সংবাদসাম্প্রতিক

৪১ বছর জঙ্গলে কাটিয়ে দেওয়া বাস্তবের ‘টারজান’, সভ্যতায় এসে হল মৃত্যু

হলিউড সিনেমার অতি জনপ্রিয় এক চরিত্র ‘টারজান’। যে কিনা তার জীবনের অধিকাংশ সময়ই কাঁটিয়েছে গভীর জঙ্গলে। সেখানে পশু-পাখির সঙ্গে তার সখ্য; গাছগাছালির ফলমুল তার আহার। আধুনিক মানব সভ্যতা সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই ছিল না। তাই টারজান নিয়ে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। তাকে ঘিরে হয়েছে অনেক সিনেমা, নাটক। কিন্তু বাস্তবে কি টারজানের কোনো অস্তিত্ব আছে? এ প্রশ্ন অনেকের। কারণ, দূর্গম বনে জন্তু-জানোয়ার, সাপকূপের সঙ্গে একা বসবাস প্রায় অসম্ভব।

কিন্তু সিনেমার সেই চরিত্রটি মূলত কাল্পনিক হলেও বাস্তবেই এমন এক ব্যক্তির সন্ধান মিলেছে। 

বাস্তব জীবনের এই টারজানের নাম, হো ভ্যান ল্যাং। মাত্র কয়েক মাস আগেই গোটা বিশ্বে ভাইরাল হয়েছিল হো ভ্যান ল্যাং-এর কাহিনি। কল্প কাহিনির নায়ক টারজানের মতই, এই ব্যক্তিও ৪১ বছর ধরে তার বাবা এবং দাদার সঙ্গে সভ্য জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গভীর অরণ্যে বসবাস করতেন।

ল্যাং দের কথা সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ্যে আনলে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার আগেই সংবাদ মাধ্যমের ভিড় জমতে শুরু করত। তাতে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়তেন তারা। সেই কারণেই এতদিন বাদে প্রকাশ্যে এসেছে তার গল্পটা।

ঘটনাটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ভিয়েতনামে। হো ভ্যান ল্যাংয়ের এই গল্পের শুরু ১৯৭২ সালে। সেই বছর, ভিয়েতনাম যুদ্ধ যখন প্রায় শেষ, সেই সময় মার্কিন বোমার আঘাতে মৃত্যু হয়েছিল হো ভ্যান ল্যাং-এর মা এবং দুই ভাইবোনের। এরপরই তার বাবা হো ভ্যান থান, প্রাণ বাঁচাতে তাকে এবং তার দাদা ত্রি-কে সঙ্গে নিয়ে ল্যাং কোয়াং এনগাই প্রদেশের তায়ে ট্র জেলার জঙ্গলের গভীরে পালিয়ে গিয়েছিলেন। সেই সময় হো ভ্যান ল্যাং এর বয়স মাত্র ২ বছর।

যুদ্ধের ভয়াবহতা তার বাবাকে এতটাই বিধ্বস্ত করে দিয়েছিল যে, তারপর ৪১ বছর আর দুই ছেলেকে নিয়ে তিনি সভ্য জগতে ফেরেননি। এছাড়াও মানুষের সমাজে ফিরে আসার ব্যাপারে তার বাবার ফোবিয়া কাজ করত। তিনি ভাবতেন, যুদ্ধ কোনো দিন শেষ হবে না।

তাই চার দশক ধরে, তারা জঙ্গলেই ঘর বেঁধেছিল। সেখানে তারা পানির উৎস হিসেবে ব্যবহার করত নদী কে। সেই বনের মধ্যেই দড়ি এবং কাঠ দিয়ে বাড়িও বানিয়ে নিয়েছিল তারা। পোশাক হিসেবে ব্যবহার করত গাছের ছাল। আর দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস বানাত পাথর এবং কাঠ দিয়ে। আর খাদ্য? ল্যাং দের প্রতিদিনকার খাদ্য তালিকায় ছিলো সাপ, বানর, বাদুড়, টিকটিকি এবং অন্যান্য বন্য পশু। আর এই সব খাদ্যের মধ্যে তার সবচেয়ে পছন্দের খাবার ছিলো ইদুরের মাথা। জঙ্গলে পালানোর পর থেকে তাদের সঙ্গে ৪১ বছরে মাত্র ৫ জন মানুষের সাক্ষাত হয়েছিল। প্রত্যেকবারই তারা পালিয়ে গিয়েছিল।

সভ্য জগতের সঙ্গে তাদের ফের সাক্ষাত হয় ২০১৩ সালে। এই অদ্ভুত পরিবারের কথা প্রথম জানতে পারেন একজন চিত্রগ্রাহক। আলভারো সেরেজো নামের এই চিত্রগ্রাহক ওই পরিবারটির পিছু নিয়েছিলেন। তিনিই হো ভ্যান ল্যাং দের আস্থা অর্জন করে তাদের জঙ্গল থেকে নিয়ে এসেছিলেন পার্শ্ববর্তী এক গ্রামে। তারপর থেকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক মানবজীবনের সঙ্গে পরিচয় হতে থাকে ল্যাং।

চিত্রঃ ল্যাং এর সঙ্গে চিত্রগ্রাহক আলভারো সেরেজো

অদ্ভুত হলেই সত্যি, এই প্রথম মহিলাদের দেখেন হো ভ্যান ল্যাং। এর আগে জঙ্গলে বাবার সঙ্গে মানবসভ্যতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ৪১ বছর ধরে বসবাস করা হো ভ্যান ল্যাং নামের এই ব্যক্তি জানতেন না যে পৃথিবীতে পুরুষ ছাড়া নারী বলেও কিছু আছে। তারপর অনেকগুলো দিন কেটে গিয়েছে। আলভারো সেরেজো জানিয়েছেন, হো ভ্যান ল্যাং পুরুষ ও মহিলাদের দেখে তাদের মধ্যে তফাতটা ধরতে পারে ঠিকই, কিন্তু, নারী-পুরুষের মধ্যে আসলে যে কী তফাত রয়েছে, সেটা তার অজানাই থেকে গেছে। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই মানব সভ্যতার থেকে অনেক দূরে ছিলো বলে, মানবজীবনের অনেক জৈবিক চাহিদার বোধই তৈরি হয়নি তার। এই গোটা বনবাসের মধ্যে কোনো দিন যৌনতা বা নারীদের নিয়ে বাবা একটিও কথা বলেননি ল্যাং কে। ল্যাং-ও কোনোদিন যৌন চাহিদা বোধ করেননি।

এছাড়াও সময়ের ব্যাপারে ল্যাং এর কোনো ধারণা ছিলো না। সে শুধু রাত আর দিনের ব্যাপারেই জানত এবং ভাবত চাঁদ হচ্ছে এমন একটা জিনিস যেটা মানুষ আকাশে ঝুলিয়ে রেখেছে। তার মধ্যে ভালো এবং খারাপের কোনো বোধ ছিলো না। সে শুধু জানত, টিকে থাকার লড়াই মানেই বেঁচে থাকা।

তাদের সভ্য জগতে ফিরিয়ে আনা ফটোগ্রাফার সেরেজোর মতে, ল্যাং তার জীবনে দেখা সবচেয়ে ভাল মানুষ। ল্যাং-কে তিনিই সভ্য জগতে এনেছিলেন, তবে তাকে সভ্য জগতে থাকতে দেখতে তার ভালো লাগেনি। কারণ ল্যাং এর মন এবং শরীর এত বড় পরিবর্তন সামলাতে পারবে কি না, তাই নিয়ে সবসময় উদ্বিগ্ন ছিলেন সেরেজো। বরং, জঙ্গলে তার সঙ্গে কাটানো সময়টাই সেরেজো মনে রাখবেন। সেখানে ল্যাং-এর স্বচ্ছন্দ জীবনযাত্রা দেখেছিলেন তিনি। তাকে শিকার করতে দেখেছিলেন, কীভাবে পুরোপুরি সভ্যতা বিচ্ছিন্ন হয়ে তিনি বসবাস করতেন, তাও দেখেছিলেন। জঙ্গলে সেরেজোর যা করতে কয়েক ঘন্টা লাগত, তা ল্যাং কয়েক সেকেন্ডে করতে পারত। 

দুঃখজনক হলেও সত্যি, ল্যাং মানব সভ্যতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেনি। সভ্য জগতে আসার পর থেকেই শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছিল সে। বারবারই স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিচ্ছিল। পেটের অসুখে ভুগছিলেন। সেইসাথে নানা ধরনের ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলো তার শরীর। যার পরিনতি ঘটে লিভারে ক্যানসার ধরা পড়ে। 

এই বছরের আগস্টে, লিভার ক্যান্সারে ভুগে মাত্র ৫২ বছর বয়সেই তার মৃত্যু হয়। ল্যাং-এর মৃত্যুর পর সেরেজো ও অন্যান্য শুভাকাঙ্ক্ষীর মতে, সভ্য জগতে আসার পরে তাকে বেশ কিছু আধুনিক জীবনধারার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল প্রচুর প্রক্রিয়াজাত খাদ্য গ্রহণ। মাঝে মাঝে অ্যালকোহলও পান করতেন। 

ল্যাং-এর মৃত্যুর পর সেরেজো বলেছেন, ল্যাং-এর মৃত্যু তার পক্ষে খুবই দুঃখের, তবে তিনি জানেন মৃত্যুতে ল্যাং মুক্তিও পেয়েছেন। কারণ, গত কয়েক মাসে ধরে তিনি খুবই কষ্ট পাচ্ছিলেন। 

জীবনের প্রথম চার দশক জঙ্গলের খাটি খাদ্যাভ্যাসে তৈরি শরীর, এই সভ্য জগতের খাবার-দাবার সহ্য করতে পারেনি। হয়তো তারই প্রভাব পড়েছিল তার স্বাস্থ্যের উপর, যার পরিণতি ঘটলো মৃত্যুতে।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button