জীবনীসাম্প্রতিক

সাহিত্যে নোবেল পেলেন তানজানিয়ার ঔপন্যাসিক আব্দুলরাজাক গুরনাহ

গত ৭ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) ২০২১ সালে, বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫ টায় র‌য়্যাল সুইডিশ একাডেমি সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার ঘোষণা করে।

এই বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ব্রিটিশ-তানজানিয়ান ঔপন্যাসিক আব্দুলরাজাক গুরনাহ। ৭৩ বছর বয়সি তানজানিয়ার এই কথাসাহিত্যিক কে এই পুরস্কার দেওয়া হলো, ঔপনিবেশিকতার অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে তার আপসহীন সংগ্রাম এবং সংস্কৃতি ও মহাদেশীয় পরিসরে উদ্বাস্তু মানুষের কণ্ঠস্বরকে সাহসের সঙ্গে তুলে ধরার জন্য। 

উল্লেখ্য, ১৯৮৬ সালে ওলে সোয়িঙ্কার ৩৫ বছর পর একজন আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হলো।

আব্দুলরাজাক গুরনাহ ১৯৪৮ সালের ২০ ডিসেম্বর,  ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জাঞ্জিবার দ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন। এলাকাটি তখন ছিল “সালতানাত অব জাঞ্জিবার”, যা এখন তানজানিয়া হিসাবে পরিচিত।। ১৯৬০ সালে, জাঞ্জিবারে মুসলমানবিরোধী রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা হলে তার বড় ভাইয়ের সাথে শরণার্থী হিসেবে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান তিনি। তখন তার বয়স মাত্র ১২। মাত্র প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করা গুরনাহের সামনে তখন অনিশ্চিত জীবন। তার এক চাচাত ভাই তখন কেন্ট-এ পড়াশুনা করছিলেন। তিনি তাদের ইংল্যান্ডে বসবাস করতে সাহায্য করেন।

১৯৬৩ সালে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতা থেকে জাঞ্জিবার মুক্ত হয়। কিন্তু সেই সময় সে দেশে শুরু হয় আরব-বংশোদ্ভূতদের বিরুদ্ধে অত্যাচার এবং গণহত্যা। আব্দুলরাজাক ও তার পরিবার আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে পড়লে তাদের দেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়। ১৯৮৪ সালের আগে তিনি আর স্বভূমিতে ফিরে যেতে পারেননি।

তিনি ইংল্যান্ডেই লেখা পড়া করেন ও জীবিকা হিসাবে শিক্ষকতা গ্রহণ করেন। মাধ্যমিক শেষ করার পর তিনি প্রথমে ইংল্যান্ডের ক্যান্টারবারি ক্রাইস্ট চার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। পরবর্তীকালে কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়-এ পড়াশুনা করেন। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৩ অব্দি, নাইজেরিয়ার বেয়ারিও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন তিনি। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে, তিনি ইংল্যান্ডের কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়েই ১৯৮৫ সাল থেকে শুরু করে ২০১৭ সালে অবসরগ্রহণ অবধি এক নাগাড়ে ইংরেজি এবং উত্তর উপনিবেশিক সাহিত্যের অধ্যাপনা করেছেন।

এখানে অধ্যাপনা ছাড়াও ডাইরেক্টর অফ গ্রাজুয়েট স্টাডিস-এর দায়িত্ব পালন করেছেন গুরনাহ। উল্লেখ্য,  তিনি সালমান রুশদী, ভি. এস. নাইপল, জোসেফ কনরাড, জর্জ ল্যামিং, জ্যামাইকা কিঙ্কেইড সহ বহু খ্যাতিমান সাহিত্যিকের সরাসরি শিক্ষক। এছাড়াও তিনি “ওয়াসাফিরি” নামীয় জার্নালের সহেযোগী সম্পাদক।

বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যের পূর্ব সাসেক্সের ব্রাইটনে বসবাস করেন।

২১ বছর বয়স থেকেই ইংরেজ নির্বাসনে লেখালেখি শুরু করেন গুরনাহ। প্রথম দিকে স্বীয় মাতৃভাষা ‘সোয়াহিলি’ ভাষায় সাহিত্য রচনার প্রচেষ্টা করলেও, পরবর্তীতে তিনি ইংরেজি ভাষাকে তার সাহিত্য ভাষা হিসাবে গ্রহণ করেন। এছাড়াও তার, সুইডিশ, ফ্রেন্স ও জার্মানী ভাষায় বিশেষ দখল আছে। এই সমস্ত ভাষায় অনেক বই লিখে সাহিত্য জগতে অবদান রেখেছেন তিনি।

যৌবনের প্রারম্ভেই বাস্তুচ্যুত হওয়ার নির্মম অভিজ্ঞতা কখনই তার মন থেকে অপসৃত হয় নি। তাই তার দরদি ভাষার দ্ব্যর্থহীন লেখায় ফুটে উঠেছে ঔপনিবেশিকতার দুর্দশা আর শরণার্থীদের জীবনের পরতে পরতে ঘটে থাকা ঘাত-প্রতিঘাত। তিনি বারংবার প্রতিপন্ন করেছেন যে, ঔপনিবেশিকতার কৃষ্ণছায়া শাসিত মানুষের মনন, দৃষ্টিভঙ্গি ও সংস্কৃতিতে দীর্ঘকাল বিদ্যমান থাকে।গুরনাহের লিখনশৈলীর বৈশিষ্ট হলো, বিভিন্ন চরিত্রের সমবায়ে একটি গল্পবিশ্ব গড়ে তোলা। যা নানা স্থান, বিভিন্ন সংস্কৃতি এবং বর্ণিল মানুষের বর্ণনায় সমৃদ্ধ।

এখন পর্যন্ত তানজানিয়ার এই সাহিত্যিক ১০টি উপন্যাস, কয়েকটি ছোট গল্প এবং ২ টি প্রবন্ধ লিখেছেন। যার মধ্যে অনেকগুলি বই হলো উদ্বাস্তু নিয়ে। তার প্রথম উপন্যাস “মেমোরি অব ডিপার্চার” প্রকাশিত হয় ১৯৮৭ সালে। ২০২০ সালে, তার দশম উপন্যাস “আফটার লাইভস” প্রকাশিত হয়েছে। তার উপন্যাসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো ‘প্যারাডাইস’ (১৯৯৪), যা বুকার এবং হুইটব্রেড পুরস্কারের ক্ষুদ্র তালিকাভুক্ত হয়েছিল; ‘ডিসার্শন’ (২০০৫) এবং ‘বাই দ্য সি’ (২০০১), যা বুকারের জন্য দীর্ঘ তালিকাভুক্ত এবং লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস বুক অ্যাওয়ার্ডের ক্ষুদ্র তালিকাভুক্ত হয়েছিল; এবং অ্যাডমায়ারিং সাইলেন্স (১৯৯৬) ইত্যাদি। তার ছোট গল্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ‘দ্য কালেক্টেড স্টোরিজ অফ আব্দুলরাজাক গুরনাহ’ (২০০৪)।

মূলত ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত উপন্যাস ‘প্যারাডাইস’ এর জন্যই এ বছর নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। এটি তার সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস। এ উপন্যাসের কাহিনী বিকশিত হয়েছে ২০ শতকের গোড়ার দিকে তানজানিয়ায় বেড়ে ওঠা এক বালকের গল্পকে কেন্দ্র করে। এটি মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বেকার পূর্ব আফ্রিকায় পটভূমিতে লিখিত।

তার লিখিত ‘প্যারাডাইস’ উপন্যাস টি বুকার জেতার পরই মূলত ঔপন্যাসিক আবদুল রাজাক গুরনাহর নাম আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়াতে শুরু করে। 

নোবেল জয়ের প্রতিক্রিয়ায় আব্দুলরাজাক জানান, “এত বড় একটি পুরস্কার, অসাধারণ সব লেখকদের পাশে আমার নাম, এ আমার বিশ্বাসই হতে চাইছিল না। আমি এতটাই বিস্মিত যে বিশ্বাস করার আগে নিজে কানে ওই ঘোষণা শোনা পর্যন্ত আমি সত্যি সত্যি অপেক্ষা করেছি।”

এ প্রসঙ্গে রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি বলে, “সত্যের প্রতি আব্দুলরাজাক গুরনাহ’র যে নিষ্ঠা, ঘটনার অতিসরলীকরণে তার যে ঘোর আপত্তি, পাঠককে তা নাড়া দেয়। তার উপন্যাস গতানুগতিক ধারাবর্ণনার রীতি থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের দৃষ্টির সামনে মেলে ধরে সাংস্কৃতি বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এক পূর্ব আফ্রিকাকে, যার সঙ্গে পৃথিবীর অনেক অঞ্চলের কোনো মিল নেই।”

প্রসঙ্গত, ১৮৯৫ সালের নভেম্বর মাসে আলফ্রেড নোবেলের উইলের মাধ্যমে নোবেল পুরস্কারের প্রবর্তন হয়। তার রেখে যাওয়া তিন কোটি সুইডিশ ক্রোনার দিয়েই শুরু হয় পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসা বিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া। পরবর্তীকালে ১৯৬৮ সালে, এই তালিকায় যুক্ত হয় অর্থনীতি। তবে পুরস্কার ঘোষণার আগেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন আলফ্রেড নোবেল। নোবেল পুরস্কার বিজয়ীরা একটি স্বর্ণপদক, একটি সার্টিফিকেট এবং ১০ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার (১ কোটি ১৪ লাখ ডলার) অর্থ পেয়ে থাকেন।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button