জীবনী

কে এই আহমদ শাহ মাসউদ!

আহমদ শাহ মাসউদ ছিলেন একজন আফগান রাজনীতিবিদ এবং সামরিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সালের সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এবং একই সময়ের গৃহযুদ্ধের বছরগুলোতে একজন শক্তিশালী সামরিক কমান্ডার হিসেবে দায়িত্বপালন করেছেন।

সম্প্রতি তার ছেলে আহমদ মাসুদ আফগানিস্তানে অবস্থিত তালেবানবিরোধী প্রতিরোধ গড়ে তুললে আবারো শিরনামে আসে আহমেদ শাহ মাসউদ এর নাম।

কিন্তু কে এই আহমেদ শাহ মাসউদ!

আহমদ শাহ মাসউদ ১৯৫৩ সালের ২রা সেপ্টেম্বর, আফগানিস্তানের পাঞ্জশিরি অঞ্চলের বাজারকারে একটি জাতিগত তাজিকি সুন্নী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা দোস্ত মুহাম্মদ খান আফগান রয়্যাল আর্মিতে কর্নেল ছিলেন। আহমদ শাহ মাসউদ যখন তৃতীয় শ্রেণিতে ছিলেন তখন তার বাবা আফগানিস্তানের উত্তর-পশ্চিমে হেরাতের পুলিশ প্রধান হিসেবে যোগ দেন।

১৯৭০ এর দশকে, কাবুল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষে, উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্যে কাবুল পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটি তে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হন শাহ মাসউদ।

তখন তিনি কমিউনিস্ট বিরোধী মুসলিম আন্দোলনের আফগান নেতা বোরহানউদ্দিন রব্বানীর সান্নিধ্যে আসেন। তিনি মোহাম্মদ দাউদ খান সরকারের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সমর্থিত ব্যর্থ বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র থাকাকালীন, জামায়াতে ইসলামির ছাত্র সংগঠন সয্‌মান-ই জোওয়ানান-ই মুসলমান এ যুক্ত হন তিনি, যা আফগানিস্তানের কমিউনিস্ট শাসনের বিরোধিতা করে এবং দেশের সোভিয়েতের প্রভাব বাড়িয়ে তোলে ।

১৯৭৫ সালের দিকে, জামায়াতে ইসলামি ও গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের নেতৃত্বাধীন হিয্‌বে ইসলামির মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। এ-সময় হিয্‌বে ইসলামির কর্মীরা আহমদ শাহকে হত্যা করার চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যর্থ হয়।

১৯৭৮ সালের ২৭ এপ্রিল, পিপলস্‌ ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অব আফগানিস্তান (মার্ক্সবাদী) এবং সেনাবাহিনীর একটি দল প্রেসিডেন্ট দাউদ খানকে হত্যা করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। এই ঘটনার পর আহমদ শাহ মাসউদ পাকিস্তানে নির্বাসনে যান, কিন্তু শীঘ্রই জন্মভূমিতে ফিরে আসেন এবং সেনাবাহিনী গঠন করেন।

মার্ক্সবাদীরা সমাজতন্ত্রের বিস্তার এবং সেভাবে নীতি নির্ধারণ করতে চাইলে দেশের ইসলামি দলগুলোর সাথে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এ-সময় সমাজতন্ত্রী সেনাদের হাতে সারাদেশ পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লাখ মানুষ নিহত হয়। ১৯৭৯ সালে, ২৪ টি প্রদেশে সংঘাত শুরু হয়। অর্ধেকের বেশি সৈনিক সেনাবাহিনীর থেকে পালিয়ে যায়। ৬ই জুলাই, আহমদ শাহ মাসউদ পানশিরে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সম্মুখ যুদ্ধে সফল না হয়ে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। এ-বছরেই ২৪ শে ডিসেম্বর, সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগান সরকারকে টিকিয়ে রাখার জন্যে সেনা প্রেরণ করে। সরকার বিরোধীদের তারা নির্বিচারে হত্যা করতে থাকে। আহমদ শাহ সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন এবং প্রতিরোধ যুদ্ধের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠেন।  তাজিকিস্তানে তার বাহিনী একটি সামরিক বিমানবন্দর সহ ফার্কহর শহরটি দখল করে নেয়। বাস্তবজীবনে আহমদ শাহ মাসউদ চে গোয়েভারা ও মাও জেডং এর সামরিক কৌশল অধ্যয়ন করেছেন। উপত্যকায় তালেবানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।

১৯৭৯ সালে, সোভিয়েত দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে তার ভুমিকার জন্য তার অণুসারীরা তাকে “পাঞ্জশিরের সিংহ” (ফার্সি ভাষায়, শের-ই-পাঁশির, আক্ষরিকভাবে “পাঁচজন সিংহের সিংহ”) নামে ডাকা শুরু করে। 

১৯৮৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, রুশ বাহিনী আফগানিস্তান ত্যাগ করলেও, পিপলস্‌ ডেমোক্র্যাটিক পার্টি’র সরকার মুজাহিদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে। আহমদ শাহ ও সরকারবিরোধী লড়াই অব্যাহত রাখেন। দেশে চরম দুরবস্থা বিরাজমান রেখে ১৯৯২ সালে ১৭ই এপ্রিল এ-সরকার ক্ষমতা ত্যাগ করে।

২৪ শে এপ্রিল, পেশোয়ারে সমাজতন্ত্রবিরোধী দলগুলোর মধ্যে শান্তি ও ক্ষমতাবণ্টন চুক্তি সম্পাদিত হয়। এ-চুক্তিতে বুরহান উদ্দিন রব্বানী প্রেসিডেন্ট, আহমদ শাহ মাসউদকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও গুল্বুদ্দিন হেকমতিয়ারকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়।

ব্যক্তিজীবনে তিনি ৪ কন্যা সন্তান এবং এক পুত্রের জনক ছিলেন। “কমান্ডারের নাম” নামে একটি স্মৃতিকথা মূলক উপন্যাস প্রকাশ করেন তিনি।

২০০১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, আহমদ শাহ মাসউদ তার বন্ধু মাসুদ খালিলিকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন আফগানিস্তানে। খালিলি তখন নর্দান অ্যালায়েন্সের প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করছেন ভারত থেকে। তখন তারা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেন নি পরদিন যে দুজন সাংবাদিক আহমদ শাহ মাসউদ এর সাক্ষাৎকার নিতে যাচ্ছিলেন তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল তাকে হত্যা করা।

২০০১ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর, টুইন টাওয়ারে হামলার মাত্র দুই দিন আগে উত্তর আফগানিস্তানের তাখার প্রদেশে খাজা বাহাউদ্দিন এলাকায় আত্মঘাতি হামলায় আহমদ শাহ মাসউদ নিহত হন। এ হামলার জন্যে আল-কায়েদাকে অভিযুক্ত করা হয়। কারণ ওসামা বিন লাদেনের সঙ্গে তার বিরোধ ছিলো। এর আগে বহুবার কেজিবি, আইএসআই আফগান কমিউনিস্ট কেএইচএডি, তালেবান ও আল-কায়েদা তাকে হত্যা করার চেষ্টা করে । কিন্তু তাদের সেসব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। তার জন্মস্থান বাজারাকেই তাকে দাফন করা হয়। তিনিই একমাত্র আফগান নেতা যিনি কখনো আফগানিস্তানের বাইরে থাকেন নি।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button