সংবাদ

২০ বছরে ২ মিলিয়ন গাছ লাগিয়ে মরুভূমিকে অরণ্যে রূপ দিলেন এক দম্পত্তি

ব্রাজিলের একটি পাহাড়ি অঞ্চল। যার চারিদিক জুড়ে ছিলো শুধু খাঁ খাঁ জমি। কোথাও গাছ, ঘাস, লতাপাতা বা ঝোঁপঝাড়ের তেমন অস্তিত্বটুকুও ছিল না। এই চিত্র ২০ বছর আগের। এখন সেই অঞ্চল সবুজের অরণ্য। শুষ্ক খাঁ খাঁ জমিকে বছরের পর বছর শ্রম দিয়ে এক ঘনজঙ্গলে পরিণত করেছেন এক ব্রাজিলিয়ান দম্পতি।

ব্রাজিলিয়ান এই দম্পতি হলেন, বিখ্যাত ব্রাজিলিয়ান চিত্রসাংবাদিক সেবাস্তিয়াও সালগাদো এবং তার স্ত্রী লেলেয়া ডেলুইজ ওয়ানিক সালগাদো। দীর্ঘ ২০ বছরের যত্নে তারা ধ্বংস হয়ে যাওয়া জঙ্গল প্রতিস্থাপন করতে সক্ষম হন। যেই গল্পটি এখন সবাইকে অনুপ্রাণিত করে।

কিন্তু গল্পের পিছনেও রয়েছে আরেক গল্প। আগে সেই গল্প টা জেনে আসি।

মিনাস গেরাইস নামের সবুজে ঢাকা এক পাহাড়ি জায়গা। পাখিদের কিচির-মিচিরে মুখরিত এই জায়গাটির মালিক সালগাদোর পরিবার। প্রায় দেড় হাজার একর জায়গা। সালগাদো তখন ছোট। ১৯৫০ বা ১৯৫২ সাল সেটা। সেবাস্তিয়াও রিবেইরো সালগাদো বড় হয়ে সাওপাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেলেন অর্থনীতিতে। স্নাতকোত্তর হওয়ার পরপরই বিশ্বব্যাংকের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন। দূর দূরে গবেষণা করতে যেতে হয় তাঁকে, বিশেষ করে আফ্রিকায়। মিনাস গেইরাসে যাওয়ার সময় আর পায় না সালগাদো। ১৯৭৩ সালে, সালগাদো ঠিক করলেন আর অর্থনীতি নয়, এবার অন্য কিছু করবেন তিনি। বহুদিনের স্বপ্ন কে পরিপূর্ণ রূপ দিতে পুরোদস্তুর আলোকচিত্রী হয়ে উঠলেন তিনি। কাজ শুরু করলেন ফটো এজেন্সি সিগমা’র সঙ্গে। তারপর ১৯৭৯ সালে, ম্যাগনাম ফটোজে যোগ দিলেন। অবশেষে ১৯৯৪ সালে, অবসর নিলেন ম্যাগনাম ফটোজ থেকে। তত দিনে তিনি ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত, বিশেষ করে রুয়ান্ডায় গণহত্যা দেখে। কিন্তু মিনাস গেইরাসে ফিরে আরেক দফা অসুস্থ হয়ে পড়লেন তিনি। তাঁর ছোটবেলার সবুজ অরণ্য যে আর নেই। তাঁদের বাগানবাড়ি গাছশূন্য। 

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফটোগ্রাফার সেবাস্তিয়াও সালগাদো ছোটবেলায় অরণ্যের কাছাকাছি অঞ্চলে থাকতেন। কিন্তু কাজের সূত্রে বিশ্বের বিভিন্ন স্থান ঘুরে বেড়াতে হয়েছে তাকে। বহু বছর পর পর দেশে ফিরেন। তখনই বন্যপ্রাণী ভরা অরণ্যের জায়গায় শুকনো জমি দেখে হতাশ হন।

কিন্তু কী করে ঘন সবুজ বন একেবারেই হারিয়ে গেল? সেবাস্তিয়াও জানান, এর জন্য অনেকটাই দায়ী তাদের পরিবার। পারিবারিক ও আর্থিক কারণে এলাকার বেশিরভাগ গাছ কেটে ফেলেন তার বাবা। স্ত্রী লেলিয়াকে বললেন দুঃখের কথা। লেলিয়া বললেন এক অদ্ভুত কথা, ‘চলো আবার গাছ লাগাই। আর তেমন গাছ, যেগুলো এখানকার স্থানীয়।’ ছেলেও অনুভব করলেন ‘পাপ’ মোচন করতে হবে। তাই ‘পাপ’ ঢাকতে বৃক্ষরোপন করতেই মনস্থির করেন সস্ত্রীক সেবাস্তিয়াও। এভাবেই শুরু হয় এই দম্পতির বন প্রতিস্থাপনের আশ্চর্য যাত্রা।

দ্য গার্ডিয়ানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেবাস্তিয়াও বলেন, ‘জমিটির সব কিছু ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। মাত্র ০.৫ শতাংশ জমিতে গাছ ছিল। এরপর আমি ও আমার স্ত্রী মিলে এই বনের একটি প্রতিলিপি কল্পনা করে কাজ শুরু করলে ধীর ধীরে কীটপতঙ্গ, পাখি, মাছ ফিরে আসতে শুরু করে।”

সেবাস্তিয়াও আরও বলেন, “পরিবেশকে সুস্থ এবং সুন্দর রাখতে বনের পুনরুত্থান করা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে এই বন্য পরিবেশ, যেখানে বন্য পশুরা আবার ফিরে আসতে পারে তা গড়ে তুলতে সাধারণ গাছের পাশাপাশি, বন্য উদ্ভিদের বীজ রোপণ করাও প্রয়োজন”।

কাজে নেমে পড়লেন দুজনে। ১৯৯৮ সালে তাঁরা মিনাস গেইরাসের সবুজ বন ফিরিয়ে আনতে ইনস্টিটিউটো টেরা নামের একটা সংগঠন গড়ে তুললেন। বিশ্বের অন্যতম বড় মাইনিং কম্পানি ‘ভালে’ তাদের এক লাখ চারাগাছ দিল। চারাগুলো লাগানো হলো ১৯৯৯ সালে। স্কুলছাত্ররা তাঁদের সঙ্গে হাত লাগাল। তারপর আস্তে আস্তে দিনে দিনে ২০ বছর পার হলো। মিনাস গেইরা ফিরল তার আদিরূপে। ২০ বছরে সালগাদো আর লেলিয়া ৩০০ প্রজাতির ২ মিলিয়ন গাছ লাগিয়েছেন।

২০ বছর ধরে যত্ন নেওয়া এই জঙ্গলে এখন ১৭২ প্রজাতির পাখি, ৩৩ রকমের স্তন্যপায়ী, ২৯৩ প্রজাতির গাছপালা এবং ১৫টি প্রজাতির সরীসৃপ রয়েছে। 

সেবাস্তিয়াও এবং তার স্ত্রী লেলেয়া ডেলুইজ এই জায়গাটির যত্ন নেন। সালগাদোর নতুন বনে পুরনো সব পাখি আর পোকা-মাকড় ফিরে এসেছে। এখন আর এই বনের মালিক সালগাদো নন; বরং একে সামাজিক সম্পত্তি করে দেওয়া হয়েছে। এখানে তরুণ প্রাণীবিদরা এখন প্রশিক্ষণ নেন। একটা বনের পুনর্জন্ম দেখানোর জন্য অনেক পর্যটককে স্বাগত জানানো হয়।

উল্লেখ্য, ফটোগ্রাফার সেবাস্তিয়াও সালগাদোর জন্ম ১৯৪৪ সালে। কয়েকটি আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র সংস্থার হয়ে বহু অ্যাসাইমেন্টে কাজ করেছেন তিনি। এর পর তিনি ১৯৯৪ সালে তার স্ত্রী লেলিয়ার সঙ্গে মিলে ‘অ্যামাজনস ইমেজেস’ নামের একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button