর্ম রক্ষার জন্য হলেও তিনি বিয়ে করতে চান। বিয়ে করবেন, কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে থাকবেন না। ইসলামে বিয়ে ফরজ সেজন্য বিয়ে করতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত তা আর হয়ে উঠেনি।

জেলা পর্যায়ের নেতা হয়েও একসময় জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনায় ছিলেন জয়নাল হাজারী। কিন্তু দল ক্ষমতায় থাকলেও গত ১০ বছর রাজনৈতিকভাবে অনেকটা নিঃস্ব ছিলেন তিনি। নিজের হাতেগড়া রাজনৈতিক শিষ্যদের বাধার কারণেই ফেনীর রাজনীতিতে আর প্রবেশ করতে পারেননি আলোচিত এ রাজনীতিবিদ।

‘জয়নাল হাজারী বলছি’, ‘বাধনের বিচার চাই’, ‘বাধন আছে বিজু কোথায়’, নামে তিনিটি বই প্রকাশ হয়েছিলো তার। ফেনী থেকে ‘হাজারিকা’ নামে প্রকাশিত একটি দৈনিকের সম্পাদনা করতেন তিনি।

গত ২৭ ডিসেম্বর সোমবার বিকেলে, রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন জয়নাল হাজারী। ল্যাব এইড হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা জানান, জয়নাল হাজারী হৃদযন্ত্র, কিডনি ও ফুসফুস সংক্রমণে ভুগছিলেন৷ 

উল্লেখ্য, গত ১৫ ডিসেম্বর তিনি এই হাসপাতালে ভর্তি হন৷ মাত্র ১২ দিনের মাথায় পাড়ি জমান পরপারে।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button