জীবনী

ইমাম মাহদী (আ.): শেষ জামানার মুক্তির দূত

হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর তিরোধনের পর মুসলমানগণ দুই দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এক দল বিশ্বাস করে যে, নবী (সা.) তার কোন প্রতিনিধি নিয়োগ করে যাননি। আর অন্য দল বিশ্বাস করে যে, তিনি তার প্রতিনিধি বা ইমাম নিযুক্ত করে গেছেন। এই ইমামদের সংখ্যা হচ্ছে বারোজন, যাদের প্রথম হচ্ছেন হযরত আলী (আ.) আর শেষ হযরত মাহদী (আ.)।

জন্ম ও বংশপরিচয় 

শিয়া মাযহাবের শেষ ইমাম এবং রাসূল (সা.)-এর বারতম উত্তরাধিকারী, ইমাম মাহদী ২২৫ হিজরির ১৫ই শাবান শুক্রবার প্রভাতে (৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দে) ইরাকের সামেররা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার উপনাম আবুল কাসেম। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন “মাহদী’র নাম আমার নামেই”। অনুরূপ ভাবে হযরত আলী (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে “মুহাম্মদ” মাহদী’র নাম। 

তার বিভিন্ন উপাধীর মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্ল্যেখযোগ্য হচ্ছে, মাহদী, কাসেম, সাহেবুজ্জামান, সাহেবুল আমর, মুনতাজার ও হুজ্জাত। তবে তিনি মাহদী নামেই অধিক পরিচিত। ‘মাহদী’ শব্দের অর্থ ‘পথপ্রদর্শক’। তাকে ‘মাহদী’ বলা হয়েছে এ কারণে যে, কেয়ামত পূর্বমুহূর্ত তিনি নিজে হেদায়েত প্রাপ্ত এবং অন্যদেরকে সঠিক পথে হেদায়েত দান করবেন।

তিনি নবী পরিবারের বারোতম পুরুষ, ইমাম হোসাইন (আ.) এর নবম বংশধর, তাঁর পিতা ১১ তম ইমাম হযরত হাসান আসকারী (আ.) এবং মাতা নারজেস খাতুন।

হযরত মাহদীর (আ.) এর জন্ম ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। তাঁর জন্ম সম্পর্কে ঐ সময়ের মুসলমানরা এমনকি শাসকরা পর্যন্ত জানতো যে, ইমাম আসকারী (আ.) এর ঔরসে এক মহামানব জন্ম গ্রহন করবেন। যিনি সমস্ত অন্যায়, অবিচার জুলুম অত্যাচারকে সমুলে উপড়ে ফেলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। এই কারণে তারা ইমামের উপর বিভিন্ন কঠোরতা, অবরোধ আরোপ করে। যেন তাকে নিঃশেষ করে ইমাম মাহদী (আ.) এর জন্ম ও ইমামতের ধারাকে রুখতে পারে।

ইমাম আসকারী (আ.) তার ঘনিষ্ঠ জনদেরকে তার পরবর্তী ইমামের দুনিয়ায় আগমনের সংবাদ দিয়ে বলতেন, “শিঘ্রই আল্লাহ আমাকে একজন সন্তান দান করবেন এবং আমাকে তার দয়া ও অনুকম্পার অন্তর্ভুক্ত করবেন’। কোন শক্তিই কোন ষড়যন্ত্রই মহান আল্লাহ তা’আলার এই ইচ্ছাকে রুখতে পারবেনা। আল্লাহর অঙ্গিকার পূর্ণ হবেই।”

অন্যদিকে শত্রুরাও তাদের সমস্ত শক্তি সামর্থ নিয়ে মাঠে নেমে পড়ল। যেন আল্লাহর এই অঙ্গিকার পূর্ণতা না পায়। তারা ইমামকে সম্পূর্ণ নজর বন্দী করে রাখে, এমনকি তার বাড়িতে তার সঙ্গী-সাথী, আত্মীয় স্বজন এবং পাড়া প্রতিবেশীদের যাওয়া আসা ও নিয়ন্ত্রন করতো। কিছু কর্মচারীকে শুধুমাত্র এই কারণে নিযুক্ত করে রেখেছিল যে, যদি কোন ছেলে সন্তানকে ইমামের বাড়িতে ভূমিষ্ট হতে দেখে তাহলে যেন তাকে হত্যা করে। এত কিছুর পরে ও নারজেস খাতুন গর্ভবতী হন, শুধুমাত্র ইমাম এবং তার বিশেষ কিছু সঙ্গী সাথী ও নিকট আত্মীয় ছাড়া অন্য কেউ এ খবর জানত না।

প্রতিশ্রুত ইমাম মাহদী (আ.) কে সাধারণত : ‘ইমামুল আসর’ বা নির্দিষ্ট সময়ের ইমাম এবং ‘সাহিবুজ্জামান’ বা জামানার নেতা বলা হয়। জন্মের পর মহানবী (সা.) এর নামেই তার নাম রাখা হয়। তিনি জন্মের পর থেকে তার শ্রদ্ধেয় পিতা ইমাম আসকারী (আ.) এর প্রত্যক্ষ ও বিশেষ তত্ত্বাবধানে ছিলেন। স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা শিশু ইমামকে শয়তানের হাত থেকে রক্ষা ও সুরক্ষিত রেখেছিলেন।

ইমাম আসকারী (আ.) এর মৃত্যূর সময় ইমাম মাহদী (আ.) এর বয়স ছিল মাত্র ৫ বছর। অর্থাৎ ৫ বছর বয়স থেকেই তিনি ইমামত প্রাপ্ত হন। 

প্রত্যাবর্তন 

ইমামত নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও হযরত মাহদী (আ.) যে শেষ ইমাম এবং শেষ যামানায় তার আবির্ভাব ঘটবে তার ইমামত সম্পর্কে কারো মধ্যেই কোন মতভেদ নেই। ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা মনে করেন, ইমাম মাহদী (আ.) এর আত্মপ্রকাশ কিয়ামতের সর্বপ্রথম বড় আলামত। তিনি আগমণ করে এই উম্মাতের নের্তৃত্বের দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন। ইসলাম ধর্মকে সংস্কার করবেন এবং ইসলামী শরীয়তের মাধ্যমে বিচার-ফয়সালা করবেন। পৃথিবী হতে জুলুম-নির্যাতন দূর করে ন্যায়-ইনসাফ দ্বারা তা ভরে দিবেন। মুসলিম উম্মাহ তাঁর আমলে বিরাট কল্যাণের ভিতর থাকবে।

শুধুমাত্র ইসলাম ধর্মাবলম্বীরাই নয়, অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা ও তাদের ধর্মীয় গ্রন্থের বর্ণনা অনুসারে বিশ্বাস করে যে, পৃথিবীর শেষ যুগে একজন ত্রাণকর্তা ও মুক্তির দূত আসবেন। যিনি সমস্ত দুনিয়াকে অন্যায়-অবিচার-জুলুম-অত্যাচার ও নির্যাতনের কবল হতে মুক্ত করবেন। তিনি বিশ্বব্যাপি ইসলামী হুকুমাত ও ন্যায়বিচার কায়েম করবেন এবং পৃথিবীর বুক থেকে অসত্য এবং শোষণের পরিসমাপ্তি ঘটাবেন।

ইসলামি ঐতিহ্যমতে, তিনি নবী ঈসার সঙ্গে আগমন করবেন এবং সর্বজনীন খিলাফত কায়েম করবেন। বিভিন্ন সূত্রমতে, তাঁর শাসনকাল ৬, ৭ বা ৯ বছর স্থায়ী হবে।

কোরআনে ইমাম মাহদী (আ.) সম্পর্কে সরাসরি কোনো উল্লেখ না থাকলেও, হাদীসশাস্ত্রে বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। অধিকাংশ হাদীস মোতাবেক, তিনি আল-মসীহ আদ-দজ্জালকে (ভণ্ড খ্রীষ্ট বা খ্রীষ্টারি) পরাজিত করবেন। যদিও মাহদীর ধারণাটি সুন্নি ইসলামের অপরিহার্য কোনো তত্ত্ব নয়, এটি শিয়া ইসলামের একটি কেন্দ্রীয় ধারণা। উভয় মতাবলম্বীরাই বিশ্বাস করেন যে, মাহদী (আ.) মুসলমানদের শাসন করবেন এবং সমগ্র বিশ্বে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন; তবে তাঁর বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদা সম্পর্কে তাদের মধ্যে ব্যাপক মতবিরোধ রয়েছে।

ইমাম মাহদী (আ.)-এর জীবনী তিনটি অধ্যায়ে বিভক্ত:

১ । গুপ্ত অবস্থা : জন্মের পর থেকে ইমাম হাসান আসকারী (আ.) – এর শাহাদত পর্যন্ত তিনি গুপ্ত অবস্থায় জীবন-যাপন করেন।

২ । অদৃশ্যকাল : ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর শাহাদতের পর থেকে শুরু হয়েছে এবং আল্লাহর নির্দেশে আবির্ভাব হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তা চলতে থাকবে।

৩ । আসরে যহুর (আবির্ভাবের সময়): অদৃশ্যকাল শেষ হওয়ার পর মহান আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি আবির্ভূত হবেন এবং পৃথিবীকে সুখ-শান্তি ও সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ করবেন। কেউই তার আবির্ভাবের সময়কে জানেন না । ইমাম মাহদী (আ.) নিজেই বলেছেন ,‘ যারা তার আবির্ভাবের সময়কে নির্ধারণ করবে তারা মিথ্যাবাদী।

সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাললাহু আলিহি ওয়া সাল্লাম হুজাইফা বিন ইয়ামানকে এরশাদ করেছেন,“হে হুযাইফা ! এ দুনিয়া ধ্বংস হতে মাত্র একদিনও যদি অবশিষ্ঠ থাকে তাহলে মহান আল্লাহ তা’আলা সেই দিনকেই এতো বেশী দীর্ঘায়িত করবেন যাতে আমার আহলে বাইতের অন্তর্ভূক্ত এক ব্যক্তি বিশ্বের শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়, যার মাধ্যমে বড় বড় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও যুদ্ধ সংঘটিত হবে এবং ইসলাম ধর্ম বিজয়ী হবে।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button