আন্তর্জাতিক

কোরিয়ান ফুলবালকদের আদ্যোপান্ত

কে-পপের যারা ভক্ত নন, তারাও সম্ভবত ইন্টারনেটের কল্যাণে কে-পপ তারকাদের চেহারা অন্তত চিনে থাকেন। বেশ চড়া মেক-আপ, নিখুঁত ত্বক, ঝলমলে চুলসহ সব মিলিয়ে তাদের সাধারণ বিচারে অতটা ‘পুরুষালি’ মনে হয় না। বর্তমানে এই ট্রেন্ডের প্রসার এতটাই বেড়েছে যে ‘প্রিটি বয়’ হওয়ার জন্য কোরিয়ান ছেলেরা গণহারে দৌড়াচ্ছে প্লাস্টিক সার্জারি করাতে। 

হানা ইয়োরি দাঙ্গো, বয়েজ ওভার ফ্লাওয়ার্স, ইউ’র বিউটিফুল, ফ্লাওয়ার বয় রামিয়ুন শপ, মি টু ফ্লাওয়ার, ফ্লাওয়ার বয় নেক্সট ডোর ইত্যাদি হিট টিভি সিরিজের মাধ্যমে ২১ শতকের প্রথম দশকে সৌন্দর্যের এক নতুন ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ায়।

কিন্তু কীভাবে এলো এই ট্রেন্ড, কেনই বা জনপ্রিয় আর কীভাবেই বা টিকে আছে! 

প্রথম থেকেই কে-পপ এ ছিল পাশ্চাত্য সংগীতের প্রভাব। ১৮৮৫ সালের দিকে হেনরি আপেনজিলার নামের এক ব্যক্তি আমেরিকান ও ব্রিটিশ লোকসংগীতগুলো কোরিয়ান ভাষায় রূপান্তর করে স্কুলের শিশুদের শেখাতেন। মূলত সেখান থেকেই শুরু। তবে এ ধারার স্বাতন্ত্র্য হলো-এতে একই সঙ্গে রক, এক্সপেরিমেন্টাল, আর অ্যান্ড বি, ওয়েস্টার্ন পপ ও হিপহপের সমন্বয় রয়েছে। আবার কে-পপে একটুখানি র‌্যাপ না থাকলেও চলছে না।

মূলত নব্বইয়ের দশকে আধুনিক কে-পপের সূচনা ঘটে। ১৯৯২ সালে, ‘সিও তাইজি অ্যান্ড বয়েজ’ নামের তিন সদস্যের একটি কে-পপ ব্যান্ড আত্মপ্রকাশ করে। কোরিয়ান সংগীতে বড় পরিবর্তন আনে ওরা। সিও তাইজির দেখানো পথেই ১৯৯৬ সালে প্রথম আইডল বয়ব্যান্ড এইচওটির অভিষেক। এই ব্যান্ডও সবার মন জয় করে। ১৯৯৭ সালে আসে ‘অল গার্লব্যান্ড এসইএস’। ২০০০ সাল থেকে কে-পপ ধারার জনপ্রিয়তার কারণে টিভিএক্সকিউ, বিগব্যাং, বোয়া, শাইনি, মামামো, গট সেভেন, মোমোল্যান্ড, রেড ভেলভেট, আইকন, টোয়াইস, গার্লস জেনারেশন, সুপার জুনিয়র, বিটিএস, ব্ল্যাক পিংকসহ আরো অনেক কে-পপ ব্যান্ডের আগমন ঘটে। বর্তমানে চার শর বেশি কে-পপ ব্যান্ড ও সলো আর্টিস্ট রয়েছেন। সুম্মি, তেইমিন, জেনি কিম, পার্ক বমসহ আরো অনেকেই সলো আর্টিস্ট হিসেবে এখন খ্যাতির চূড়ায়।

এর বাইরে কিছু ঐতিহাসিক ব্যাখ্যাও আছে। ধারণা করা হয়, কোরীয় উপদ্বীপে শিল্লা রাজবংশের শাসনকালে (৫৭ খ্রি.পূ থেকে ৯৩৫ খ্রি) সামরিক ও সাংস্কৃতিক অভিজাতরা ছিল হোয়ারাং, অর্থ করতে গেলে যেটা অনেকটা ‘ফ্লাওয়ার বয়’ই হয়। চীনা সূত্রগুলো থেকে এই অভিজাতদের শারীরিক সৌন্দর্যের বিবরণই কেবল পাওয়া যায়। দ্বাদশ শতকের দিকে জেনারেল ওয়াং কেওনের সময় পরিস্থিতি পাল্টে গেল। উত্তর ও দক্ষিণের দুই দ্বীপ এক হলো আর হোয়ারাংদের যশ কমতে লাগল। 

মেট্রোসেক্সুয়ালদের সমকামী হিসেবেই সমাজের অনেকে দেখে থাকেন। অথচ কে-পপ সিরিজগুলোতে দেখানো হয়, এই মেট্রোসেক্সুয়াল ফ্লাওয়ার বয়রাই প্লেবয়ের মতো সমানে মেয়ে পটিয়ে যাচ্ছে! গণমাধ্যমের এজেন্ডা সেটিং তত্ত্ব অনুযায়ী এসবেই প্রভাবিত হচ্ছে বাস্তবতা, পাল্টাচ্ছে মেয়েদের চাহিদা। ‘ফ্লাওয়ার বয়’ হওয়াটাকেই তখন ছেলেদের আকর্ষণীয় দিক হিসেবেই মানছেন মেয়েরা। ওদিকে মেয়েদের কাছে ক্রমশ জনপ্রিয় হচ্ছে বলেই অনেকের কাছে ‘উদ্ভট’ হওয়া সত্ত্বেও এই ট্রেন্ড পাচ্ছে প্রসার।

ফ্লাওয়ার বা প্রিটি বয়েজ ট্রেন্ডের ক্ষেত্রে কে-পপ ভক্তদের অনেকেই অভিনেতা বে ইয়ং-জুনকে অগ্রপথিক মানেন। তারপর ‘প্রিটি’ অভিনেতা হিসেবে এলেন কিম হিয়ুন জুং, হিয়ুন বিন, কিম বাম প্রমুখ। শুধু অভিনেতারাই নন, এগিয়ে এলেন গায়কেরাও। সুপার জুনিয়র, শাইনি, বিস্টের মতো ব্যান্ডের ‘ফ্লাওয়ার বয়’ সদস্যরাই তাদের ব্যান্ডগুলোকে নিয়ে গেলেন খ্যাতির চূড়ায়। বিগ ব্যাং ব্যান্ডের সদস্যরা তো চোখে আই-লাইনার পরাকে বানিয়ে দিলো নতুন ট্রেন্ড!

দে-সে নাম, মেইনস্ট্রিম ম্যান ইত্যাদি রিয়েলিটি শো-তে অংশগ্রহণকারী প্রায় সকলেই কমবেশি সার্জারির আশ্রয় নিয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই কেউ যেহেতু অত নিখুঁত ‘ফ্লাওয়ার’ হিসেবে জন্ম নেয় না, সুতরাং প্লাস্টিক সার্জারির শরণ তাদের নিতেই হয়। 

তারুণ্য ধরে রাখতেও তারা শরণ নেন আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার। ত্বকের বলিরেখা দূর করতে আর ঢিলে হয়ে যাওয়া চামড়া টানটান করতে ছেলেরা সস্তায় করাচ্ছেন বোটক্স ও ফিলার্স সার্জারি। ঠিক এ কারণেই দক্ষিণ কোরিয়া প্লাস্টিক সার্জারির দিক দিয়ে বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম দেশ। এই দেশটির প্রতি ৪৩ জনে ১ জন প্লাস্টিক সার্জারি করে থাকেন!

ঘাম ঝরিয়ে সিক্স প্যাক বানানোর জন্যে আমরা মূলত জিমনেসিয়ামকেই বেছে নেই। কিন্তু কোরিয়ান ব্যস্ত ছেলেরা এই খানেও নিচ্ছেন সার্জারির সাহায্য। শরীরের অতিরিক্ত চর্বি বের করে দিয়ে পেশীর আকার দেন শল্যচিকিৎসক। একইভাবে বক্ষপেশীর চর্বিও অপসারণ করান অনেকে ছেলে। ফাস্টফুডের বিস্তারে কোরিয়া বেশ এগিয়ে। তাই স্থূলতাও যেমন হু হু করে বাড়ছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্লাস্টিক সার্জারি করে শরীরের নানা জায়গার মেদ কমানোর প্রবণতা।

কোরিয়ার অর্থনীতিতেও কিন্তু কে-পপ আলোচনায়। প্রিয় ব্যান্ডের কনসার্ট দেখতে বিদেশ থেকেও ভক্তরা দক্ষিণ কোরিয়ায় যাচ্ছে এখন। প্রতিবছর নতুন করে এক শরও বেশি কে-পপ গ্রুপ আসছে। 

কোরিয়ান ভাষা না বুঝলেও বাংলাদেশে কে-পপের ফ্যানবেজ বড় হচ্ছে ইদানীং। জনপ্রিয়তার নেপথ্যে কে-পপের ফ্যাশন ও চোখধাঁধানো নাচের ভূমিকা ও অপরিসীম। 

তবে কে-পপ গানের কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য আছে। গ্রুপগুলো তাদের গানকে সাজায় যুগের নামে। প্রতিটি গান ও অ্যালবামের পেছনে থাকে একটি করে গল্প। গল্পটাকে আবার ‘এরা’ বলা হয়। যেমন বিটিএসের আছে উইংস এরা, ডার্ক অ্যান্ড ওয়াইল্ড এরা, এক্সো’র আছে উলফ এরা, গ্রোউল এরা, এনসিটির চুইংগাম এরা, চেরি বম্ব এরা ইত্যাদি।

অনেক কে-পপ আর্টিস্ট নিজেদের নানা সমাজসেবামূলক কাজে জড়িত রেখেছেন। ইউনিসেফের সঙ্গে লাভ মাইসেলফ নামের একটি ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে বিটিএস। যেখানে শিশু-কিশোরদের প্রতি সহিংসতা রক্ষার্থে তারা কাজ করছে। নিজেদের ফ্যানবেজকে কাজে লাগিয়ে তহবিল সংগ্রহেও কে-পপ শিল্পীরা অনেক এগিয়ে।

এটা সত্যি যে, সৌন্দর্য নিয়ে তাদের অতিমাত্রার খুঁতখুঁতেপনা, শুচিবায়িতা অনেকক্ষেত্রেই বাড়াবাড়ি রকমের। কিন্তু সৌন্দর্যের একটি লিঙ্গ নিরপেক্ষ মানদণ্ড দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে কোরিয়ানরা। ছেলে কেন সাজতে পারবে না- এমন একটি অসামাধানযোগ্য প্রশ্নকে তারা এনেছে সামনে। সৌন্দর্য অবশ্যই আপেক্ষিক। একজন ছেলের মসৃণ গালের সাথে গোলাপি ঠোঁট আমাদের ভালো না-ই লাগতে পারে। কিংবা কার্গো প্যান্ট পরা বব কাটের মেয়ের চেয়ে দীর্ঘকেশী-শাড়িপরিহিতাই আপনার অধিক প্রিয় হতে পারে। কিন্তু কোনটা গ্রহণযোগ্য আর কোনটা নয়, সে তকমা দেয়ার অধিকারও আমাদের নেই। পুরোটাই যে ব্যক্তিগত রুচির প্রশ্ন। ঠিক-বেঠিক নির্ধারণের দায়িত্ব ও যার যার নিজের হাতেই ছেড়ে দেওয়া উচিত।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button