জীবনী

বিপিন রাওয়াতঃ ভারতের প্রথম চিফ অফ স্টাফ জেনারেল

সম্প্রতি মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ভারতের প্রথম চিফ অফ স্টাফ জেনারেল বিপিন রাওয়াত। এমআই-১৭ভি৫ হেলিকপ্টার টি বিধ্বস্ত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান (সিডিএস) বিপিন রাওয়াতসহ আরও ১৩ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছেন দেশটির বিমান বাহিনী। বিপিন রাওয়াতের মৃত্যুর পরপরই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও তার মৃত্যুর খবর গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে।

কিন্তু, কে ছিলেন এই বিপিন রাওয়াত?

বিপিন রাওয়াত ১৯৫৮ সালের ১৬ মার্চ, ভারতের উত্তরাখণ্ডের পাউরিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পূর্ব প্রজন্মের অনেকেই ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। তার বাবা লক্ষ্মণ সিং রাওয়াত ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকাকালীন লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে উন্নীত হয়েছিলেন। তার মা ছিলেন উত্তরকাশীর প্রাক্তন বিধায়ক কিষাণ সিং পারমারের মেয়ে। বিপিন রাওয়াতের স্ত্রী মধুলিকা রাওয়াত আর্মি ওয়েলফেয়ারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি সেনা মহিলা কল্যাণ সমিতির সভাপতিও ছিলেন। বিপিন রাওয়াতের দুই কন্যা সন্তান রয়েছেন। তাদের নাম কৃতিকা রাওয়াত ও তারিণী রাওয়াত। 

বিপিন রাওয়াত দেরাদুনের ক্যামব্রিয়ান হিল স্কুল এবং সিমলার সেন্ট এডওয়ার্ডস স্কুল থেকে তার স্কুলজীবন শেষ করেন। এরপর তিনি খাদাকওয়াসলার জাতীয় প্রতিরক্ষা একাডেমি এবং দেরাদুনের ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমিতে যোগ দেন। সেখানে তাকে ‘সোর্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়।

রাওয়াত ওয়েলিংটনের ডিফেন্স সার্ভিসেস স্টাফ কলেজ (ডিএসএসসি) থেকে প্রশিক্ষণ নেন। এছাড়া তিনি ইউনাইটেড স্টেটস আর্মি কমান্ড এবং কানসাসের ফোর্ট লিভেনওয়ার্থের জেনারেল স্টাফ কলেজে উচ্চতর কমান্ড কোর্স সম্পন্ন করেন। তিনি ডিফেন্স স্টাডিজে এমফিল ডিগ্রির পাশাপাশি মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যানেজমেন্ট এবং কম্পিউটার স্টাডিজে ডিপ্লোমা করেছেন।

১৯৭৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর, তার পিতার ইউনিট ৫/১১ গোর্খা রাইফেলসে প্রথম কমিশন হাতে পান বিপিন রাওয়াত। তিনি ১০ বছর জঙ্গীবিরোধী অভিযানে নিয়োজিত থেকেছিলেন। মেজর হিসেবে তিনি জম্মু ও কাশ্মীরের উরিতে একটি কোম্পানির কমান্ডের নেতৃত্ব দেন। এছাড়াও, তিনি ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে (মনুসকো) সপ্তম চ্যাপ্টার মিশনে বহুজাতিক ব্রিগেডের নেতৃত্ব দেন। সেখানে তিনি দু’বার ফোর্স কমান্ডারের প্রশংসায় ভূষিত হন।

মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতির পর রাওয়াত ১৯তম পদাতিক বিভাগের (উরি) জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এছাড়াও, লেফটেন্যান্ট জেনারেল হিসেবে তিনি পুনেতে দক্ষিণ সেনাবাহিনীর দায়িত্ব গ্রহণের আগে ডিমাপুরে সদর দপ্তর তৃতীয় কোরের নেতৃত্ব দেন।

বিপিন রাওয়াত বিভিন্ন সময় স্টাফ অ্যাসাইনমেন্টের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এরমধ্যে ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমিতে (দেরাদুন) ইন্সট্রাকশনাল টেনার, মিলিটারি অপারেশনস ডিরেক্টরেটের জেনারেল স্টাফ অফিসার গ্রেড-২, কেন্দ্রীয় ভারতের রি-অরগানাইসড আর্মি প্লেইনস ইনফ্যান্ট্রি বিভাগের (আরএপিআইডি) লজিস্টিক স্টাফ অফিসার, মিলেটারি সেকরেটারিস ব্রাঞ্চের কর্নেল মিলিটারি সেক্রেটারি এবং ডেপুটি মিলিটারি সেক্রেটারি, জুনিয়র কমান্ড উইং-এর সিনিয়র ইন্সট্রাক্টরসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও, তিনি ইস্টার্ন কমান্ডের মেজর জেনারেল জেনারেল স্টাফ (এমজিজিএস) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯৯ সালে, কারগিল যুদ্ধের পর বিশেষ সেনা কম্যান্ড হিসেবে নিযুক্ত হন বিপিন রাওয়াত। পরবর্তীতে একজন সুযোগ্য সেনা আধিকারিক হিসেবে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন তিনি।

২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি, আর্মি কমান্ডার গ্রেডে উন্নীত হওয়ার পর রাওয়াত জেনারেল অফিসার কমান্ডিং-ইন-চিফ (জিওসি-ইন-সি) সাউদার্ন কমান্ডের পদ গ্রহণ করেন। সেখানে অল্প সময়ের জন্য দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর ভাইস চিফ অব আর্মি স্টাফের পদ গ্রহণ করেন।

জেনারেল বিপিন রাওয়াত ছিলেন ভারতের প্রথম প্রতিরক্ষা প্রধান (সিডিএস)। ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি, তার উপর এই কর্তৃত্ব আরোপ করা হয়। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমান বাহিনী- এই তিনটি পরিষেবাকে একীভূত করতে এই পদ তৈরি করে চিফ অব ডিফেন্স স্টাফের (সিডিএস) দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। সিডিএস-এর দায়িত্ব গ্রহণের আগে তিনি চিফস অব স্টাফ কমিটির ৫৭তম চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন।

জেনারেল রাওয়াত সেনাবাহিনীতে তার ৪২ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তার বিশিষ্ট পরিষেবার জন্য বেশ কয়েকটি বীরত্ব এবং অতি বিশেষ সেবা পদক পেয়েছেন।

মিলিটারি-মিডিয়া অধ্যয়নের ওপর গবেষণার জন্য চৌধুরী চরণ সিং বিশ্ববিদ্যালয় বিপিন রাওয়াতকে পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করে। ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমি তাকে ‘সোর্ড অফ অনার’ পুরস্কারে ভূষিত করেছিল।

এছাড়াও, তিনি পরম বিশিষ্ট সেবা পদক, উত্তম যুদ্ধ সেবা পদক (ইউওয়াইএসএম), অতি বিশিষ্ট সেবা পদক (এভিএসএম), যুদ্ধ সেবা পদক (ওয়াইএসএম), সেনা পদক, বিশিষ্ট সেবা পদক (ভিএসএম) ইত্যাদি পুরস্কারে পেয়েছেন।

গত ৮ ডিসেম্বর, তামিলনাড়ুর কুন্নুরের গভীর জঙ্গলে স্থানীয় সময় বুধবার বেলা ১২টা ৪০ মিনিটে  দুর্ঘটনার কবলে পড়ে বিপিন রাওয়াতকে বহনকারী সেনা হেলিকপ্টারটি। ওই দুর্ঘটনায় বিপিন রাওয়াত আর স্ত্রী মধুলিকা রাওয়াতসহ ১৩ জন আরোহী নিহত হয়েছেন।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি কুন্নুরের এক স্থানীয় বাসিন্দার খবর প্রকাশ করেছে, যেখানে তিনি দাবি করেছেন, হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হওয়ার পরও ভারতের প্রতিরক্ষা বাহিনী প্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াত বেঁচে ছিলেন। শিভ কুমার নামে এই ব্যক্তি বলছেন, নিলগিরির পাহাড়ের এক চা বাগানের আকাশে হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হওয়ার সময় তিনি আগুনের বড় গোলা দেখতে পান। এসময় হেলিকপ্টার থেকে তিনজনকে নিচে পড়ে যেতে দেখেন তিনি। এদের মধ্যে একজন ছিলেন পুরুষ। তিনি তার কাছে পানি খেতে চান। এরপর উদ্ধারকারীরা তাকে অকুস্থল থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। পরে তিনি জানতে পারেন, সেই পুরুষটি ছিলেন জেনারেল রাওয়াত।

বিপিন রাওয়াতের মরদেহ গত ৯ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার, দিল্লিতে নেওয়া হয়। ১০ ডিসেম্বর শুক্রবার, দিল্লি ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং তিন বাহিনী প্রধান তাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।

তার জীবনাবসানের সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হল ভারতের প্রথম সেনা সর্বাধিনায়কের অত্যন্ত গৌরবময় অধ্যায়।

তবে কি কারণে এই দূর্ঘটনা ঘটলো তা এখনো নিশ্চিত ভাবে জানা যায়নি। বিধ্বস্ত হেলিকপ্টারের ব্ল্যাক বক্সটি উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির সরকার। কর্মকর্তারা বলছেন, এ দুর্ঘটনার কারণ জানার লক্ষ্যে ফ্লাইট রেকর্ডারের তথ্য পরীক্ষা করে দেখা হবে।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button