ইতিহাস

আহমেদ শাহ্‌ মাসউদ থেকে আহমেদ মাসউদঃ পাঞ্জশিরের তালেবান বিরোধী লড়াই

৯/১১ হামলার মাত্র দুদিন আগে, বিবিসি মারফত জানা যায়,আফগানিস্তানের দূর্গম পাঞ্জশির উপত্যাকায় আল কায়েদার আত্মঘাতি হামলায় মারা গেছেন তালেবান বিরোধী নেতা আহমেদ শাহ্‌ মাসউদ। পশ্চিমের কাছে বহু আগ থেকেই নামটি পরিচিত ছিল। আফগানিস্তানের রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধ কিংবা সোভিয়েত আগ্রাসনে অনেক নেতার মাঝে তার নামটিও বিশ্ব মিডিয়ার কল্যাণে সবার কাছে পৌঁছে যায়। তবে অন্য সব নেতাদের থেকে ভিন্ন কিছু তার মধ্যে ছিল। ক্যারিশম্যাটিক সমর নায়ক হিসেবে পরিচিত মাসউদের জন্ম আফগানিস্তানের সবচেয়ে দূর্গম এলাকায়। ইতিহাসে কেউ পাঞ্জশির দখলে রাখতে পারেনি। এ যেন আফগানিস্তানের স্টালিনগ্রাদ। দূর্ভেদ্য এই উপত্যাকা যারাই দখল করতে গিয়েছে, নিজেদের পতন ডেকে এনেছে।

তার পিতা ছিলেন আফগান রাজ সেনাবাহিনীর একজন কর্নেল। জাতিতে তাজিক মাসউদ, মাতৃভাষা দারীর পাশাপাশি ফার্সি,উর্দু আর ফরাসি জানতেন মাসউদ। যৌবনে যখন কাবুলে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে যান, চারদিকে তখন চলছে তীব্র কমিউনিস্ট সরকারবিরোধী আন্দোলন। ধর্মীয় নেতা বুরহানউদ্দীন রাব্বানীর প্রতি অনুরাগ থেকে তিনি যোগ দেন আফগান জামাত-ই-ইসলামী দলে। আর যখন যুদ্ধ শুরু হয়, তখন দ্রুতই রণাঙ্গনে চলে যান মাসউদ। কিন্তু সব বিপ্লবে প্রতি বিপ্লব থাকে। আফগানিস্তানের বিপ্লবে দ্রুতই ভাঙ্গন ধরতে শুরু করে। একদিকে ধর্মীয় নেতা বুরহানউদ্দীনের দল,অন্য দিকে উগ্রপন্থি গুলবাদিন হেকমাতিয়ারের হেজব-উল-ইসলামী। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, মাত্র ২২ বছর বয়সী মাসউদকে খুন করতে গুপ্তঘাতক পাঠান গুলবাদিন।

আহমেদ শাহ্‌ মাসউদ

সোভিয়েত আগ্রাসনের সময় দ্রুতই জনপ্রিয় হতে থাকেন মাসউদ। ফলে দ্রুতই তার শক্তি বাড়তে থাকে। সোভিয়েতদের তাড়িয়ে দেয়ার পর, আফগানিস্তানে আবার শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। আগের চেয়ে রক্তাক্ত এই যুদ্ধের সময় বেশ কয়েকবার গুলবাদিন হেকমাতিয়ারের সাথে আলোচনায় বসতে চেয়েছিলেন মাসউদ। তবে হেকমাতিয়ার এতে সাড়া দেননি। ৯২তে কাবুলে উপর একটানা রকেট হামলা চালায় হেজবুল ইসলামী। এতে কাবুলের জনজীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। অনন্তকাল ধরে চলা এই যুদ্ধের যেন সমাপ্তি নেই!

এদিক কান্দাহারে তখন একটি নতুন মুভমেন্ট গড়ে উঠছিল। পাকিস্তানের দুধর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই’র প্রত্যক্ষ মদদে, পশতুন ভিত্তিক তালেবান আন্দোলন দ্রুতই ধেয়ে আসছিল। তালেবানরা একে একে সব যুদ্ধবাজ নেতাদের হটিয়ে নিজেদের দখল প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে। ১৯৯৬ সালের মধ্যেই কাবুল দখল করে ফেলে তারা। তবে এই যুদ্ধে তালেবানরা একা ছিল না। তাদের সাথে অনেক বিদেশি যোদ্ধাও ছিল,যারা বেশিরভাগই আল কায়েদা জঙ্গিগোষ্ঠীর সদস্য। যার প্রধান ছিলেন সৌদি নাগরিক, ওসামা বিন লাদেন।

১৯৯৮ সালে তালেবানরা আবদুর রশিদ দোস্তামের বাহিনীকে হটিয়ে শিয়া অধ্যুষিত মাজার ই শরীফ দখল করে নেয়। ফলে গোটা আফগানিস্তানে তালেবান বিরোধী একমাত্র জোট বলতে, মাসউদের বাহিনীই অবশিষ্ট থাকে । ৯৮’তে তাঞ্জিনিয়ার মার্কিন দূতাবাসে হামলার পর থেকেই ওসামা বিন লাদেনের বিষয়ে কাজ শুরু করতে থাকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। সিআইএ’র কয়েকজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা তখন পাঞ্জশিরে আহমেদ শাহ্‌ মাসউদের সাথে দেখা করতে যান। মাসউদের সাথে হওয়া আলোচনার বিষয়ে তারা বেশ ইতিবাচক ছিলেন। তারা অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন, এই দূর্গম পাহাড়ের ভেতরেও নিজের সংগ্রহে বিভিন্ন ভাষার কয়েক হাজার বই রেখেছেন মাসউদ। সেই আলোচনায় মাসউদ আল কায়েদার বিষয়ে আরো সতর্ক হতে বলেন তাদের। ২০০১ সালে ব্রাসেলসের ইউরোপীয়ান পার্লামেন্টে বক্তব্য রাখেন মাসউদ।

পাঞ্জশিরের পথে তালেবান যোদ্ধারা

কিন্তু সেই বছরের ৯ সেপ্টেম্বর সাংবাদিক সেজে আসা আল কায়েদা সদস্যদের আত্মঘাতী হামলায় মারা যান মাসউদ। আর দু’দিন পর তো পুরো পৃথিবীর ইতিহাস বদলে যায়।আজকে এত বছর পর, তালেবান আবার ফিরে এসেছে। আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী হয়ে। তবে পাঞ্জশির আগের মতই লড়াই করছে। যদিও তালেবান আগের চেয়ে সফল। এই লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, মাসউদের ৩২ বছর বয়সী ছেলে আহমেদ মাসউদ। ইরান ও ব্রিটিশ রয়্যাল মিলিটারি একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ পাওয়া আহমেদ মাসউদ পিতার স্থান পূরণের আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। তবে বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী পাঞ্জশিরের অনেক এলাকা এখন তালেবানের নিয়ন্ত্রণে। আর আহমেদ মাসউদ হেলিকপ্টারে করে তাজিকিস্তানে পালিয়ে গেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। সময় বলতে যাচ্ছে ,অবশেষে কি পতন দেখবে পাঞ্জশির?       

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button