খেলাধুলাজীবনী

নাসের আল খেলাইফিঃ ফরাসি ফুটবলের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি

যারা নিয়মিত ফরাসি ফুটবল অনুসরণ করেন তাদের কাছে নাসের আল-খেলাইফি অতি পরিচিত একটি নাম।  নামের আগে কোনো শেখ নেই এবং জন্ম ও হয়নি কোন ধনী পরিবারে, তবু আরব তথ্য মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষ ধনকুবেরদের মধ্যে একজন তিনি।

কাতারের এই ধনকুবের ফ্রান্সের ঘরোয়া ফুটবলের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন প্যারিস সেইন্ট জার্মেই (পিএসজি) এর মালিক। তার তারকাখচিত ক্লাব সবসময় ইউরোপের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনায় থাকলেও ব্যক্তি নাসের আল-খেলাইফি সবসময় আলোচনার বাইরে থাকতেই পছন্দ করেন। এজন্যই তার সম্পর্কে অনেক বিষয় অজানা রয়ে গেছে।

নাসের আল খেলাইফি ১৯৭৩ সালের ১২ নভেম্বর, কাতারের দোহায় অতি সাধারণ এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম নাসের বিন ঘানিম আল খেলাইফি। তার মা সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য জানা যায়নি। তবে তার বাবা ছিলেন একজন ‘মুক্তো জেলে’। একসময় পিতাকে তার কাজে সহায়তাও করতেন আল-খেলাইফি। কাতার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি নিয়ে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করার পর, পিরিয়াস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেরিটাইম স্টাডিজ -এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন তিনি। 

ক্রীড়াজগতে তার প্রথম পরিচয় টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন ই আল-খেলাইফি টেনিসে বেশ ভালো নাম কামিয়েছিলেন। একজন টেনিস পেশাদার হিসেবে, আল-খেলাইফি সুলতান খালফানের পর কাতার ডেভিস কাপ দলের দ্বিতীয় সফল সদস্য ছিলেন। এছাড়াও তিনি এটিপি ট্যুরের দুই আসরে অংশ নিয়েছিলেন। তবে দু’বারই প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় নিতে হয় তাকে। টেনিস ক্যারিয়ারের সুবাদে কাতারের আমির শেখ তামিমের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরি হয় আল-খেলাইফির। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী দেশ কাতারের রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থার প্রধান শেখ তামিম তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বন্ধু আল-খেলাইফিকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেন।

২০০৮ সালে, কাতার টেনিস ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় আল খেলাইফিকে। এরপর এশিয়ান টেনিস ফেডারেশনের ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তিন বছর পর ২০১১ সালে, কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি’র অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ‘কাতার স্পোর্টস ইনভেস্টমেন্ট’ এর চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন তিনি। 

দেশের ক্রীড়া জগতের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি আল-খেলাইফি ক্রমেই ব্যবসায় প্রসারে মনোযোগী হন, যার প্রথম ধাপ সম্প্রচার ব্যবসায়। যখন ‘আল-জাজিরা স্পোর্ট’কে অধিগ্রহণ করে ‘বিইন স্পোর্ট’-এ পরিবর্তন করল ‘বিইন মিডিয়া গ্রুপ’, এর পেছনে মূল চাবিকাঠি ছিলেন আল-খেলাইফি। এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী থাকা অবস্থায়ই ২০১৭ সালে তিনি হলিউডের জনপ্রিয় স্টুডিও ‘মিরাম্যাক্স’ কিনে নেন। আল-খেলাইফি যোগ দেওয়ার পর, ‘মিরাম্যাক্স’ মাত্র ৬ মিলিয়ন পাউন্ড বাজেটে ‘হ্যালোইন’ চলচ্চিত্রের সিক্যুয়েল বানিয়ে সারা বিশ্বের বক্স অফিস থেকে ২৪০ মিলিয়ন পাউন্ড আয় করে।

তবে বিশ্বফুটবল নাসের আল খেলাইফিকে চেনে পিএসজির প্রেসিডেন্ট ও সিইও হিসেবে। ফুটবল ক্যাম্পাসে প্রচুর অর্থ সম্পদের মালিক নাসের আল খেলাইফি ফুটবলে যা করতে চেয়েছেন তাই করেছেন। অঢেল প্রাচুর্য্য তার। ঠিক তেমনি ফুটবলের সাংগঠনিক মস্তিষ্কও দারুণ। সবমিলিয়ে রেলিগেশন অঞ্চল থেকে পিএসজি কে লিগ ওয়ানের সেরা দল বানিয়েছেন আল-খেলাইফি। আর সবই সম্ভব হয়েছে একা তার নিজের প্রচেষ্টায়।

২০১১ সালে, প্যারিস সেইন্ট জার্মে- পিএসজি এর দায়িত্ব নেন আল খেলাইফি। এরপরই ঘোষণা করেন যে, বিশ্ব সেরা ৩ ক্লাবের মধ্যে অন্যতম এক ক্লাবে পরিণত করবেন পিএসজিকে। এই ক্লাবটির মাধ্যমে ইউরোপীয় ফুটবলে বিশেষ ছাপ রাখতে মরিয়া খেলাইফি। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। একথার বাস্তবায়ন করে দেখান বিশ্বসেরা ফুটবলারদের দলে ভিড়িয়ে।

গত চার বছরের মধ্যে নেইমারের ২২২ মিলিয়ন ইউরোর ট্রান্সফার, কিলিয়ান এমবাপ্পের ১৮০ মিলিয়ন ইউরোর চুক্তি ঘিরে আলোচনায় আসেন তিনি। এর পর কাভানি, ডি মারিয়া, ক্রুইজ, রামোস, নাভাসদের মতো তারকা ফুটবলারদের পিএসজিতে একত্রিত করে এক নক্ষত্রের ক্লাবে পরিণত করেছেন খেলাইফি। তবে সবচেয়ে বড় চমক টি দিয়েছিন এই বছর। রেকর্ড অর্থ খরচ আর সবাইকে স্তব্ধ করে বার্সা থেকে প্রায় সাড়ে ছয়শ কোটি টাকার বিনিময়ে পিএসজিতে এনেছেন ফুটবল ধ্রুবতারা লিওনেল মেসিকে।

ফুটবল বিশ্বে বিষ্ময়ের আরও আভাস দিয়ে রেখেছেন খেলাইফি। মেসি-নেইমারের পর এবার নাকি ইয়্যুভেন্তাস সুপারস্টার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালোদোকেও মনে ধরেছে তার। আশা করাই যায়, মেসি-নেইমার-রোনালদো এইবার একই সঙ্গে একই ক্লাবের হয়ে মাঠে খেলতে নামবেন।

ধনকুবের এবং ক্রীড়াক্ষেত্রের অনেক বড় ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে আড়ালে রাখতেই বেশি পছন্দ আল-খেলাইফির। ব্যক্তিগত জীবনে ৪ সন্তানের জনক খেলাইফি। সারা বিশ্বে তার বহু সম্পদ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বলে গুঞ্জন শোনা যায়। ২০১৬ সালে, ফরাসি দৈনিক ক্রীড়া পত্রিকা ল’ইকুইপ তাকে ফরাসি ফুটবলের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি’ হিসেবে ঘোষণা করে।

কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে আল-খেলাইফি খেলা উপভোগের জন্য গ্যালারিতে হাজির হওয়া ছাড়া আল-খেলাইফিকে খুব কমই মিডিয়ার সামনে আসতে দেখা যায়। তার মালিকানায় একটি বিলাসবহুল ‘ল্যাম্বারগিনি অ্যাভেন্টেডর’ আছে বলে শোনা গেলেও এখনও সরাসরি তাকে কেউ তাতে চেপে বসতে দেখেনি। এসব কারণেই তাকে ইউরোপের মিডিয়ায় ‘রহস্য মানব’ উপাধি দিয়েছে।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button