জীবনীসাম্প্রতিক

কে এই বিতর্কিত ডা. মুরাদ হাসান!

এক চিত্রনায়িকাকে ধর্ষণের হুমকি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের সম্পর্কে কুরুচিকর মন্তব্য করার পর আলোচনা-সমালোচনার শীর্ষে এখন সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান। 

এর আগে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে অশালীন মন্তব্য, খালেদা জিয়া ও তার নাতনি জাইমা রহমানকে নিয়ে এক লাইভ আলোচনায় কুরুচিকর মন্তব্য করে ব্যাপক সমালোচনায় পড়েন ডা. মুরাদ৷ তার বিতর্কিত কাজের জন্যে অনেকের কাছে তিনি মুরাদ টাকলা হিসেবেও পরিচিত।

কিন্তু কে এই মুরাদ? কি তার পরিচয়? কোথা থেকে উঠে এলেন তিনি?

ডা.মো. মুরাদ হাসান ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ অক্টোবর, জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলাধীন দৌলতপুর গ্রামে এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতার নাম অ্যাড. মতিয়র রহমান তালুকদার, এবং মাতা. মনোয়ারা বেগম। তার পিতা ছিলেন একজন বরেণ্য রাজনীতিবিদ ও প্রখ্যাত আইনজীবী। তিনি রণাঙ্গনে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণকারী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক (জামালপুর-শেরপুর) ও মুজিব নগর সরকার কর্তৃক নিয়োগকৃত ম্যাজিস্ট্রেট। ব্যক্তিগত জীবনে ডা: মো: মুরাদ হাসান এক কন্যা ও এক পুত্রসন্তানের জনক। তার স্ত্রী ডা. জাহানারা এহসানও পেশায় একজন ডাক্তার।

ডা. মো: মুরাদ হাসান শৈশবে জামালপুর শহরস্থ কিশলয় আদর্শ বিদ্যা নিকেতনে তার প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে, জামালপুর জেলা স্কুল হতে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে প্রথম বিভাগ (স্টার মার্ক) পেয়ে এস.এস.সি পাশ করেন এবং ১৯৯২ সালে, ঐতিহ্যবাহী ঢাকা নটরডেম কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে প্রথম বিভাগে (স্টার মার্ক) পেয়ে এইচ.এস.সি পাশ করেন। তিনি ২০০১ সালে, ঐতিহ্যবাহী ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হতে কৃতিত্বের সাথে এমবিবিএস পাশ করেন। পরবর্তীতে তিনি ২০০৪-২০০৫ সালে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে ‘প্লাস্টিক এন্ড রিকন্সট্রাক্টিভ সার্জারি’ এর ওপর পোস্ট গ্র‍্যাজুয়েশন ট্রেইনিং সম্পন্ন করেন। অতঃপর ২০১১ সালে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হতে ‘রেডিয়েশন অংকোলোজি’ এর ওপর এম. ফিল ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।

জানা গেছে, রাজনৈতিক জীবনে তিনি ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ শাখার কার্যকরী সদস্য, ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক, ২০০০ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ শাখার সভাপতি এবং ২০০৩ সালে পঞ্চম কংগ্রেসে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যকরী সদস্য নির্বাচিত হন।

তবে বিএনপি ও ছাত্রদলের প্রথম সারির বেশ কয়েকজন নেতা জানান, ১৯৯৬-৯৮ সেশনে ছাত্রদলের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ শাখার প্রচার সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন মুরাদ।

তাদের মতে, ১৯৯৬ সালের শেষ দিকে বা ১৯৯৭ সালের শুরুতে মুরাদ হাসান ছাত্রলীগে যোগ দেন। ওইসময় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ছাত্রদলকে হোস্টেল ছাড়া করে ছাত্রলীগ। ছাত্রদলের এই কোণঠাসা পরিস্থিতিতে মুরাদ হাসান ছাত্রলীগে যোগ দেন। পরে তিনি মেডিকেল শাখার সভাপতি হন। নিজেদের গ্রুপে মারামারি করে মুরাদ হাসানের আঙুল কাটা পড়ে, পরে সার্জারি করেন বলেও জানান ওই কমিটির তৎকালীন সভাপতি  ডা. মেহবুব কাদির।

২০০৮ সালে,  নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে জামালপুর-৪ (সরিষাবাড়ী, মেস্টা ও তিতপল্যা) আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মুরাদ হাসান। এরপর ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও নৌকা প্রতীকে ১৪১, জামালপুর-৪ সংসদীয় আসন থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে ২য় বারের মতো সংসদ সদস্য হন তিনি। স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) আজীবন সদস্য মুরাদ হাসান।

তিনি ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তারপর ১৯ মে ২০১৯ খ্রি. তারিখ থেকে তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন।

ডাঃ মুরাদ হাসান সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তোলে এই বছরের অক্টোবরে। রাষ্ট্র ধর্ম নিয়ে অনুচিত মন্তব্য করার পরেই মোটামুটি সবার টাইমলাইনে আসেন এই ব্যক্তি। তার এমন বিকৃত মানসিকতার জন্য অনেকেই তাকে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত বলে থাকেন।

অন্যদিকে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর এমন কটুক্তি পূর্ণ মন্তব্যকে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলছেন মানবাধিকার কর্মীরা। বাংলাদেশ মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান ডয়চে ভেলেকে বলেন, “তথ্য প্রতিমন্ত্রী যে মন্তব্য করেছেন তাতে তার স্বরূপ উন্মোচন হয়েছে। তিনি যাকে ছোট করতে চেয়েছেন, এই ঘটনায় তার চেয়ে তিনি নিজের নিকৃষ্টতম প্রতিচ্ছবি দেখিয়েছেন। কোনো নারীকে নিয়ে এমন মন্তব্য করার অধিকার কেউ রাখেন না। আর রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় থেকে কেউ তো অবশ্যই এই ধরনের কথা বলতে পারেন না।”

অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, নিজের অশালীন এবং কুরুচিপূর্ণ কর্মকান্ডের জন্যে বারবার সমালোচিত হওয়া স্বত্তেও তার আচরনে কোনো পরিবর্তন হচ্ছিলো না। অতঃপর গতকাল ৬ ডিসেম্বর, ২০২১ সালে কল রেকর্ড ফাঁসের ঘটনায় দিনভর আলোচনা-সমালোচনার মুখে সোমবার রাতে ডা. মুরাদ হাসানকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যার ফলস্বরূপ অবশেষে মন্ত্রীপরিষদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন নারীদের নিয়ে কটুক্তি করা এই টাকলা মুরাদ।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button