খেলাধুলাজীবনী

শোয়েব আখতারঃ ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে দ্রুত গতির বোলার

শোয়েব আখতার একজন সাবেক পাকিস্তানি ডান হাতি ফাস্ট বোলার। যিনি ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুতগতির বোলার হিসেবে পরিচিত। দ্রুত গতির বল ডেলিভারির জন্য অফিসিয়ালি বিশ্বরেকর্ড ও গড়েছিলেন তিনি। 

শোয়েব আখতারের পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডির নিকটে মরগা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাকনাম রাওয়ালপিন্ডি এক্সপ্রেস। তার বাবা ছিলেন আট্টোক তেল বিশুদ্ধ করন কোম্পানির একজন প্লান্ট অপারেটর। শোয়েব পড়ালেখা শুরু করেছিলেন মরগার ইলিয়ট হাই স্কুলে। পরবর্তীতে তিনি ভর্তি হন অ্যাঞ্জেলিয়া রুশকিন ইউনিভার্সিটি ইউকে-তে।২০১৪ সালের ২৫শে জুন, রোবাবকে বিয়ে করেন তিনি।

১৯৯৭/৯৮ সালে, রাওয়ালপিন্ডিতে সফরকারী ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের বিপক্ষে তার টেষ্ট অভিষেক হয়। ১৯৯৮ সালে, দক্ষিণ আফ্রিকাগামী টেষ্ট দলেও তার জায়গা হয়। যেখানে তিনি তিন টেষ্টের সবগুলো ম্যাচ খেলার সুযোগ পান। এভাবে অল্পদিনের মধ্যেই পাকিস্তানের শক্তিশালী ফাস্ট বোলিং লাইনআপে তিনি নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করে নেন।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে শোয়েবের সমীহ জাগানীয়া পারফর্মেন্সের শুরুটা হয় মূলত ১৯৯৯ সালে ভারতের বিপক্ষে একটি বিশ্বকাপ পূর্ববর্তী সিরিজ থেকে। পরবর্তীতে তিনি তার পারফর্মেন্সের এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখেন শারজাহ এবং ১৯৯৯ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপেও। এই সময়ই তিনি তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত পারফর্মেন্সটি করেন ১৯৯৯ সালের ভারত সফরে ভারতের বিপক্ষে। যেখানে এশিয়ান টেষ্ট চ্যাম্পিয়ানশীপের এক ম্যাচে দুই ইনিংস মিলিয়ে তিনি ৮ টি উইকেট লাভ করেন। যার মধ্যে কলকাতার ইডেন গার্ডেনে পর পর দুই বলে তিনি দুই ভারতীয় কিংবদন্তী ব্যাট্সম্যান রাহুল দ্রাবিড় এবং শচীন তেন্ডুলকর কে আউট করেন। এটি ছিল তেন্ডুলকরকে করা তার ক্যারিয়ারের প্রথম বল।

শোয়েব তার ক্যারিয়ারে মোট তিনটি ইংলিশ কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে খেলেছেন। যার মধ্যে রয়েছে ২০০১ সালে সমারসেট, ২০০৩ ও ২০০৪ সালে ডারহাম এবং ২০০৫ সালে ওরচেস্টারশায়ার।

শোয়েব আখতার ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বোচ্চ গতিতে বল করতে পারার জন্য সর্বাধিক পরিচিত। ২০০৩ সালে, কেপটাউনের নিউল্যান্ডসে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তার বোলিং স্পীড ছিল ঘণ্টায় ১৬১.৩৭ কিঃমিঃ (১০০.২৩ মাইল)। এটিই ছিলো তার সর্বাধিক গতির ডেলিভারি। এছাড়াও তিনি ঘণ্টায় ১৫৯.৩ কিঃমিঃ, ১৬০ কিঃমিঃ, ১৫৯ কিঃমিঃ ১৫৮.৪ কিঃমিঃ গতিতে বল করেছেন। ২০০২ সালে, গতিময় তিনটি বল তিনি করেছিলেন নিউজিল্যান্ড এর বিপক্ষে। একই বছর এর পরের গতিময় তিনটি বল তিনি করেছিলেন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। ইতিহাসের প্রথম বোলার হিসেবে তিনিই প্রথম ঘণ্টায় ১০০ মাইলের বেশি গতিতে বল করার রেকর্ড গড়েন।

২০০২ সালে, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেষ্ট ম্যাচে শোয়েব তার ক্যারিয়ার সেরা (৬/১১) বোলিং করেন। কিন্তু বিশ্বকাপে দলের খারাপ ২০০৩ ক্রিকেট বিশ্বকাপ পারফর্মেন্সের বলি হয়ে টুর্নামেন্ট শেষে অন্যদের সাথে তিনিও দল থেকে বাদ পড়েন।

পুনঃরায় ২০০৪ সালে, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তাকে দলে ফেরানো হয়। কিন্তু একই বছর ভারতের বিপক্ষে অনুষ্ঠিত টেষ্টে তার বিতর্কিত অসুস্থতার জন্য তাকে বেশ ঝামেলায় পড়তে হয়।

২০০৫ সালের শেষ দিকে, পাকিস্তান দলে শোয়েবের প্রত্যাবর্তন হয়। একই বছর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিন টেস্টের হোম সিরিজে তিনি চমৎকার বোলিং করেন। কিন্তু ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের আগেই শোয়েব ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়ে দল থেকে ছিটকে পড়েন। একই বছর ইংল্যান্ডের মাটিতে ওয়ানডে সিরিজে ফিরে দুর্দান্ত পারফর্মেন্স করলেও কিছুদিনের মধ্যেই তিনি আরেক সতীর্থ মোহাম্মাদ আসিফ এর সাথে ড্রাগ টেষ্টে পজিটিভ হন। ফলে তার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগ দিয়ে বরাবরের মত ক্রিকেটে শোয়েবের আরও একবার সাফল্যমন্ডিত প্রত্যাবর্তন হয়। লীগের প্রথম ম্যাচে কলকাতা নাইট রাইডার্স এর হয়ে দিল্লী ডেয়ারডেভিলস এর বিপক্ষে ১১ রানে প্রথম সারির ৪ জন্য ব্যাট্সম্যানকে আউট করে দলের ১৩৩ রানের সংগ্রহকে যথেষ্ট প্রমাণ করেন। যার ফলে তিনি ম্যাচ সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও লাভ করেন। কিন্তু চিরকালীন ইনজুরি সমস্যার জন্য তিনি দলের হয়ে সবগুলো ম্যাচ খেলতে পারেননি। এছাড়াও শোয়েব বাংলাদেশের ঘরোয়া এনসিএল টি-২০ বাংলাদেশ টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট লীগে সাইক্লোন অব চিটাগং এর পক্ষে খেলেছেন।

২০০৭ সালের ২৯ অক্টোবর, ১৩ ম্যাচ নিষিদ্ধ থাকার পর শোয়েব আবার ক্রিকেটে ফিরে আসেন। এসেই লাহোরে ওডিআই সিরিজে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ৪৩ রানে ৪ উইকেট তুলে নেন। কিন্তু ২০০৭ সালে, টি ২০ বিশ্বকাপের আগে তিনি তার সতীর্থ মোহাম্মাদ আসিফ কে ব্যাট দিয়ে আঘাত করে স্কোয়াড থেকে পুনরায় বাদ পড়েন। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে ভারত সফরে তাকে ১৬ সদেস্যর দলে রাখা হয়। ২০১১ সালে, ক্রিকেট বিশ্বকাপে তিনি তার শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেন। 

একজন দুর্দান্ত বোলারের পরিচয় থাকলেও তার ক্যারিয়ার জুড়ে ছিল ইনজুরি আর বিতর্ক। অবৈধ ড্রাগ গ্রহণ, অবৈধ বোলিং অ্যাকশন, সতীর্থের সাথে হাতাহাতি করার জন্য তিনি বারবার বিতর্কিত হয়েছেন।  আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আবির্ভাবের লগ্ন থেকেই তিনি কখনো গতির সাথে আপস করেননি। তাই ঘনঘন ইনজুরি আক্রান্ত হওয়াই ছিল তার নিয়তি।

বর্তমানে তিনি স্টার স্পোর্টসের হিন্দি ধারাভাষ্যকার হিসেবে কাজ করছেন।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button