জীবনীসাম্প্রতিক

কে এই রাসেল, কোচিং টিচার থেকে যেভাবে হলেন ইভ্যালির সিইও

প্রায় ১৭ লাখ নিয়মিত ক্রেতা, ২০ হাজারের অধিক বিক্রেতা নিয়ে বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতে স্বল্প সময়ে প্রথম সারিতে উঠে এসেছিলো দেশীয় ই-কমার্স স্টার্টআপ ‘ইভ্যালি’। লোভনীয় ডিসকাউন্ট কিংবা ক্যাশব্যাকের অফার দেওয়ার ক্ষেত্রে ইভ্যালির নাম আসে সবার আগে। প্রাথমিক ভাবেই ইভ্যালি প্রতিদিন ৫ হাজার অর্ডার প্রসেস করেছিলো। ২০২০ সালে, জনপ্রিয় সাময়িকী এশিয়া ওয়ানের জরিপে, এশিয়ার মধ্যে স্বল্পসময়ে দ্রুতবর্ধনশীল ই-কমার্স স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি ও বিজনেস লিডার হিসেবে অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছিলো প্রতিষ্ঠানটির সিইও মোহাম্মদ রাসেল।

কিন্তু মাত্র ১ বছরের ব্যবধানে এই চিত্র টি পুরো উল্টে গেছে। বিশাল অফার, ছাড়ের ছড়াছড়ি আর ক্যাশব্যাকের আকর্ষণ দিয়ে অল্প সময়ে অনলাইন ক্রেতাদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করলেও বর্তমানে গ্রাহক ভোগান্তি ও সমালোচনার শীর্ষে অবস্থান করছে এই প্রতিষ্ঠান টি। 

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে, ইভ্যালির সিইও মোহাম্মদ রাসেল ও তার স্ত্রী শামীমা নাসরিনের হাত ধরে যাত্রা শুরু করে এই কোম্পানি। রাজধানীর রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি শেষ করার পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন রাসেল। ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত একটি কোচিং সেন্টারে  শিক্ষকতা করার মধ্য দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করেন তিনি। পরবর্তীতে ২০১১ সালে, ঢাকা ব্যাংকে যোগদান করেন তিনি। পাশাপাশি ২০১৩ সালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেন। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই রাসেল হতে চেয়েছেন উদ্যোক্তা। তাই ঢাকা ব্যাংকে ৬ বছর থাকার পর ২০১৭ সালে চাকরি ছেড়ে টুকটাক ব্যবসায় করার কাজে মনোযোগ দেন বিগ অনলাইন শপিং মল ইভ্যালির উদ্যোক্তা। ২০১৬ সাল থেকেই মূলত ব্যবসায় শুরু করেন তিনি। প্রথম বিজনেসটা শুরু হয় ডায়াপার বিজনেস দিয়ে। এরপর থেকে আস্তে আস্তে শুরু। ২০১৭ সালে, এই ব্যবসায় করতে গিয়েই বড় একটি প্লাটফর্মের চিন্তা আসে তার মাথায়। সেখান থেকেই ২০১৮ সালের শেষে এসে ইভ্যালির শুরু।

মোটরসাইকেল, গাড়ি, মোবাইল, ঘরের সরঞ্জাম এবং আসবাবপত্রের মতো উচ্চমূল্যের পণ্যে লোভনীয় ছাড় দেয় ইভ্যালি। প্রতিষ্ঠার শুরুতে সাইক্লোন, আর্থকোয়েক ইত্যাদি নামে তারা ক্রেতাদের ১০০ শতাংশ ও ১৫০ শতাংশ ক্যাশব্যাকের মতো অত্যন্ত লোভনীয় অফার দেয়। ইভ্যালির ব্যবসায়ের এ কৌশলের ফলে মানুষের মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি হওয়ায় বাড়তে থাকে বিনিয়োগ। প্রায় অর্ধেক দামে পণ্য পেয়ে খুশি ক্রেতারাও।

কিন্তু এতদিন পরে এসে বেরিয়ে পড়লো থলের বেড়াল।

সম্প্রতি ইভ্যালির ‘সম্পদের চেয়ে ছয় গুণ বেশি দেনা’ বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে তথ্য উঠে আসে। সব মি‌লি‌য়ে ইভ্যালির মোট দেনার পরিমাণ ৫৪২ কোটি ৯৯ লাখ ৫৮ হাজার ৪৮২ টাকা। বলা হয়েছিলো, এই দেনার বিপরীতে তাদের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সম্পদ রয়েছে ৫৪৩ কোটি ৯৯ লাখ ৫৮ হাজার ৪৮২ টাকা। কিন্তু অতীতে ইভ্যালির পক্ষ থেকে যে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের হিসাব দেখানো হয়েছে সেখানেও সেই সম্পদের সঠিক কোনো হিসাব নেই।

এমনকি তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ইভ্যালির দায়ের বিপরীতে তাদের চলতি সম্পদ রয়েছে ৯০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। ইভ্যালির বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বর্তমানে প্রায় ৩০ লাখ টাকা রয়েছে। এ ছাড়া কয়েকটি গেটওয়েতে ৩০-৩৫ কোটি টাকা আটকা রয়েছে। কোম্পানির প্রায় ২৫-৩০টি যানবাহন রয়েছে। ব্যক্তি পর্যায়ে সাভারে রাসেলের ৭-৮ কোটি টাকা মূল্যের জায়গা-জমিসহ অন্যান্য সম্পদ রয়েছে। সব মিলিয়ে স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে ১০৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।

অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটি দুই লাখের বেশি গ্রাহকের কাছ থেকে অগ্রিম নিয়েছে ২১৪ কোটি টাকা, আর মার্চেন্টদের কাছ থেকে বাকিতে পণ্য নিয়েছে ১৯০ কোটি টাকার। এ ছাড়াও বিভিন্ন ইভেন্টে স্পন্সর করা, নতুন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠা, প্রচার প্রচারণা ও লোভনীয় অফার অনুসারে গ্রাহকদের কাছে পণ্য ডেলিভারী করেও মোটা অঙ্কের দায় বাড়িয়েছে ইভ্যালি। সবমিলিয়ে স্বাভাবিক নিয়মে প্রতিষ্ঠানটির কাছে কমপক্ষে ৪০৪ কোটি টাকার চলতি সম্পদ থাকার কথা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের কাছে যে চলতি সম্পদ রয়েছে সেগুলো দিয়ে মাত্র ১৬ শতাংশ গ্রাহকের দায়মুক্তি সম্ভব বলে জানা গেছে।

তাহলে কোথায় আছে এই টাকা, এই প্রশ্নই এখন সর্বত্র। ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো: রাসেল এই টাকার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর বুধবার, রাসেল ও তার স্ত্রী শামীমা নাসরিনের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গুলশান থানায় মামলা করা হয়। সেই সূত্র ধরেই  বৃহস্পতিবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে নিলয় কমপ্রিহেনসিভ হোল্ডিংয়ের বাসায় (হাউজ ৫/৫এ, স্যার সৈয়দ রোড) অভিযান পরিচালনা করে র‌্যাব। সেখান থেকে  গ্রেফতার করা হয় রাসেল-নাসরিন দম্পতি কে। এরপর বিকাল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে তাদের সাদা গাড়িতে করে র‌্যাব সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়।

গ্রেফতারের পর র‍্যাবের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য। লাভজনক প্রতিষ্ঠান না হলেও ইভ্যালি গ্রাহকদের এই টাকা দিয়েই প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের ব্যয় করত। রাসেল ও তার স্ত্রী পদাধিকার বলে নিজেরা মাসিক পাঁচ লাখ টাকা করে ১০ লাখ টাকা বেতন নিতেন। প্রতি মাসে দুই হাজার স্থায়ী স্টাফ ও ১৭০০ অস্থায়ী স্টাফকে বেতন দিতে ব্যয় করা হতো ৫ কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যবসায় মন্দা থাকায় ১৩০০ স্টাফকে মাসে দেয়া হতো দেড় কোটি টাকারও বেশি। তারা স্বামী স্ত্রী কোম্পানির টাকায় ব্যক্তিগত দু’টি দামী গাড়ি (রেঞ্চ রোভার ও অডি) কিনেছিলেন। ভাড়াকৃত স্পেসে ধানমন্ডিতে প্রধান কার্যালয় এবং কাস্টমার কেয়ার স্থাপিত হয়। একইভাবে ভাড়াকৃত স্পেসে আমিনবাজার ও সাভারে দু’টি ওয়ার হাউজ চালু করা হয়। 

অন্যদিকে মোহাম্মদ রাসেলের মুক্তির দাবিতে আদালতের সামনে বিক্ষোভ করেছেন ভুক্তভোগী গ্রাহকরা৷ গত ১৭ সেপ্টেম্বর শুক্রবার, বিকেল তিনটার দিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সামনে এ বিক্ষোভ করেন তারা। তাদের দাবি, রাসেলকে গ্রেপ্তার করায় এখন তারা তাদের পণ্য বা টাকা ফেরত পাবেন না। এর উপর রিমান্ডে নেওয়ায় আরও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাদবাকি দেখার অপেক্ষা এখন।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button