আন্তর্জাতিক

গ্র্যাণ্ড স্ট্র্যাটেজিঃ রিপাবলিক তুরস্কের ওসমানি তুরস্কে ফিরে যাবার মহাপরিকল্পনা

৮০’র দশকে তুরস্ককে বলা হত, সিআইএ ও সোভিয়েত কেজিবির প্লে গ্রাউন্ড। এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগস্থল,তুরস্ক ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিবেশি। অপরদিকে সেখানে ছিল ন্যাটোর ফরোয়ার্ড অপারেশন এয়ার বেইজ- ইনসিলিরিক। ফলে সেখানে গুপ্তচরদের প্রচুর তৎপরতা লক্ষ্যণীয় ছিল। ইস্তাম্বুলের পথেঘাটে কেজিবি ও সিআইএ’র মধ্যে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে। নিজেদের দেশে এভাবে বিদেশি পরাশক্তিদের মধ্যকার ক্ষমতার লড়াই তুর্কি জনগণ কখনই ভালোভাবে নেয়নি।  কিন্তু সেসময় তুরস্কের পক্ষে তেমন কিছু করা সম্ভব হয়নি। ভৌগলিক কারণে, তুরস্কের গুরত্বপূর্ণ অবস্থান তাকে মার্কিন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের লোভাতুর দৃষ্টিতে পড়ে। ১৯৪৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথমবারের মত তুরস্কের বসফরাস প্রণালীতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। নৌ অবরোধ থেকে শুরু করে সামরিক আগ্রাসনের হুমকি দিতে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেন এর অপেক্ষাতেই ছিল। দ্রতই তারা সেখানে একটি নৌবহর পাঠায়। পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালে তুরস্ক ন্যাটোতে যোগ দেয়।

তুর্কি নৌবাহিনীর একটি ফ্রিগেট

অথচ মাত্র ৪০ বছর আগেও,তুরস্কের হাতে ছিল বিশ্বের ইতিহাসের বৃহত্তম সাম্রাজ্যগুলোর একটি। কিন্তু অযোগ্য শাসক,প্রশাসন, দুর্নীতি ও চক্রান্তের মুখে পড়ে ধ্বংস হয়ে যায়, মুসলিমদের ঐতিহ্যবাহী ওসমানী সাম্রাজ্য। ব্রিটিশ ফরাসি চক্রান্তে ওসমসানী সাম্রাজ্যের পতনের পর, তারা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে নিজেদের খেয়াল খুশিমত ভাগ করে নেয়। যা ইতিহাসে ‘সাইকস-পিকোট চুক্তি’ নামে কুখ্যাত। তুরস্কের ইতিহাসে সেসময় ক্রান্তিকাল চলছিল। পরবর্তীতে কামাল পাশা’র নেতৃত্বে গঠিত রিপাবলিক অব টার্কি বা আধুনিক তুরস্ক। এর পরের অনেক বছর, সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে তুরস্কের প্রভাব একদম তলানিতে ছিল। নিজেদের অতীত প্রতাপ হারিয়ে ধীরে ধীরে পশ্চিমাদের দালালে পরিণত হয় তারা।

তুরস্কের নির্মিত বাইরাক্তার ড্রোন

তবে যাদের হাজার বছরের সাম্রাজ্য শাসনের ঐতিহ্য আছে,তাদের এত সহজে পরাজিত করা সম্ভব না। স্নায়ুযুদ্ধের শেষ হবার পর, নড়েচড়ে বসে তুর্কি সরকারের কর্তাব্যাক্তিরা। আর বর্তমানে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের আমলা শুরু হয় তুরস্কের নবযাত্রা।যাকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নাম দিয়েছে, গ্র্যাণ্ড স্ট্র্যাটেজি। এর আওতায়, তুরস্কের লক্ষ্য হচ্ছে, তাদের পূর্বের আঞ্চলিক প্রভাব ফিরিয়ে আনা। তুরস্কের গ্র্যাণ্ড স্ট্র্যাটেজির প্রধান লক্ষ্য হল,সামরিক, অর্থনৈতিক, শিল্পায়ন ও খনিজ সম্পদ আহরণে প্রভাব বিস্তার করা। যার ফলে সাবেক ওসমানী সাম্রাজ্যের অঞ্চলগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণে ফিরে পায়।

প্রাথমিক লক্ষ্য হিসেবে তুরস্ক তার সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে নজর দেয়। সেসময় তুরস্ক বিশ্বের চতুর্থ অস্ত্র আমদানীকারক দেশ ছিল। সামান্য কিছু অস্ত্র উৎপাদন ছাড়া তুরস্কের কোন সক্ষমতা ছিল না। তুরস্ক তাই তার সামরিক বাজেট প্রায় ৮৬% বৃদ্ধি করে এবং সমরাস্ত্র উৎপাদনের দিকে নজর দেয়। ফলে কয়েক বছরের মাথায়,তুরস্ক সমরাস্ত্র উৎপাদনে ব্যাপক সফলতা পায়। বর্তমানে তুর্কি সামরিক বাহিনী তার ৭০% অস্ত্র নিজেরা তৈরি করে থাকে। অস্ত্র রপ্তানিতে তুরস্ক ১৪তম অবস্থানে আছে। তুর্কি  ড্রোন প্রযুক্তি সাম্প্রতিক সময়ে তার কার্যকারীতার জন্য সকলের নজড় কাড়তে সক্ষম হয়েছে।

সিরিয়ায় টহলরত তুর্কি সেনা

তুরস্কের এই ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতার প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়, তার আঞ্চলিক রাজনীতির প্রভাব বৃদ্ধির জন্য নেয়া পদক্ষেপগুলোর দিকে নজর দিলে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সাথে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে তুরস্ক। রুশ বিমান ভূপাতিত করা থেকে শুরু করে, সিরিয়ায় আসাদ বাহিনীর উপর বিমান হামলা চালানো। এসবকিছুই তুরস্কের ক্রমবর্ধমান সামরিক অগ্রগতির কথা বলে। সিরিয়ার পাশাপাশি লিবিয়ার জাতিসংঘ সমর্থিত সরকারকে সাহায্য করার জন্য সেনা পাঠায় তুরস্ক। যার বিপরীত ছিল খলিফা হাফতারকে সমর্থন দেয়া আরব আমিরাত, মিশর ও সৌদি আরব। এখানে উল্লেখযোগ্য, তুরস্কের এই গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজিতে তার প্রধান প্রতিপক্ষ সৌদি আরব। গত বছর সৌদি আরব ও আরব আমিরাত যখন কাতারের উপর অবরোধ দেয়। তখন তুরস্ক কাতারকে রক্ষা করতে সেনা পাঠায়। এভাবে সিরিয়া, লিবিয়া ও কাতারে তুর্কি সেনারা মোতায়েন রয়েছে। যা তুরস্কের কৌশলগত সুবিধা বৃদ্ধি করেছে। এছাড়া তুরস্কের লক্ষ্য সিরিয়া ও ইরাকের কুর্দি অধ্যূষিত অঞ্চলে সামরিক অভিযান চালিয়ে কুর্দিদের দমন ও ওই অঞ্চল নিজেদের দখলে নেয়া। তুর্কি সমরবিদরা এটাকেই কুর্দি গেরিলা দমনের উপায় হিসেবে দেখছেন।

নারগানো কারবাখ যুদ্ধে অংশ নেওয়া তুর্কি কন্টিনজেন্ট

আরবের বাইরে বলকান অঞ্চলে তুরস্ক তার প্রভাব বৃদ্ধির চেষ্টা করছে। অতীতে সোভিয়েত আমলে, সোভিয়েত সামরিক হামলার ভয়ে ভীত তুরস্ক বর্তমানে তার সামরিক শক্তি ব্যবহারে কার্পন্য করছে না। সম্প্রতি নারগানো কারবাখ যুদ্ধে তুর্কি সামরিক বাহিনী প্রমাণ করেছে, তারা এই অঞ্চলের অন্যতম গুরত্বপূর্ণ শক্তি। সামরিক অগ্রগতির পাশাপাশি তুরস্কের রাজনৈতিক লক্ষ্যও বেশ উচ্চভিলাষী। তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ গ্রীসকে রুখে দিতে এবং ভূমধ্যসাগর অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করতে তুরস্ক তার নৌবাহিনীকে ঢেলে সাজিয়েছে। তুরস্ক রুশদের হাত থেকে নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে সাবেক সোভিয়েত দেশ,যেমন রোমানিয়া, আজেরবাইজান,জর্জিয়ার সাথে কৌশলগত মিত্রতার দিকে ঝুঁকছে। এরা এখানে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে তুরস্কের খনিজ সম্পদ। তুরস্কের লক্ষ্য ইউক্রেনের সাথে সম্পর্ক ভাল করা। পাইপলাইনের মাধ্যমে ইউক্রেনে গ্যাস সরবরাহ করা,যাতে রাশিয়ার উপর তাদের নির্ভরতা কমে আসে। এর বাইরে তুরস্ক তার প্রথম পরমাণু বিদ্যূত কেন্দ্র পেতে চলেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, তুরস্কের মূল লক্ষ্য পরমাণু অস্ত্র সংগ্রহ।  

তবে তুরস্কের এই লক্ষ্য পূরণে তাদের সামনে আছে বিরাট বাঁধা। প্রথমত সামরিক দিক থেকে প্রতিবেশি গ্রীস পিছিয়ে থাকলেও ,দ্রুতই তারা কুটনীতির মাধ্যমে মিত্র যোগাড় করে ফেলে। ইউরোপে তুরস্কের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দী ফ্রান্স,ইতালি, মধ্যপ্রাচ্যের ইজরায়েল একজোট হয়ে তুরস্ককে লক্ষ্য করে নৌ মহড়া চালাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি,আমিরাতি ও মিশরীয় জোটকে মোকাবেলা করতে তাকে বেগ পেতে হচ্ছে। তাছাড়া আরব জাতিয়তায় বিশ্বাসী আরবরা তুরস্কের কর্মকান্ডে সমর্থন না দেয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সামরিক বাহিনীর বাজেট বৃদ্ধির প্রভাব তুরস্কের অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে। রুশদের থেকে এস-৪০০ মিসাইল কিনার পর, মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের উপর অবরোধ দেয়। আর তুরস্ককে এফ-৩৫ প্রোগ্রাম থেকে বাদ দেয়। ফলে তুরস্ককে বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। তুর্কি লিরার অব্যাহত দরপতনের মুখে,তুরস্ককে তার রিজার্ভের অর্ধেকটা খরচ করে ফেলতে হয়।

ফলে সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান আগের চেয়ে নমনীয় হয়েছেন। এমনকি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোন,যাকে এরদোগান, ‘দুষ্কৃতিকারী’ বলেছিলেন,তার সাথেও সম্পোর্কন্নয়ন করেছেন। অবশ্য বিশ্লেষকদের মতে, এরদোয়ানের লক্ষ্য ২০২৩ সাল। তুরস্কের স্বাধীনতা ১০০ বছর ও নির্বাচনের জন্য সালটি তার কাছে গুরত্বপূর্ণ। তাই, এই মুহুর্তে তিনি চাচ্ছেন না,একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়ে নির্বাচনে যেতে।

যাইহোক, অদূর ভবিষ্যতে এরদোয়ান প্রেসিডেন্ট হিসেবে থাকুন বা না থাকুন, তুরস্ক হয়ত তার প্রভাব বিস্তার বাড়ানোর চেষ্টা করবে। তাই,সামনের বছরগুলোতে  ঐ অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে বলা সবাই ধারণা করছেন।   

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button