জীবনী

হুররাম সুলতানঃ ক্রীতদাসী থেকে সম্রাজ্ঞী বনে যাওয়া এক ক্ষমতাধর নারী

অটোমান সাম্রাজ্য সম্পর্কে অল্পবিস্তর জ্ঞান আছে, কিন্তু হুররাম সুলতানের নাম শোনেনি এমন মানুষ নেই বললেই চলে। উসমানীয় ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর নারীদের মধ্যে একজন এবং নারীদের সালতানাত নামে পরিচিত শাসনকালের একজন অন্যতম ব্যক্তিত্ব এই হুররাম সুলতান। হুররেম সুলতানের হাত ধরেই উসমানীয় সাম্রাজ্যে সর্বপ্রথম নারীদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু প্রাথমিক অবস্থায় তার জন্যে সবকিছু এত সহজ ছিল না। তাকে যেতে হয়েছে নানা উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে। 

কে ছিলেন এই হুররাম সুলতান?

হুররাম সুলতান ছিলেন উসমানীয় সম্রাট প্রথম সুলাইমানের প্রিয়তম কানিজ(যৌনদাসী) ও পরবর্তীকালে তার বৈধ স্ত্রী। আনুমানিক ১৫০০-১৫১০ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে পোল্যান্ডের ছোট একটি শহর রোহাতিন (বর্তমানে যেটি পশ্চিম ইউক্রেনের একটি অংশ) এর এক অর্থোডক্স পাদ্রি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। হুররাম’ তার নাম ছিল না, সুলতান সুলেইমান তাকে ভালোবেসে এই নামে ডাকতেন। হুররাম নামের অর্থ ‘যে আনন্দ দেয়’। মূলত তার নাম ছিলো রোক্সেলানা। ঐতিহাসিকের মতে, জন্মসূত্রে রোক্সেলানার আসল নাম ছিল আলেকজান্দ্রা রুসলানা লিসোভস্কা, বা আনাস্তাযজা লিসোভস্কা, এবং শৈশবে তার ডাকনাম ছিল নাস্তিয়া। তার বাবার নাম ছিলো হাভ্রাইলো লিসভস্কি।

১৫২০-এর দশকে, ক্রিমিয়ার তাতাররা ওই এলাকার একটি তড়িৎ অভিযানের সময় তাকে বন্দী করে এবং  ক্রিমিয়ায় ক্রীতদাস বেচাকেনার বাজারে বিক্রি করে দেয়া হয়। তখন তার বয়স মাত্র ১৫ বছর। পরবর্তীতে অন্য ক্রীতদাসদের সাথে তাকে কনস্টান্টিনোপলে নিয়ে আসা হয়, সেখান থেকে অটোমান সুলতানের ব্যক্তিগত হারেমের জন্য তাকে কিনে নেয়া হয়।

হারেমে জায়গা হওয়ার কয়েক মাসের ভেতর হুররাম সুলেইমানের নজরে চলে আসেন। তার নজরকাড়া সৌন্দর্য, মনভোলানো হাসি আর বুদ্ধিমত্তা ক্রমেই সুলতানের মন জয় করে নিচ্ছিল। যার কারণে সমসাময়িক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ঈর্ষার পাত্রীতে পরিণত হন তিনি। যার মধ্যে অন্যতম ছিল মাহিদেভরান সুলতান, যিনি সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মুস্তাফার মা ছিলেন। প্রতিদ্বন্দ্বীদের দ্বারা অনেকবার আক্রমণের শিকার হলেও বুদ্ধিমত্তা আর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় হুররাম সেসব আক্রমণ প্রতিহত করেন।

অটোমান রীতি অনুযায়ী, সুলতানের উপপত্নীরা একটিমাত্র সন্তান জন্ম দিতে পারলেও, হুররাম মোট ছয় টি সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। তাদের ভেতর একজন ছিলেন মেয়ে। সবার বড় ছিলেন মেহমেদ, যার জন্মের পর সুলতান হুররামকে ‘হাসেকি সুলতান’ নাম দিয়ে সম্মানিত করেন, যার অর্থ ‘শাহজাদা’র মা’। 

সুলতান সুলেইমানই একমাত্র সুলতান, যিনি কেবল একজন নারীর প্রতিই বিশেষভাবে দুর্বল ছিলেন। হুররামের প্রতি তার ভালোবাসা হুররামকে নিয়ে যায় অনন্য এক সম্মানের জায়গায়। পরবর্তীতে হুররাম এর রূপে গুনে মুগ্ধ হয়ে, দুইশত বছরের অটোম্যান ঐতিহ্যকে ভঙ্গ করে, তাকে বিয়ে করেন সুলতান। একজন প্রাক্তন উপপত্নী এভাবে অবশেষে সুলতানের বৈধ পত্নী হয়ে ওঠেন। 

এই ঘটনা সুলাইমানকে ওরহান গাজির পর প্রথম কানিজ বিবাহকারী সুলতানের পরিচয় এনে দেয় এবং প্রাসাদে হুররামের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে, যার ফলশ্রুতিতে তার অন্যতম পুত্র দ্বিতীয় সেলিম ১৫৬৬ সালে সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার লাভ করেন।

পূর্বে হুররাম ছিলেন অর্থোডক্স খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। সুলতানের সঙ্গে বিয়ের আগে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন তিনি। বিয়ের পর হুররাম সুলতানের কাছে নিজেকে একজন ‘কৃতদাসী স্ত্রী’ হিসেবে মেনে নিতে পারছিলেন না। কৃতদাসী হিসেবে সুলতানের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে থাকাটাকে নিজের জন্য অপমানজনক ভাবছিলেন তিনি। তাই এ ব্যাপারে সুলতানকে অনুযোগ করেন হুররাম। সুলতানও বিষয়টি অনুধাবন করে তাকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করে দেন। এই বিয়ে এবং সুলতানের ব্যক্তিগত সম্পত্তি থেকে মুক্ত হওয়ার মাধ্যমে অল্প সময়ের ভেতর হুররাম প্রাসাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একজন হয়ে ওঠেন।

তবে এসবের জন্যে হুররাম এর কৃতিত্ব ও কম নয়। সুলতানের প্রিয়ভাজন হওয়ার জন্য নিজেকে একটু একটু করে তৈরি করে নিয়েছিলেন তিনি। অটোমানদের ভাষা, ব্যাকরণ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, সাহিত্য, জ্যোতির্বিদ্যা, ভূগোল এবং কূটনীতি নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা করেছেন। অপরূপ সৌন্দর্য আর মেধার জোরে তিনি সুলতানের ব্যক্তিগত পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ পান। তার কূটনৈতিক বুদ্ধি ও দক্ষতার কারণে অটোমান সাম্রাজ্য ও পোল্যান্ডের মাঝে সুসম্পর্ক স্থাপিত হয়, যা টিকে ছিল বহুদিন। ইউরোপে ক্রিমিয়ান তাতারদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হুররাম কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন।

সুলায়মান হুররেম সুলতানকে অটোম্যান সম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী বানিয়েছিলেন আর তার সমান মর্যাদা দিয়েছিলেন। অটোম্যানের ইতিহাসে এর আগে অন্য কারো সুলতানের স্ত্রীকে এই মর্যাদা দেয়া হয় নি। এমনকি সুলতান সুলেমান দরবারে সভায় হুররেমকে তার পাশে বসাতেন এবং সভায় যেকোন বিষয়ে হুররামের পরামর্শ নিতেন। সেইসাথে কোনো কোনো দাপ্তরিক কাগজে সুলতানের পাশাপাশি হুররেম সুলতানেরও স্বাক্ষর আর সিলমোহর নিতেন।

সুলায়মান বাকি জীবনে রাজসভাতেও হুররেমকে তার সাথে থাকতে দেন। সুলতানের রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবেও হুররেম ভূমিকা পালন করেছেন, এবং প্রতীয়মান হয় যে তিনি বৈদেশিক নীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও প্রভাব রেখেছিলেন।

ব্যক্তিগত জীবনে হুররাম একজন জনদরদি হিসেবেও প্রমাণ মেলে। রাজনৈতিক উদ্যোগসমূহের পাশাপাশি, হুররেম মক্কা থেকে জেরুজালেম পর্যন্ত বহু রাষ্ট্রীয় স্থাপনার প্রধান কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। তার প্রথম স্থাপনাসমূহের মধ্যে ছিল একটি মসজিদ, দুটি মাদ্রাসা, একটি জলের ফোয়ারা, এবং কনস্টান্টিনোপলে নারী কৃতদাসী বাজারের (আভরেত পাজারি) সন্নিকটে একটি মহিলা হাসপাতাল। তার নির্দেশে নিকটবর্তী হাজিয়া সোফিয়ার উপাসক সম্প্রদায়ের সেবায় ‘হাসেকি হুররেম সুলতান হামামি’ নামে একটি স্নানাগার নির্মিত হয়। ১৫৫২ সালে. জেরুজালেমে দুস্থ ও অসহায়দের খাদ্যাভাব মেটাতে ‘হাসেকি সুলতান ইমারেত’ নামে একটি রাষ্ট্রীয় লঙ্গরখানা প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।

হুররাম গরীব দুঃখীদের অনেক সাহায্য সহযোগীতা করতেন। এমনকি তিনি গরিব দুঃখীদের অবস্থা জানার জন্য ছদ্মবেশে বাহিরে বের হতেন।

তবে অনেকের মতে, মাহিদেভ্রান এর সন্তান মুস্তফাকে হটিয়ে নিজ সন্তানকে সুলতান বানানোর জন্য এক বিরাট ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন হুররাম। যেই ষড়যন্ত্রের বলি হন সুলতানের প্রিয় বন্ধু ইব্রাহিম পাশা ও। 

১৫৫৮ খ্রিস্টাব্দের ১৫ এপ্রিল, হুররাম অজানা এক রোগে মৃত্যুবরণ করেন। ধারণা করা হয়, তার খাদ্যনালীতে আলসার হয়েছিল। সুলতান সুলেইমানের ব্যক্তিগত মসজিদের অন্তর্ভুক্ত সমাধিকেন্দ্রে সুলতান হুররামকে সমাহিত করা হয়।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button