সাম্প্রতিক

কে এই ইকবাল হোসেন!

কুমিল্লার নানুয়াদিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ রাখার ঘটনায় ইকবাল হোসেন (৩১) নামে এক ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তাকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ হওয়ার পরে সবার মনে এখন একটাই প্রশ্ন, কে এই ইকবাল?

ইকবাল হোসেনের জন্ম ১৯৯০ সালের ৬ আগস্ট। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে ইকবাল সবার বড়। তার বাবা নূর আহমদ আলম, পেশায় একজন মাছের ব্যবসায়ী। তার মায়ের নাম আমেনা বেগম। ইকবালদের মূল বাড়ি ছিল শহরের তেলিকোনা এলাকায়। সেখান থেকে ভিটেবাড়ি বিক্রি করে কুমিল্লা নগরীর ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের দ্বিতীয় মুরাদপুর-লস্কর পুকুর এলাকায় এসে ভাড়া থাকে পরিবারটি। 

জানা যায়, ইকবাল ১৫ বছর বয়স থেকেই মাদক সেবন শুরু করে। কখনও বাসচালকের সহকারী, কখনও রংমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করেছে সে। ১০ বছর আগে বরুড়া উপজেলায় বিয়ে করেছে ইকবাল। তার এক ছেলে। কিন্তু বিয়ের পাঁচ বছর পর স্ত্রীর সঙ্গে ডিভোর্স হয় তার। তারপর চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মিয়াবাজার এলাকার কাদৈর গ্রামে বিয়ে করেন। এই সংসারে এক ছেলে এক মেয়ে। ইকবালের স্ত্রী-সন্তান এখন কাদৈর গ্রামে থাকেন।

পুলিশের কাছে ইকবালের পরিবার দাবি করেছে, তিনি কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন। সে পাগল। খাবারের লোভ দেখিয়ে তাকে যে যাই বলে সে তাই-ই করে। তবে পরিবারের বাইরে অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

ইকবালের মা আরো জানান, ইকবাল নেশাগ্রস্ত হয়ে পরিবারের লোকদের অত্যাচার করত। রাস্তাঘাটে বিভিন্ন সময় পথচারীদের হয়রানি করত। গোসলখানায় বসে ইয়াবা সেবন করত। বেশিরভাগ সময় বিভিন্ন মাজারে থাকত। পঞ্চম শ্রেণির পর পড়াশোনা বন্ধ করে দেয় সে। ভালো ক্রিকেটও খেলতে পারত ইকবাল। ১০ বছর আগে বন্ধুদের সঙ্গে পাড়ার কিছু ছেলের মারামারি হয়। এ সময় ইকবালের পেটে ছুরিকাঘাত করা হয়। ইকবাল তখন থেকে অসুস্থ। উল্টাপাল্টা চলাফেরা করায় বিভিন্ন সময় চুরির অভিযোগ এনে তাকে মারধর করতেন স্থানীয়রা।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সৈয়দ সোহেল বলেন, ইকবালকে নিয়ে অনেকেই অভিযোগ দিত। তার কর্মকাণ্ডে এলাকার মানুষ অতিষ্ঠ। তবে কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত নয়। কোনও দলের কর্মী কিংবা সমর্থকও নয়। কয়েক বছর আগে দ্বিতীয় বিয়ে করেছিল। বিয়ের পর স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ায় মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। তার মতে, তার মানসিক অসুস্থতাকে কাজে লাগিয়ে তৃতীয় পক্ষ কাজটি করেছে। পূজামণ্ডপে কোরআন রাখার খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসী ঘৃণা প্রকাশ করছে।

উল্লেখ্য গত ১৩ অক্টোবর, ভোরে নানুয়াদিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়া যায়। এরপরই দেশের কয়েক স্থানে সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা ঘটে। ঘটনার জেরে ওই দিন চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে হিন্দুদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে পাঁচ জন নিহত হয়।

পরদিন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে হিন্দুদের মন্দির, মণ্ডপ ও দোকানপাটে হামলা–ভাঙচুর চালানো হয়। সেখানে হামলায় দুই জন নিহত হন। এরপর রংপুরের পীরগঞ্জে হিন্দু বসতিতে হামলা করে ভাঙচুর, লুটপাট ও ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। এরইমধ্যে শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

এই তদন্তের জের ধরেই, ঘটনার দিন (১৩ অক্টোবর) রাতের ঘটনার আশপাশের ১২টি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। কয়েকটি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রাত ১১টা ৫৮ মিনিটে দারোগাবাড়ির মাজারসংলগ্ন মসজিদে প্রবেশ করে ইকবাল। কথা বলে মসজিদে থাকা হাফেজ হুমায়ুন ও মাজারের খেদমতকারী ফয়সালের সাথে। রাত ১২টায় সেখান থেকে চলেও যায় সে। এরপর রাত ২টা ১০ মিনিটে আবার মসজিদে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে কোরআন শরিফ হাতে নিয়ে পাশের দারোগাবাড়ি মাজার গেট থেকে পুকুরপাড় ধরে এগিয়ে যায় সে।

একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হাতে হনুমানের গদা কাঁধে নিয়ে দিঘিরপাড়ে ঘোরাফেরা করছে ইকবাল। তবে মণ্ডপে সিসিটিভি না থাকায় কোরআন রাখার চিত্র দেখা যায়নি। পুলিশের ভাষ্য, কোরআন শরিফ মন্দিরে রেখে গদা নিয়ে বের হয় ইকবাল।

ঘটনার আট দিন পর গত বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে ,কক্সবাজারের সুগন্ধা সৈকত এলাকা থেকে ইকবালকে গ্রেফতার করা হয়।

তবে ইকবাল কেন, কী কারণে, কাদের প্ররোচনায় পবিত্র কোরআন শরিফ নিয়ে মণ্ডপে রেখে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে, সে সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button