ইতিহাস

আদম পাহাড়: প্রথম মানুষের পদচিহ্ন

আমাদের রহস্যময় পৃথিবীতে রহস্যের সীমা নেই। এর মধ্যে আবার এমন কিছু স্থান বা বিষয় রয়েছে যা অতি প্রাকৃতিক। আর একারনে এগুলো হাজার বছর ধরে মানুষের কাছে রহস্যে ঘেরা। বিজ্ঞানীরা এগুলোকে অতি প্রাকৃতিক বলে আখ্যায়িত করেছেন।

এমনই একটি স্থান ‘আদম পাহাড়’। যে পাহাড় টি পৃথিবীর সূচনালগ্ন থেকে এখনও রহস্যময়। ধারণা করা হয়, পৃথিবীর প্রথম মানুষ হযরত আদম আ. কে নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার কারণে স্বর্গ থেকে এখানেই ফেলা হয়েছিল। এই পাহাড়টি শ্রীলংকার সাব্রাগামুয়া প্রদেশে অবস্থিত। যার উচ্চতা ২২৪৩ মিটার উচ্চতার (৭৩৫৯ ফুট)।

৮৫১ খ্রিস্টাব্দে, এ পাহাড়ের পদচিহ্ন সর্বপ্রথম নজরে পড়ে আরবের সোলাইমানের চোখে। ইবনে বতুতা ও মার্কো পোলোসহ বিশ্বের অনেক নামকরা পর্যটক এই আদম চূড়া ভ্রমণ করেছেন। ১৫০৫ সালে, পর্তুগিজ এক নাগরিক শ্রীলঙ্কা সফরে আসেন। তিনিই এ পাহাড়কে ‘পিকো ডি আদম’ নামে নামকরণ করেছেন। সেই থেকে এই পাহাড়ের নাম ‘আদম পাহাড়’।

শ্রীলঙ্কার ভাষায়, ‘শ্রী পাদায়া’ অর্থাৎ পবিত্র পদচিহ্ন এবং ‘সামানালা কান্ডা’ (প্রজাপতি পাহাড়) নামে পরিচিত মোচাকৃতির এই পাহাড়টি বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মের মানুষের কাছেই অত্যন্ত আবেগের বিষয়বস্তু। মূলত এর চূড়ায় অবস্থিত একটি পদচিহ্নের জন্য এই পাহাড়টি সকল ধর্মের মানুষের কাছে আবেগের বস্তুতে পরিণত হয়েছে। ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমানদের বিশ্বাস অনুযায়ী এটি প্রথম মানুষ আদমের পদচিহ্ন। একেশ্বরবাদী এই তিনটি ধর্ম অনুসারে, আল্লাহ যখন জান্নাত থেকে আদম ও হাওয়া (আ.) কে পৃথিবীতে নির্বাসনে পাঠান, তখন আদম (আ.) পৃথিবীর এক প্রান্তে এই পাহাড়ের উপর নিক্ষেপ করেন। আর আদি মাতা হজরত হওয়া আ. পতিত হন জেরুজালেমে। শ্রীলঙ্কা থেকে জেরুজালেমের দূরত্ব কয়েক’শ হাজার বর্গ কি.মি.। ৩০০ বছর কান্নাকাটি ও আল্লাহর কাছে মোনাজাতের পর উভয়ে আবার মিলিত হন মধ্যপ্রাচ্যে। সেই থেকেই শ্রীলঙ্কার এই চূড়াকে কেন্দ্র করে রহস্য রয়ে গেছে। তাদের মতে, হজরত আদম (আ.) যখন এ পাহাড়ে নামেন এবং প্রথমে ‘ডান’ পা রাখেন। তাই তাদের কাছে এটি শুধুই প্রথম মানুষের একটি স্মৃতিচিহ্ন।

ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমানদের পাশাপাশি এ্যাডাম পিক বৌদ্ধ ও হিন্দুদের কাছেও একটি পবিত্র স্থান। বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা মনে করে, এটা তাদের দেবতার পদচিহ্ন। সেইসাথে বৌদ্ধরা মনে করে চূড়াটি তাদের অস্তিত্বের আদি প্রতীক। তাই এই দুই ধর্মাবলম্বীর মানুষ এই পদচিহ্নটি পবিত্র জ্ঞানে পূজা করে।

চিত্রঃ পাহাড়ের চূড়ায় পদচিহ্ন 

এই পাহাড়ের চূড়া একটি সমতল ক্ষেত্র। সর্বপ্রথম ১৮১৬ সালে লেফটেন্যান্ট ম্যালকম এর পরিমাপ করেন। এতে দেখা যায় এর দৈর্ঘ্য ৭৪ ফুট এবং প্রস্থ মাত্র ২৪ ফুট এবং মোট আয়তন ১৭৭৬ বর্গফুট। এর চূড়ায় রয়েছে একটি বিশাল পাথরখণ্ড যার উচ্চতা আট ফুট। ওই পাথরের ওপরেই রয়েছে ওই পদচিহ্ন, যা দৈর্ঘ্যে ৬৮ ইঞ্চি এবং প্রস্থে ৩১ ইঞ্চি। 

অবয়বের দিক থেকে অনেকটা জাবালে নূরের মত দেখতে এই পাহাড় টি নিজেও এক বিস্ময়। আশ্চর্য্যের বিষয় হল, পাহাড়ের যে স্থানটিতে হজরত আদম আ. এর পায়ের চিহ্ন রয়েছে সেই স্থানে জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সূর্যের আলো এবং মে থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বৃষ্টি হয় না!

পাহাড়ের চূড়ায় যেখানে পদচিহ্ন রয়েছে সেখানে পৌঁছা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। তবে অনেক পর্যটকই ঝুঁকি নিয়ে সেখানে গিয়েছেন। তাঁরা নিজের চোখে ওই পায়ের ছাপ দেখে বিস্মিত হয়েছেন।

১৯০৩ সালে, পদচিহ্ন সম্বলিত পাহাড়ে উঠার জন্য পাথর দ্বারা সিঁড়ি বানিয়ে লোহার রেলিং দেওয়া হয়, তাতে রয়েছে ৪০০০ ধাপ। যাতে পর্যটকদের পাহাড়ে উঠতে কোনো ধরনের বেগ পেতে না হয়। তবে এর প্রতিটি ধাপ নিরাপদ নয়। তার ওপর দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে শীর্ষে যেতে হলে কমপক্ষে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা সময় লাগে। এই সিঁড়িটি কবে, কে নির্মাণ করেছিল তারও কোনো হদিস পাওয়া যায় না। পাহাড়ের ওপরের আবহাওয়াও তেমন অনুকূল নয়। বছরে মাত্র তিন থেকে চার মাস এ পাহাড়ে আরোহণ করা যায়। বছরের অন্য সময়টাতে এতে আরোহণ অসম্ভব হয়ে পড়ে। কারণ তখন পাহাড় মেঘের ভেতর লুকিয়ে যায়

তবে চূড়াটিতে যাওয়া সহজ ব্যাপার নয়। প্রথমে নৌকা তারপর পায়ে হেঁটে উঁচু পাহাড়ে উঠা, সেখান থেকে অনেক কষ্টের পরই চূড়ায় উঠতে হয়। একটু অসাবধান হলেই ঘটতে পারে নানা বিপত্তি। সাপ, বিষাক্ত পোকা-মাকড়ের কামড়ে ঘটতে পারে মৃত্যু।

আশ্চর্য্যের বিষয় হল এই চূড়াটি বছরের পর বছর অবিকল রয়ে গেছে। এর সৌন্দর্য এতটুকু হ্রাস পায়নি। আদম চূড়াটির চারপাশ ঘিরে আছে সবুজ প্রকৃতি। ঢেউয়ের মতো বয়ে চলা উঁচু-নিচু টিলা। রয়েছে অসংখ্য ছোট ছোট নদী ও পাহাড়ি ঝরনা। সব মিলে এক নজরকাড়া দৃশ্য। যে কারণে পুরো আদম চূড়াটি সব ধরনের মানুষের কাছে আকর্ষণীয় জায়গা হিসেবে স্থান পেয়েছে।

প্রতিবছর এই স্মৃতিচিহ্নটি পরিদর্শনে বিপুল সংখ্যক পর্যটক এখানে ভ্রমণে আসে। এ পাহাড়ে বিভিন্ন প্রজাতির অসংখ্য প্রজাপতির অবস্থান পাহাড়টিকে প্রকৃতই প্রজাপতির পাহাড়ে পরিণত করেছে।

মারকুস অকসল্যান্ড এই পদচিহ্ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে একটি বই লিখেছেন। বইটির নাম `দ্য স্যাক্রেট ফুটপ্রিন্ট: এ কালচারাল হিস্ট্রি অব আদমস পিক’। যেখানে তিনি আদম পাহাড়ের উচ্চতা প্রকাশ করেছেন।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also
Close
Back to top button