জানা-অজানা

১৪ বার সার্জারি করে বাঘের মতো চেহারা পেলেন ডেনিস অ্যাভনার!

বাঘের মত সাহসী! এই কথাটা কেউ আপনাকে বললে প্রশংসা হিসেবেই তো নিবেন। সেইসাথে মনে মনে কি একটু পুলকিত বোধ করবেন না? কিন্তু কেউ যদি আপনাকে বলে, আপনার চেহারা বাঘের মত বানিয়ে দেওয়া হবে। রাজি হবেন? নিশ্চয়ই হবেন না। কে চায় মানুষ হয়েও জন্তুর মতো অবয়ব পেতে! তাহলে মানুষ আর জন্তুর মধ্যে তফাৎ কী থাকলো? 

তবে অবাক করা বিষয় হলেও সত্যি যে, বাঘের মতো চেহারা পেতে আপনার আমার মত একজন মানুষ ই খরচ করেছেন ২ লাখ মার্কিন ডলার বা ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। একের পর এক প্লাস্টিক সার্জারি করে মুখের পরিবর্তন এনেছেন ওই ব্যক্তি। মুখে বাঘের মতো ডোরাকাটা দাগ এঁকেছেন ট্যাটুর মাধ্যমে। এছাড়াও দাঁতগুলো সূঁচালো করেছেন, ঠোঁট কেটেও বিকৃত করে বাঘের মতো দেখানোর চেষ্টা করেছেন তিনি।

বলছিলাম, ডেনিস অ্যাভনারের কথা। তিনি স্টকিং ক্যাট নামেও পরিচিত। ১৯৫৮ সালের ২৭ আগস্ট, আমেরিকার মিশিগান শহরের ফ্লিন্ট নামক জায়গায় জন্মগ্রহণ করেন ডেনিস অ্যাভনার। জানা যায়, তিনি সোনার টেকনিশিয়ান হিসেবে নৌ-বাহিনীতে যোগদান করেন। তবে ১৯৮১ সালের কাছাকাছি সময়ে তার নৌবাহিনীর পদ ত্যাগ করেন।

চিত্রঃ বাঘ রূপি ডেনিস অ্যাভনার

এরপর তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগোতে কম্পিউটার প্রোগ্রামার ও টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ শুরু করেন। ডেনিস অ্যাভনারের আমেরিকার শহুরে জীবন ছাড়িয়ে হুরোন এবং লাকোটা উপজাতির মানুষদের সঙ্গেই কেটেছে শৈশবের অধিকাংশ সময়। এই দুই উপজাতির মানুষের কাছেই বাঘ অন্যতম উপাস্য প্রাণী। আর সেই সংস্কৃতির প্রভাবই পড়ে ডেনিসের মানসিকতায়। তিনি নিজেকেই বাঘ মনে করতে শুরু করেন। তাই নিজের শরীরের উপর জন্মায় একধরনের বিতৃষ্ণা। ১৯৮১ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে ডেনিস ঠিক করলেন তিনি তার শরীরকে বদলে ফেলবেন। তাই সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছেতেই একটু একটু করে বদলে ফেলেছেন নিজের চেহারাকে।

বাঘের মতো চেহারা পেতে এক বা দুইবার নয়, মোট ১৪ বার মুখে অস্ত্রোপচার চালান ডেনিস। ‘পশুর মতো চেহারা পেতে সবচেয়ে স্থায়ী রূপান্তর’ ব্যক্তি হিসেবে বিশ্বরেকর্ড গড়েন তিনি।

প্রাথমিক ভাবে ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগোর ল্যারি হ্যাংকস ১৯৮৫ সাল থেকে অ্যাভনারের শরীরে পরিবর্তনে কাজ শুরু করেন। ডেনিস তার মুখ ও শরীরে বাঘের মতো ডোরাকাটা ট্যাটু করেন। কিন্তু এটুকুতে তৃপ্তি পেলেন না ডেনিস। বাঘ মানে তো শুধু গায়ে ডোরাকাটা দাগ নয়। বাঘের থাবা থাকে, থাবার মধ্যে থাকে তীক্ষ্ণ নখ। বাঘের মুখ, চোখ, নাক সবই অন্যরকম। প্লাস্টিক সার্জারির সাহায্যে যে সমস্তকিছুই করা সম্ভব তা জানতেন ডেনিস। 

যেহেতু একটা নির্দিষ্ট সীমার পর দৈহিক গঠনের পরিবর্তন আমেরিকার আইনের বিরোধী। এর ফলে চিকিৎসকের লাইসেন্স পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত হতে পারে। তাই আমেরিকার কোনো সার্জেনই এমন অপারেশন করতে রাজি হলেন না। শেষ পর্যন্ত স্টিভ হাওয়ার্ড নামের এক ব্যক্তি এগিয়ে এলেন। না, তিনি কোনো লাইসেন্সপ্রাপ্ত সার্জেন নন। তবে সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট তৈরির একটি কারখানা আছে তার। এছাড়াও প্লাস্টিক সার্জারি নিয়ে একটু আধটু পড়াশোনা আছে হাওয়ার্ডের। তিনিই গোপনে শুরু করলেন অস্ত্রপ্রচার।

প্রথমে নিজের কানদুটো বদলে ফেলেছিলেন ডেনিস। সেই প্রথম অপারেশনই ছিল তীব্র যন্ত্রণার। কারণ লাইসেন্সপ্রাপ্ত সার্জেন ছাড়া কেউ অ্যানাস্থেসিয়া করতে পারেন না। ফলে গোটা অপারেশনটাই হয়েছে ডেনিসের জ্ঞান থাকা অবস্থায়। প্রথম অপারেশনের ধাক্কা সামলাতে কয়েক বছর লেগে গিয়েছিল। কিন্তু লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি ডেনিস। আবারও হাওয়ার্ডের কাছে গেলেন তিনি। 

এরপর সার্জারির মাধ্যমে মুখের ইমপ্লান্টে ভ্রু, কপাল ও তার নাকের আকৃতি পরিবর্তন করেন। এরপর তিনি সেপ্টাম স্থানান্তরের মাধ্যমে নাক চ্যাপ্টা করার সিদ্ধান্ত নেন। এছাড়াও তার ঠোঁট, গাল ও চিবুকে সিলিকন ইনজেকশনও দেওয়া হয়। ডেনিস সার্জারির মাধ্যমে তার উপরের ঠোঁট কেটে পরিবর্তন আনেন। উত্তেজনায় তখন অপারেশনের যন্ত্রণাও আর তাকে কষ্ট দেয় না। এমনকি তিনি সব সময় একটি রোবোটিক লেজ পেছনে নিয়ে ঘুরতেন। তবে বাঘের মতো গোঁফ তৈরি তো সম্ভব নয়। তার জন্য প্লাস্টিকের গোঁফের বন্দোবস্ত করা হল।

তার ভবিষ্যতের পরিবর্তন পরিকল্পনার মধ্যে ছিল তার মাথার উপরে ইমপ্লান্ট করার পরিকল্পনা ও বাঘের মতো কান লাগানো।

দুটি ফোলা ফোলা গালের মাঝখানে একটি তিলমাত্র নাক। আর তার নিচেই মাঝখানে কাটা ঠোঁট। মুখ খুললেই বেরিয়ে আসবে তীক্ষ্ণ ক্যানাইন দাঁতের সারি। মুখ থেকে শুরু করে সারা শরীরজুড়ে ডোরাকাটা দাগ। বাঘের চেহারার এই মানুষটি কে আস্তে আস্তে আশেপাশের মানুষরা ভয় পেতে শুরু করলো। 

একসময় ডেনিস নিজেও বুঝতে পারলেন সেটা। তাই কোলাহল ছেড়ে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার একটি জনবিরল অঞ্চলে ঘর ভাড়া নিলেন। সেখানে বসেই টুকটাক কম্পিউটার সারানোর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে শুরু করলেন। তবে কিছুদিনের মধ্যেই ডেনিস রীতিমতো সেলিব্রেটি হয়ে উঠলেন।

২০০২ সালে, ল্যারি কিং লাইভ টিভি সিরিজে প্রথম দেখানো হয় তার কাহিনী। বিখ্যাত টেলিভিশন শো ‘রিপলি’স বিলিভ ইট অর নট’ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন তিনি। এরপর তাকে নিয়ে দুটি পূর্ণদৈর্ঘ্যের তথ্যচিত্র ছাড়াও তৈরি হয়েছে অসংখ্য টিভি এবং ওয়েবসিরিজ। গিনেস বুকে দেহের সর্বাধিক পরিবর্তনের জন্য নামও ওঠে ডেনিসের। 

২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে, ৪৯ বছর বয়সে নাভাডার তনোপাহ তে চলে যান তিনি। ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর, ডেনিস অ্যাভনার ৫৪ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন। নিজ বাড়ির গ্যারেজ থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। তার মৃত্যুর খবর টি এক সপ্তাহ পর খবরে প্রকাশ করা হয়। তবে এই আকস্মিক আত্মহত্যার কারণ এখনও জানা যায়নি। মৃত্যুর সাথে সাথে গিনেস বুকের রেকর্ডও ভেঙে যায় তার। কিন্তু স্টকিং ক্যাটের কিংবদন্তি থেকে গিয়েছে আমেরিকায়।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button