সংবাদ

ইস্তাম্বুল এয়ারপোর্টঃ বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ এবং ব্যস্ততম এয়ারপোর্ট

বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ বিমানবন্দরের মালিক এখন  তুরস্ক। ৭,৬৫,০০,০০০ বর্গ মিটার জায়গার উপর গড়ে তোলা এই বিমানবন্দরটির নাম রাখা হয়েছে ‘ইস্তাম্বুল এয়ারপোর্ট’। দিনে ২ লাখসহ প্রতি বছর ১৫ কোটি যাত্রীকে সেবা দিতে সক্ষম এই বিমানবন্দরটি। যেখানে এক ছাদের নিচে থাকবে বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ টার্মিনাল।

অত্যাশ্চর্য এই বিমানবন্দরটি ইস্তাম্বুল শহরের ইউরোপীয় অংশের অটালকা-গক্তির্ক-আরনাভুতকি অঞ্চলে অবস্থিত। তুরস্কের বিখ্যাত তাকসিম স্কয়ার থেকে এর দূরত্ব ৪০ কিলোমিটার। লিম্যাক, কোলিন, সেনগিজ, মাপা ও ক্যালন -বৃহৎ পাঁচটি কোম্পানির মিলিত কনসোর্টিয়াম এই বিমানবন্দরটি নির্মাণ করে। 

প্রায় ১০ সহস্রাধিক লোক এ প্রকল্পে কাজ করেছে। তুরস্ক ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মোট ২৫০ জন স্থপতি এবং ৫০০ এর চেয়েও বেশি প্রকৌশলী এই নির্মাণকাজে যুক্ত ছিলেন।

২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর, তুরস্কের প্রজাতন্ত্র দিবসে তুরস্কের রাষ্ট্রপতি রিসেপ তায়িপ এরদোয়ান ১৭ জন আমন্ত্রিত রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের নিয়ে এই বিমানবন্দরটি উদ্বোধন করেন‌।‌ ২০১৮ সালের ৩১ অক্টোবর, রাজধানী আঙ্কারার উদ্দেশ্যে টার্কিশ এয়ারলাইনসের একটি বিমান টিকে২১২৪ উড্ডয়নের মাধ্যমে এই বিমানবন্দর থেকে সর্বপ্রথম বিমান উড্ডয়ন করে।

এই বিমানবন্দর থেকে ২০১৮ সালের ১১ নভেম্বর থেকে পাঁচটি আন্তর্জাতিক রুটে বিমান চলাচল শুরু করেছে। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত ও-৭ মোটরওয়ে ব্যবহার করে আতাতুর্ক বিমানবন্দর থেকে সব সরঞ্জাম নতুন বিমানবন্দরে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। বিমানবন্দরটি সম্পূর্ণরূপে চালু হয়ে গেলে তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক বিমানবন্দর বন্ধ ঘোষণা করে দেয়া হবে এবং আতাতুর্ক বিমানবন্দরের আইএটিএ কো‌ড আইএসটি নতুন বিমানবন্দরে সরিয়ে আনা হবে।

বর্তমানে এই বিমানবন্দরের যাত্রী পরিবহন ক্ষমতা রয়েছে বাৎসরিক ১৫ কোটি। পুরোদমে চালু হয়ে গেলে ২০২৫ সালে এর যাত্রী পরিবহন ক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে ২০ কোটিতে। তখন যাত্রী পরিবহন ক্ষমতার দিক দিয়ে এটি হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও ব্যস্ততম বিমানবন্দর। এটি সাবিহা গোকচেন বিমানবন্দর ও আতাতুর্ক বিমানবন্দরের পর ইস্তাম্বুলের ৩য় বিমানবন্দর এবং একে ইস্তাম্বুলের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে গড়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

ইস্তাম্বুলের এই বিশাল নতুন বিমানবন্দর তৈরি করতে প্রথম ধাপে খরচ হয়েছে ৫১০ কোটি ডলারের বেশি। বর্তমানে এই বিমানবন্দর থেকে ১১০টি দেশের প্রায় ৩৫০টি গন্তব্যস্থলে বিমান চলাচল করছে। বিমানবন্দরটি তে মোট চারটি রানওয়ে রয়েছে। যার মধ্যে ৩টি চালু হয়েছে বাকি ১টি শীঘ্রই কার্যকর হবে। এছাড়া ২০২৮ সালের মধ্যে আরো ২টি রানওয়ে চালু হবে। সবমিলিয়ে এই বিমানবন্দরের রানওয়ে সংখ্যা হবে ৬টি। তখন এক সঙ্গে এ বিমানবন্দরে ৫০০টি বিমান অবস্থান করতে পারবে।

অসাধারণ ডিজাইনের মাধ্যমে বিমানবন্দরটির কন্ট্রোল টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছে, যা যেকোনো যাত্রীকে দ্বিতীয়বার তাকিয়ে দেখতে বাধ্য করবে। ৫,০০০ বর্গ মিটার আয়তনের এই কন্ট্রোল টাওয়ারটি প্রায় ৯০ মিটার উঁচু। মূলত টিউলিপ ফুলের আদলে ব্যতিক্রমধর্মী এই দৃষ্টিনন্দন আইকনটি নির্মিত হয়েছে। 

চিত্রঃ কন্ট্রোল টাওয়ার, ইস্তাম্বুল এয়ারপোর্ট

কৃষ্ণ সাগরের তীরে অবস্থিত পৃথিবীর ব্যস্ততম বিমানবন্দরগুলোর একটি এই ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর। গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইস্তাম্বুল কে অনেকেই ট্রানজিট বিমানবন্দর হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। দিন দিন এই বিমানবন্দরের কর্মব্যস্ততা বাড়ছে, সাথে বাড়ছে যাত্রীদের আনাগোনাও। 

এছাড়াও আন্তর্জাতিকভাবে তুরস্ক একটি জনপ্রিয় মাইগ্রেশন পয়েন্ট হওয়ায় এই বিমানবন্দর দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সব মিলিয়ে এ বিমানবন্দরের নির্মাণকাজ শেষ না হওয়া সত্ত্বেও তিন মহাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। ইউরোপ এবং এশিয়া, পশ্চিম এবং পূর্বকে সংযুক্ত করে একটি বড় বিমানকেন্দ্র, এবং বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরগুলোর মধ্যে একটিতে পরিণত হয়েছে।

এসবের বাইরেও এই বিমানবন্দরের ভেতরে গড়ে উঠছে একাধিক বিলাসবহুল ও রাজকীয় সব হোটেল। তুরস্কের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধির সমন্বয়ে হোটেলগুলো সাজানো হয়েছে। এখানকার গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য রয়েছে আধুনিক ব্যবস্থা। প্রায় ৪০ হাজার গাড়ি পার্কিং করে রাখা যাবে এর মাল্টিফ্লোর পার্কিং লটে। বিলাসবহুল এই বিমানবন্দরে রয়েছে ৪১টি বোর্ডিং পাস গেটস। এছাড়া রয়েছে ৫৬৬টি চেক ইন কান্ট্রিজ। সঙ্গে তৈরি হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় করমুক্ত শপিং কমপ্লেক্সে, যার আয়তন হবে ৫৫,০০০ বর্গ মিটার।

সেইসাথে ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে নিরাপত্তার ব্যাপারে বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য থাকবে ২২,০০০ সিসিটিভি ক্যামেরা। এছাড়া ১০,০০০ এয়ারপোর্ট সিকিউরিটিসহ অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিয়োজিত থাকবে। বিমানবন্দরটিতে কাজ করবে ২ লক্ষ ২৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী।

এই এয়ারপোর্টটি শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্টই নয়, এটি হতে চলেছে বিশ্বের সুন্দর এবং আকর্ষণীয় এয়ারপোর্টগুলোর মধ্যে অন্যতম। অসাধারণ নকশা, স্থাপত্যশিল্প, কারুকার্য, নিরাপত্তা এবং সেবার মান, সবকিছু মিলিয়ে এই বিমানবন্দরটি যাত্রীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে

ইতিমধ্যে এ বিমানবন্দরের নকশা পুরস্কারও জিতেছে। ২০১৬ সালে, বার্লিনে ওয়ার্ল্ড আর্কিটেকচারাল ফেস্টিভ্যালে ‘ফিউচার প্রজেক্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ ক্যাটাগরিতে পুরস্কার জিতেছে ইস্তানবুল বিমানবন্দর।

সংবাদমাধ্যম বলছে, প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বাজেটের সুবিশাল এয়াই ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরটি ধীরে ধীরে তুরস্ককে ভ্রমণ কেন্দ্রে রূপান্তর করবে। বিমানবন্দরটির সঙ্গে যোগাযোগ উন্নত করতে প্রায় ৪০ কিলোমিটার রেললাইনসহ রাস্তাঘাট নির্মাণ করছে কর্তৃপক্ষ।

ইস্তাম্বুলে এ বিশাল বিমানবন্দর তৈরি করাটা যেমন তুরস্কের কাছে খুব গর্বের বিষয়৷ তেমনি বিমানবন্দরকে ঘিরে বেশ কিছু বিতর্কও রয়েছে৷ কারণ শ্রমিকেরা এখানে কাজ করতে গিয়ে নানা সমস্যায় পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। খারাপ মানের খাবারের পাশাপাশি আরও অনেক অত্যাচারও শ্রমিকদের সহ্য করতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জানা যায়, এই বিমানবন্দর তৈরি করতে গিয়ে ২৭ জন শ্রমিকের মৃত্যুও হয়েছে। যদিও তুরস্কের সরকার এই অভিযোগকে অস্বীকার করেছেন।

এছাড়াও এই বিমানবন্দর টি তৈরি করতে গিয়ে অনেক গাছ কেটে ফেলতে হয়েছে। যেটা পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে বলে ধারনা করেন পরিবেশবিদরা।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button