জাতীয়সাম্প্রতিক

বঙ্গবন্ধু টানেল: টিউবের ভেতর তৈরি হচ্ছে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার

২০২২ সালে, দেশের বহুল প্রত্যাশিত বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প চালু হতে যাচ্ছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে অন্যতম ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল’। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে এই টানেল নির্মিত হচ্ছে।

কর্ণফুলী নদী দেশের বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামকে দুইভাগে বিভক্ত করেছে। এই নদীর উপর ইতোমধ্যে তিনটি সেতু নির্মিত হলেও গুরুত্বপূর্ণ এ অঞ্চলের জন্য তা যথেষ্ট নয়। এছাড়া কর্ণফুলী নদীর উপর সেতু নির্মাণে তলদেশে পলি জমে সমস্যা তৈরি করে যা চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য বড় হুমকি। এই সমস্যার মোকাবিলায় কর্ণফুলীতে নতুন কোনো সেতু নির্মাণ না করে তলদেশে টানেল নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার।

চীনের সাংহাই শহরের আদলে বন্দরনগর চট্টগ্রাম শহরকে ‘ওয়ান সিটি, টু টাউন’ মডেলে গড়ে তুলতে নগরের পতেঙ্গা ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারার মধ্যে সংযোগ স্থাপনে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের কাজ শুরু করে সরকার।

জানা গেছে, প্রথম ২০০৮ সালে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে দেশের প্রথম টানেল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে টানেল নির্মাণের জন্য ২০১৪ সালের ১০ জুন, প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বেইজিংয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের অক্টোবরে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এরপর ২০১৯ সালে ২৪ ফেব্রুয়ারি,  চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় টানেল প্রকল্প এলাকার কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে সুইচ টিপে আনুষ্ঠানিকভাবে খনন কাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।

২০২০ সালের ২ আগস্ট শুরু হয় বঙ্গবন্ধু টানেলের প্রথম চ্যানেলের খননকাজ। দ্বিতীয়টির খননকাজ শুরু হয় একই বছরের ১২ ডিসেম্বর। আগেই টানেলের প্রথম চ্যানেলের মুখ খুলে দেওয়া হয়েছিল। আর ১০ মাসের খনন কার্যক্রমের পর অবশেষে গত ৮ অক্টোবর শেষ হয় দ্বিতীয় চ্যানেলের খননকাজ। এর মধ্যে দিয়ে টানেলের দুটি সুড়ঙ্গ তৈরির কাজ শেষ করেছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।

মহামারি করোনার থাবায় কাজের গতি কিছুটা কমলেও এখন চলছে পূর্ণ গতিতে। নির্ধারিত সময়ে মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রযুক্তিবিদ, প্রকৌশলী, নির্মাণ শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্টরা বিরতিহীনভাবে কাজ করছেন। ইতিমধ্যেই টানেলের তিন চতুর্থাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে।

দেশের প্রথম টানেল প্রকল্প এটি। টানেলটি নেভাল একাডেমি পয়েন্ট থেকে শুরু হয়ে কাফকো ও সিইউএফএল পয়েন্টের মাঝখান দিয়ে অপর প্রান্তে যাবে। নদীর তলদেশে সর্বনিম্ন ৩৬ ফুট থেকে সর্বোচ্চ ১০৮ ফুট গভীরে দু’টি টিউব স্থাপন করা হবে।

চার লেন বিশিষ্ট প্রতিটি টিউব চওড়া ১০.৮ মিটার বা ৩৫ ফুট এবং উচ্চতা ৪.৮ মিটার বা অন্তত ১৬ ফুট। একটি টিউব থেকে অপর টিউবের পাশাপাশি দূরত্ব অন্তত ১২ মিটার। টানেলের প্রস্থ ৭০০ মিটার এবং দৈর্ঘ্য তিন হাজার ৪০০ মিটার। এছাড়া টানেলের পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তে ৫.৩৫ কিলোমিটার এপ্রোচ রোড এবং ৭২৭ মিটার ওভার ব্রিজ সম্পন্ন টানেলটি চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে আনোয়ারা উপজেলাকে সংযুক্ত করবে।

প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্ণফুলী টানেল চালুর প্রথম বছর ৬৩ লাখ গাড়ি টানেলের নিচ দিয়ে চলাচল করবে। যেটি ক্রমান্বয়ে বাড়তে বাড়তে দেড় কোটিতে গিয়ে দাঁড়াবে। চালুর প্রথম বছরে চলাচলকারী গাড়ির প্রায় ৫১ শতাংশ হবে কনটেইনার পরিবহনকারী ট্রেইলর ও বিভিন্ন ধরনের ট্রাক ও ভ্যান। বাকি ৪৯ শতাংশের মধ্যে ১৩ লাখ বাস ও মিনিবাস। আর ১২ লাখ কার, জিপ ও বিভিন্ন ছোট গাড়ি চলাচল করবে।

বঙ্গবন্ধু টানেল প্রকল্পটি বাংলাদেশ ও চীন সরকারের (জি টু জি) যৌথ অর্থায়নে সেতু কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হচ্ছে। ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকার অর্থ সহায়তা দিচ্ছে ৪ হাজার ৪৬১ কোটি ২৩ লাখ টাকা। প্রকল্পের বাকি ৫ হাজার ৯১৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা সহায়তা দিচ্ছে চীনের এক্সিম ব্যাংক, যা ২ শতাংশ সুদহারে পরিশোধ করতে হবে বাংলাদেশকে। টানেলের মোট দৈর্ঘ্য ৯.৩৯ কিলোমিটার হলেও মূল টানেলের দৈর্ঘ্য ৩.৩২ কিলোমিটার। 

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বঙ্গবন্ধু টানেলের প্রায় ৭৩ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।  ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা প্রান্ত থেকে কর্ণফুলী নদীর তলদেশ হয়ে নদীর ওপারে আনোয়ারা পর্যন্ত একটি টিউব পরিপূর্ণভাবে স্থাপন করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী বছর জুন থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ‘বঙ্গবন্ধু টানেল’ উদ্বোধন করবেন বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এরপরই টানেল যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হবে।

এই টানেল টি চালু হলে বাণিজ্যিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। টানেলকে ঘিরে দেশের নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে। সেই সঙ্গে হাজারো সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে প্রত্যাশা করছে সরকার।

টানেল প্রকল্পকে ঘিরে দক্ষিণ চট্টগ্রামে ইকোনমিক জোনসহ বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ চলছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত কোরিয়ান রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল (কেইপিজেড),বেসরকারি খাতে সবচেয়ে বড় সার কারখানা (কাফকো), চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানা লিমিটেডে (সিইউএফএল) এবং চট্টগ্রাম বন্দর কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

এছাড়া কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ীতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে কয়লা ভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি স্টেশনসহ বহুবিধ শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে।

মিয়ানমার হয়ে প্রস্তাবিত এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংযুক্তিসহ ৭টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে টানেল নির্মাণের কাজ। টানেল নির্মাণে চট্টগ্রাম শহরসহ সারাদেশের সঙ্গে দক্ষিণ চট্টগ্রামের তথা কক্সবাজার-টেকনাফ পর্যন্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার সহজতর করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

ডিপিপি অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ফিনান্সিয়াল ও ইকোনোমিক আইআরআর এর পরিমাণ দাঁড়াবে যথাক্রমে ৬ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং ১২ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এছাড়া ফিনান্সিয়াল ও ইকোনোমিক ‘বেনিফিট কস্ট রেশিও (বিসিআর)’ এর পরিমাণ দাঁড়াবে যথাক্রমে ১ দশমিক শূন্য ৫ এবং ১ দশমিক ৫। ফলে কর্ণফুলী টানেল নির্মিত হলে জিডিপিতে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে সিটি আউটার রিং রোড দিয়ে পতেঙ্গা প্রান্তে টানেলে প্রবেশ করে আনোয়ারা প্রান্তে পটিয়া-আনোয়ারা-বাঁশখালী সড়কের চাতুরী চৌমুহনী পয়েন্টে ওঠা যাবে। ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মধ্যে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে এবং এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপিত হবে। যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হবে।

এতে ভ্রমণ সময় ও খরচ হ্রাস পাবে এবং পূর্বপ্রান্তের শিল্পকারখানার কাঁচামাল, প্রস্তুতকৃত মালামাল চট্টগ্রাম বন্দর, বিমানবন্দর ও দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে পরিবহন প্রক্রিয়া সহজ হবে। কর্ণফুলী নদীর পূর্ব প্রান্তের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপনের ফলে পূর্বপ্রান্তে পর্যটনশিল্প বিকশিত হবে।

তবে দুঃশ্চিতার বিষয় হচ্ছে, টানেলের সংযোগ সড়কের জন্য এ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার ৭০০ গাছ কেটেছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। সড়কের দুই পাশে কেটে ফেলা গাছগুলোর মধ্যে বড় রেইন ট্রি ছিল প্রায় এক হাজার ৪০০টি। গাছগুলোকে বাঁচানো গেলে সেগুলো মাটির ক্ষয়রোধে সহযোগী হতো এবং অক্সিজেনের উৎস হিসেবেও কাজ করতো।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button