সাম্প্রতিক

ইংরেজিতে এমএ পাস তরুনির চা-ওয়ালী হয়ে উঠার গল্প

দিনের পর দিন পৃথিবীতে বাড়ছে কর্মহীনের সংখ্যা। বিশেষ করে করোনাকালীন পরিস্থিতিতে এই সমস্যা আরও প্রকট হচ্ছে। উচ্চশিক্ষার পরও চাকরি পাচ্ছে না অজস্র তরুণ-তরুণী৷ ফলে অনিশ্চয়তা ও হতাশার মধ্যেই দিন কাটছে তাদের। তবে অনেকেই এই হতাশা কাটিয়েই জেগে উঠছেন নতুন উদ্যোমে। মানসিক জেদ আর ইচ্ছাশক্তির জোরে আগামীর জন্য নতুন পদক্ষেপ নিচ্ছেন তারা। সেরকমই একজন হলেন ভারতের উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়ার কৈপুকুরের বাসিন্দা টুকটুকি দাস।

২৬ বছর বয়সী টুকটুকি দাস হাবড়া শ্রীচৈতন্য কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতক পাস করেন। এরপর  রবীন্দ্রভারতী মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দূরশিক্ষায় ইংরেজিতে ৬১ শতাংশ নম্বর নিয়ে স্নাতকোত্তর হয়েছেন বছরখানেক আগে। চাকরির পরীক্ষা দিয়েছেন একাধিক। কিন্তু সরকারি চাকরি তো দূরেই থাকুক, বেসরকারি কোনও সংস্থাতেও কাজের সুযোগ হয়নি তার।

টুকটুকির বাবা প্রশান্ত দাস বাড়িতেই মুদির দোকান চালান। সংসারের চাহিদা পূরন করতে মাঝে মধ্যে ভ্যানরিকশাও চালাতে হয় তাকে। ফলে একপ্রকার হতাশায় ডুবে গিয়েছিলেন ওই তরুণী। তবে এই পরিস্থিতিতেও মনের জোর হারাননি তিনি।

একদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎই তার নজরে আসে ‘প্রফুল্ল বিল্লরে এমবিএ চা ওলার’ কাহিনী। তা দেখেই একপ্রকার অনুপ্রাণিত হন টুকটুকি। তার মধ্যেও মানসিক জেদ ও একাগ্রতা তৈরি হয়। চাকরির মুখ চেয়ে বসে থাকলে চলবে না, নিজেকেই কিছু করতে হবে বলে মনস্থির করলেন। আর সেই মনের জোর আর জেদকে সম্বল করেই শুরু করেন জীবন সংগ্রামের নতুন লড়াই। 

দরিদ্র পরিবারের টুকটুকির ব্যবসায় দাঁড় কারানোর জন্য বড় পুঁজি ছিল না। তাই অল্প কিছু মূলধন নিয়েই ব্যবসায় শুরু করেন তিনি। ভারতের উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে চালু হয় তার স্বপ্নযাত্রা। কয়েকদিন আগে হাবড়া স্টেশনের দুই নম্বর প্লাটফর্মে ১৮শ’ টাকায় চার ফুট বাই চার ফুটের দোকান ভাড়া নেন টুকটুকি। 

দোকানের নাম দেন ‘এমএ ইংলিশ চায়েওয়ালি’। নামটি যে কাউকে বিস্মিত করবে। তবে এ নামের পেছনে জীবন সংগ্রামে হার না মানা এক তরুণীর গল্প জানার পর অনেকেই সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকায়। গত ১ নভেম্বর থেকে চায়ের দোকানটি চালু করেছেন তিনি। সেখানেই বিভিন্ন স্বাদের চা বিক্রি শুরু করেছেন তিনি। টুকটুকির দোকানে ৫ থেকে ৩৫ টাকা দামের নানান রকম চা মিলছে। একা হাতেই সব সামলাচ্ছেন তিনি।

কয়েকদিন আগে থেকেই এই রাজ্যে লোকাল ট্রেন চলা শুরু হয়েছে। তাই অন্যান্য স্টেশনের মত হাবড়া স্টেশনেও নিত্যযাত্রীদের ভিড় হচ্ছে। দোকানের এই নামকরণ দেখে নিত্যযাত্রীরা হতবাক। দোকানের নাম দেখেই সবাই বুঝতে পারছেন মেয়েটির শিক্ষাগত যোগ্যতা। এই উদ্যোগ দেখে অনেকেই উৎসাহ যুগিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায়ও রীতিমত ভাইরাল তিনি।

এমএ পাস করার পর চা দোকানি হয়েছেন আশাপাশের মানুষ কী বলছেন-জবাবে টুকটুকি জানান, প্রথম দিন অনেকে খুব উৎসাহ দিয়ে গেলেন। কিন্তু শুরুর দিকে এই দোকান চালু করার জন্য যথেষ্ট লড়াই করতে হয়েছে তাকে। তিনি জানিয়েছেন, একজন মেয়ে চায়ের দোকান দেবে একথা শুনে অনেকেই দোকান ভাড়া দিতে চাননি। অনেকে আবার এও বলেছেন, ‘এসব তোমার দ্বারা হবে না’। কথাগুলি তাকে শক্ত করে তুলেছে। বাড়ির লোকেরাও প্রাথমিকভাবে প্রস্তাবটা মেনে নিতে পারেননি।

টুকটুকির বাবা প্রশান্ত দাসও মেয়ের চা ওয়ালী হয়ে ওঠা প্রসঙ্গে প্রথমে খুশি হতে পারেন নি। তার স্বপ্ন ছিলো তার মেয়ে পড়াশোনা শেষে একজন শিক্ষিকা হবে। কিন্তু টুকটুকি তার বাবা-মা এবং দাদাকে ইউটিউব থেকে এই ধরনের উচ্চশিক্ষিতদের চায়ের দোকান দেখান এবং বোঝান। পরবর্তীতে তিনি তার চা বিক্রির সিদ্ধান্ত মেনে নেন। কারণ টুকটুকির স্বনির্ভর হওয়া জরুরি ছিলো। তার মতে, সবারই উচিত কোনো কাজকে ছোট মনে না করে এগিয়ে যাওয়া।

বর্তমানে ক্রেতা টানতে সন্ধ্যের দিকে চায়ের সঙ্গে সিঙ্গারাও বিক্রি করছেন তিনি। পরবর্তীতে মোমো বা এধরনের জনপ্রিয় কিছু খাবারও সেই তালিকায় থাকবে বলে জানিয়েছেন টুকটুকি। অবশ্য চায়ের স্বাদ কেমন তা বোঝানোর জন্য দোকান উদ্বোধনের দিন প্রথম দু’ঘণ্টা একেবারে বিনামূল্যে চা খাওয়ানো হয় স্টেশনে ট্রেন ধরতে আসা নিত্যযাত্রীদের। তবে ধীরে ধীরে তার দোকানে বাড়ছে ক্রেতার সংখ্যা। 

টুকটুকি বলেন, ‘আমি মনে করি,কোনো কাজই ছোট নয়। ইচ্ছে আছে, চায়ের দোকানটাকে দাঁড় করিয়ে নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি করব। নিজের পরিচিতি গড়ে তুলব।’

সবকিছু ঠিক ছিল, কিন্তু ‘এমএ ইংলিশ চায়েওয়ালি’ নামের এমএ পাশ মেয়ের চায়ের দোকান দেখে অনেকেই শিক্ষাব্যবস্থাকে দায়ী করেছেন। দায়ী করা হয়েছে রাজ্যের বিভিন্ন বিলম্ব হওয়া নিয়োগ প্রক্রিয়াকেও। 

তবে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থাকে কটাক্ষ করে দোকানের এমন নামকরণ কি না এমন প্রশ্নে তিনি জানান, ওসব কিছুই তার উদ্দেশ্য ছিলো না। দোকানের নামে নতুনত্ব রাখতেই এই নাম। তার মতে, শিক্ষিত হয়েও যেকোনো কাজে এগিয়ে আসা যায়, সেই বার্তাও হয়তো আছে এই নামে।

বর্তমানে টুকটুকির চায়ের দোকানের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন এই এমএ ইংলিশ চা ওয়ালী। চায়ের দোকান ছাড়াও টুকটুকি নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলও চালান। তার ইউটিউবের অনেক ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।

টুকটুকি এ বিষয়ে বলেন, ‘ভাইরাল হওয়ার পর থেকে অনেক মানুষ আমার সঙ্গে দেখা করতে ও উৎসাহিত করতে এসেছেন। তারা বিশ্বাস করেন, আমার গল্পটি ভারতের অন্যান্য বেকারদের জন্য অনুপ্রেরণীয় হতে পারে।’

সত্যিকার অর্থে, শুধু ভারতের নয়, সারা বিশ্বের মানুষের ই টুকটুকির থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button