জীবনী

শিশুদের নিয়ে স্বপ্ন দেখে খুদে ফাতিহা আয়াত!

ফাতিহা আয়াত, দূর বিদেশে বসে যে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশ কে সম্মানিত করে চলেছে। আর্ন্তজাতিক নানা প্রতিযোগিতায় সে এই বয়সেই সাফল্য দেখিয়েছে। পাশাপাশি বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের সম্মান বাড়িয়ে লাল সবুজের পতাকাকে বিশ্ব দরবারে উড়িয়েছে। সম্প্রতি আমেরিকাতে জাতীয় গণিত অলিম্পিয়াডের পাঁচটি ইভেন্টে সে অংশ নিয়েছিল যার মধ্যে তিনটি তে বিজয়ী হয়েছে। এছাড়াও তাকে অনারেবল মেনশন দেওয়া হয়েছে।

ফাতিহার জন্ম ২০১১ সালের ১৩ অক্টোবর। ফাতিহার বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ এবং মা পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন এর স্টুডেন্ট ছিলেন। তার বাবা বর্তমানে একজন ব্যারিস্টার। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন ১০  বছর বয়সী ফাতিহা আয়াত নিউইয়র্ক নগরের গিফ্টেড অ্যান্ড ট্যালেন্টেড প্রোগ্রামের চতুর্থ গ্রেডের ছাত্র। জাতিসংঘের বিভিন্ন সম্মেলনে নিয়মিত যোগ দিয়ে কথা বলে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের অধিকার নিয়ে। তার বয়সী শিশুদের জন্য গণিত, কোডিং, বিজ্ঞান, নিউজ, কোরআন শরিফের তাফসির, সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়ে ইউটিউবে কনটেন্ট আপলোড করে। ভালোবাসে ছবি আঁকতে আর চিঠি লিখতে।

যেখানে আমরা প্রতিনিয়ত পরিবেশ দূষণ করতে ব্যস্ত সেখানে এই ছোট্ট মেয়েটি পরিবেশ বাঁচানোর জন্য পরিকল্পনা করে যাচ্ছে অনবরত। গ্লোবাল ওয়ার্মিং কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় তা নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করছে ফাতিহা। ইতিমধ্যেই “Bear with a bear” এবং “Sisters’ reunion” নামে ফাতিহার ২ টা বই আমাজন থেকে পাবলিশ হয়েছে। এছাড়া সে কুরআন হেফজ করতে শুরু করেছে।

এর আগে ফাতিহা ১৬তম আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সম্মেলন ২০১৯, জাতিসংঘ দিবস ২০১৭ এবং উইমেন পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাজেন্ডা ২০১৭–এ অংশ নেয়। এসব অনুষ্ঠানে ফাতিহা শিশু নির্যাতন, লিঙ্গবৈষম্য, পারিবারিক সহিংসতা, শরণার্থীশিবিরে অমানবিক জীবন ও শিশুদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে কথা বলে। এমনকি ফাতিহা যেসব গণিতের প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়, সেখানেও সে শিশুদের আনন্দময় শিক্ষার অধিকার নিয়ে কথা বলে। এ ছাড়া সে জেইআই ম্যাথ অলিম্পিয়াড ২০১৯, ন্যাশনাল ম্যাথ ফেস্টিভ্যাল ২০১৯, গ্লোবাল ম্যাথ উইক ২০১৭ এ অংশ নেয়।

ছোট্ট ফাতিহা গণিত এবং বিজ্ঞানে পারদর্শী পাশাপাশি সে ছবি আঁকতেও খুব ভালোবাসে। বিজ্ঞান এবং গণিতের প্রতি তার ভালোবাসা এতোটাই যে সে স্কুল থেকে বাসায় ফিরে নিজে নিজে ভিডিও টিউটোরিয়াল তৈরি করে তার বয়সীদের জন্য সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয় ইন্টারনেটের মাধ্যমে।

ফাতিহার করা কিছু ভিডিও টিউটোরিয়াল আছে তার ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল। তাদের বাসায় লিভিং রুমের এক কোনায় তার স্টুডিও আছে। আগে বাবা-মা সাহায্য করত, এখন সে নিজেই সাজগোজ করে লাইট-ক্যামেরা রেডি করে ভিডিও রেকর্ড করে, নিজেই প্রিমিয়ার প্রো অথবা ফাইনাল কাট প্রো’–তে এডিট করে নিজেই ভিডিও আপলোড করে। গণিত ছাড়াও ফাতিহা বিজ্ঞান, ভূগোল, কোডিং, কোরআনের তাফসির, সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়েও বিভিন্ন কনটেন্ট আপলোড করে। কাশ্মীর ইস্যুতে ফাতিহার যেমন ভিডিও আছে, তেমনি গার্বেজ ট্রাকের বিষয়ে নিউইয়র্কের মেয়রকে লেখা তার চিঠি এবং তিনি যে উত্তর দিয়েছেন সেটা নিয়েও ভিডিও আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হলেও পিতৃভূমির প্রতি রয়েছে খুদে ফাতিহার অসীম ভালোবাসা। তাই তো সাত বছর বয়সী ফাতিহা জাতিসংঘে রোহিঙ্গাদের কারণে বাংলাদেশের বনাঞ্চল ধ্বংস এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বক্তৃতা করেছে।

শিশুদের মধ্যে গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ে ভীতি দূর করার জন্য প্রচলিত নিয়মের বাইরে বিভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে শেখাতে কাজ করছে সে। তার মতে ” সন্তানকে মুখস্থ করাবেন নাকি আবিস্কারের নেশা ধরিয়ে দিবেন, সিদ্ধান্ত আপনার”।

সম্প্রতি ফাতিহাকে নিয়ে তার বাবা গিয়েছিলেন অ্যাস্ট্রোনটের সাথে দেখা করতে। নাসায় গিয়ে নভোচারী ‘ডন থমাস’, ন্যাশনাল সায়েন্স ফেস্টিভ্যালে নভোচারী ‘নিকল স্টট’ আর সায়েন্স পোর্টে গিয়ে বিজ্ঞানী ‘ন্যাথান রুথম্যানে’র সঙ্গে দেখা করার পর থেকে ফাতিহা নভোচারী হতে চাইত। অ্যাস্ট্রোনট ডন থমাস এর সাথে নাসা’র মিশন কন্ট্রোল রুম ঘুরে এসে ফাতিহা ঘরের এক কোণে বানিয়েছে নিজের ব্যক্তিগত Space Research Corner, নাম দিয়েছে ‘আয়াতের ঘর’। যে বয়সে আমাদের অন্যান্য বাচ্চারা কার্টুন দেখতে ব্যস্ত। সেই বয়সে বা তার চেয়েও ছোট বয়সে আমাদের ফাতিহা অ্যাস্ট্রোনটের সাথে দেখা করে অনেক কিছু জেনেছে। তারপর বাসায় ফিরে এসে নিজের ঘরকেই একটা গবেষণাগার বানিয়ে নিয়েছে। ফাতিহার সংগ্রহ তাই আমাদেরকে বিস্মিত করেছে।

ফাতিহা চায় বড় হয়ে এমন কিছু করতে, যাতে বিশ্বসভ্যতায় অবদান রাখতে পারে। যেন আর একটি শিশুও ক্ষুধাকাতরতায় দিন না কাটায়। আর যদি জেনেটিক সায়েন্টিস্ট হতে পারে, তাহলে বিভিন্ন খাবারের ডিএনএ প্রোফাইল আবিস্কার করে সেগুলোকে শিশুদের জন্য আরও বেশি পুষ্টিকর করতে চায়। জীবনের লক্ষ্য এখনো ঠিক করতে না পারলেও সে চায়, যা-ই হোক না কেন, সেই পেশাটা যেন শিশুদের জন্য হয়।

ছোট্ট ফাতিহা এখনো প্রাইমারীর গন্ডি পার হয়নি, কিন্তু এরই মাঝে তার অর্জনের খাতা ভরপুর। ওকে নিয়ে তাই আমরা গোটা বাংলাদেশীরাই গবির্ত।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button