জীবনী

কে এই নাহিদ রেইন্স!

বেশ কয়েকদিন থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘নাহিদ রেইন্স’ নামটি ঘুরাফেরা করছে। তবে তার নামের আগে যোগ হচ্ছে ভন্ড, প্রতারক, অর্থ আত্মসাৎকারী এবং নারীলিপ্সু নামক কিছু বিশেষন।

কে এই নাহিদ রেইন্স? কেনই বা এত বিতর্কিত এই ব্যাক্তি! 

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নাহিদ রেইন্স এর পুরো নাম নাহিদ করিম হেলাল। পটিয়া পৌর সদরের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গোলাম রহমান সওদাগরের বাড়ির অবসরপ্রাপ্ত কাস্টম কর্মকর্তা এটিএম আবুল কাশেমের ছেলে সে। তারা দুই ভাই। নাহিদ রেইন্সের বাবা এটিএম আবুল কাশেম দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত। নাহিদ অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করতে যায়। কিন্তু সেখানে বিদেশী অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা আত্মসাৎ করলে তাকে বহিষ্কার করা হয়। তাই বাধ্য হয়ে পড়াশোনা শেষ না করেই দেশে ফিরে আসে সে। চট্টগ্রামের হালিশহরে কে-ব্লকে তার বাসা ও স্টুডিও। সেখান থেকেই বিভিন্ন সময়ে লাইভ করেন রেইন্স।

বিভিন্ন সময় বিতর্কিত ভিডিও তৈরী করে নিজের দিকে মানুষকে প্রলুদ্ধ করত এই রেইন্স। তার জন্য মূল অস্ত্র হিসেবে ব্যাবহার করতো (Bangladeshism) এবং (NahidRains Pictures) নামে তার দুটি ফেইসবুক পেইজ ও ইউটিউব চ্যানেল। বিভিন্ন সময় তার মতাদর্শের ভিত্তিহীন ভিডিও তৈরী করে জনগণের তোপের মুখেও পড়েছেন তিনি। এছাড়া নারী কেলেঙ্কারি, টাকা আত্মসাৎ, জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত এই নাহিদ রেন্স।

নাহিদ একসময় বাংলাদেশিজম নামে একটা মুভমেন্ট চালু করেছিল। শুরুর দিকে সেই বাংলাদেশিজম থেকেই আওয়ামী লীগ বিরোধী প্রোপাগান্ডা চালানো হতো। তবে সে নিজের টাইমলাইনে চুপচাপই ছিল। সে সময় তার বিরুদ্ধে মানুষকে প্রতারিত করার বিস্তর অভিযোগ ছিল। একসময় হঠাৎ কোন কোন নেতার সাথে সখ্যতা বাড়িয়ে আওয়ামী লীগ বনে গেছে সে। মূলত প্রতারণার বিষয়গুলো জায়েজ করতেই সে আওয়ামী লীগের ছায়ায় আসার চেষ্টা করেছে বলেই অনেকের ধারনা।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, আলোচিত এই নাহিদ হেলালের বিরুদ্ধে একাধিক প্রতারণা ও নারীকে যৌন হয়রানির অভিযোগও রয়েছে। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন প্রবাসী মিরাজ নাঈমের কাছ থেকে কয়েক বছর আগে বাংলাদেশি মুদ্রামানে নগদ ও চেকের মাধ্যমে আট লাখ টাকা অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে নাহিদ এর আগে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন।

ইসলাম নিয়েও বিভিন্ন সময় কুরুচিপূর্ণ কথা বলেন এই নাহিদ রেইন্স। এর আগে আলেমদের বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বক্তব্যকে আংশিক প্রচার করে ভন্ড অখ্যা দিয়ে ভিডিও তৈরী করে অপপ্রচার করে। এছাড়া বিজ্ঞানের বিগ ব্যাং থিউরিকে অপব্যাখ্যা দিয়ে পড়েছেন জনগণের রোষানলেও। এছাড়াও বিভিন্ন সময় বিতর্কিত ভিডিও তৈরী করে বাড়িয়েছেন নিজের ইউটিউব চ্যানেলের সাব্সক্রাইবার। হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পাশ করতে পারেননি এই প্রতারক। সেইসাথে তার বিরুদ্ধে রয়েছে পরীক্ষায় জালিয়াতি করার অভিযোগ। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নকল করার দায়ে বহিষ্কার করা হয় তাকে। এছাড়া এমনকি খোদ আওয়ামী লীগ নেতাদের পরিবারের সঙ্গেও প্রতারণা করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

জানা গেছে, ২০১৯ সালের শেষ দিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ ভূমিকা দেখা যায় সক্রিয় নাহিদ রেইন্সের। মূলত আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন কর্মকান্ড নিয়ে প্রবাসে কয়েকজন সংবাদকর্মীর ব্যাপক সমালোচনার জবাব দিতেই অনলাইনে সরব হন তিনি। তিনি যেসব ভিডিও কনটেন্ট, লাইভ টকশো করতেন তাতে সরকারের বিভিন্ন সমালোচনার জবাব দেওয়া চেষ্টা চালান। তবে তার ভিডিও ফলোকরা অনেক অনলাইন দর্শকের দাবি নাহিদের প্রায় সব ভিডিওই একপেশে এবং তথ্য-উপাত্তে বিভ্রান্তিকর।

বিভিন্ন সময় সময় বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়েদের মডেল হওয়ার লোভ দেখিয়ে হেনস্তা করত এই নাহিদ। চট্টগ্রামের এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক মেয়েকে মডেল বানানোর নামে ন্যূড ফটোশুট করার প্রস্তাব দেয় সে। এরপর ঐ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী রাজি না হলে বিভিন্ন সময় তাকে জোরপুর্বক হেনস্তা করার চেষ্টা করে। 

সিনেমাটোগ্রাফি শেখানোর নামে অনেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন তিনি। নাহিদের কাছে সিনোমাটোগ্রাফি শিখতে এসেছিলেন চট্টগ্রাম কমার্স কলেজে পড়ুয়া একজন যুবক। নাহিদ তার কাছ থেকে প্রথম দিনই কোর্স ফি বাবদ একটা মোটা অংকের টাকা দাবি করে। এরপর ঐ শিক্ষার্থী তার বন্ধুদের থেকে ধার করে সে টাকা জোগাড় করে নাহিদকে দেয়। কিন্তু দিন যেতে থাকে, নাহিদ তাকে কিছুই শেখায় না। একটা পর্যায়ে টাকা ফেরত চাইলে ঐ শিক্ষার্থীকে হুমকি দেয় রেইন্স।

এছাড়াও, বিভিন্ন সময় পরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করার প্রজেক্ট নিয়ে মাঠে নামে রেইন্স। ইতিহাস বিকৃত করে ভিডিও বানিয়ে তার পেজে আপলোড করে জনগণের রোষানলে পড়েন এই নারীলিপ্সু।

এত কুকর্ম করেও মোটামুটি পার পেয়ে যাচ্ছিলেন এই নাহিদ। কিন্তু সম্প্রতি ক্ষমতাসীন সরকারের সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানের ঘটনায় আবার সমালোচানায় উঠে এসেছে  নারীলিপ্সু ইউটিউবার নাহিদ রেইন্স। দেখা গেছে মুরাদ হাসানকে লাইভে নিয়ে এসে উস্কে দিয়ে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নাতনিকে নিয়ে বিভিন্ন ধরণের কুরুচিপূর্ণ কথা বলেন। শুধু তাই নয় ওই সাবেক প্রতিমন্ত্রীর করা অশ্লীল মন্তব্যে বিভিন্ন প্রকার অশ্লিল অঙ্গভঙ্গি করে এই নাহিদ রেন্স।

অভিযোগ রয়েছে, নাহিদ ওই লাইভে সাবেক প্রতিমন্ত্রীকে অশালীন মন্তব্য করার জন্য উস্কানিমূলক একাধিক প্রশ্ন করেছেন। আর এসব অভিযোগের ভিত্তিতে নাহিদের সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। বিষয়টি নিশ্চিত করে ডিবির যুগ্ম কমিশনার হারুন অর রশিদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘আমরা যতটুকু জেনেছি নাহিদ নামে ছেলেটির কাছে বোধহয় একটি টিভি ক্যামেরা আছে। সে বিভিন্ন সময় মন্ত্রী মহোদয়কে উসকানিমূলক কথা বলেছে। তার বিষয়ে আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি।’

যদিও এমন রশি টানাটানির মধ্যে নাহিদ হেলাল সেদিনের টকশোর ঘটনায় নিজেকে একেবারেই নির্দোষ দাবি করে বলছেন, মন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ন্ত্রণের কোনো সুযোগই তার ছিল না। তবে মন্ত্রীর সেসব বক্তব্যে তখনই বিব্রত হয়েছিলেন নাহিদ এবং মন্ত্রী তার উপযুক্ত সাজাই পেয়েছেন। যদিও টকশোতে মন্ত্রীকে যথেষ্ট উস্কানি দেওয়ার পাশাপাশি মন্ত্রীর কথাবার্তার সাথে আরও কিছু যোগ করার ক্ষেত্রে তাকে অতিউৎসাহী হিসেবেই দেখা গেছে। স্বাভাবিকভাবেই কয়েক ঘন্টার মধ্যে নাহিদের সেই অবস্থান থেকে সরে এসে পুরো উল্টো অবস্থান নেওয়া অবাক করেছে নেটিজেনদের।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button