জীবনীসাম্প্রতিক

কে এই পিয়াসা!

গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকটি ঘটনায় আলোচনায় এসেছে ‘মডেল পিয়াসা’ নামটি। পুরো নাম ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা হলেও ‘মডেল পিয়াসা’ নামেই ব্যাপক পরিচিতি তার। 

ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করে তার খুব একটা নামডাক হয়নি। শো-বিজ-এ ও তার তেমন কোনো কাজ দৃশ্যমান নয়। বরং বার বার নানা অপরাধে জড়িয়ে তিনি বেশ আলোচিত। মডেলিংয়ের আড়ালে অপরাধ সাম্রাজ্যে বিচরণ করে এই নারী। আন্ডারওয়ার্ল্ড কানেকশনে অস্ত্র কারবার থেকে শুরু করে মাদকের জমজমাট বাণিজ্যের অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। ধনাঢ্য পরিবারের সদস্যদের নিজের মাদকের আসরে ডেকে গোপন ছবি তুলে ব্ল্যাকমেইল করত সে। তার আসরে যাতায়াত করতেন দেশের বেশ কয়েকটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার।

অবশেষে গত ১ আগষ্ট, পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন কথিত রাতের রাণী পিয়াসা।

কিন্তু কে এই পিয়াসা? কীভাবে তার উত্থান? তার বেপরোয়া জীবনের রহস্যই বা কি?

পিয়াসা মাহবুব ১৯৮৯ সালের ১০ নভেম্বর, চট্টগ্রাম জেলার আসকার দীঘির পাড় এ সাধারণ এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বেড়ে উঠা নগরীতে হলেও গ্রামের বাড়ি পটিয়া। পিয়াসার বাবা মাহাবুবুল আলম সাবেক ফুটবলার। খেলোয়াড় কোটায় তিনি চট্টগ্রাম বন্দরে চাকরি করতেন। জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে চাকরি থেকে অবসরে যান তিনি। মা নব্যুয়াত আরা সিদ্দিকী রকি গৃহিণী ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেত্রী। তাদের তিন কন্যা সন্তানের মধ্যে পিয়াসা বড়।

পিয়াসা ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন। চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন।

খুব কিশোরী বয়সে শখের বশে গান, রঙ-তুলি হাতে ছবি আঁকা, মডেলিং করে রাতারাতি সুনাম কুড়ান পিয়াসা। ‘মিস চট্টগ্রাম’ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে অনেকের নজরে আসেন তিনি। 

কলেজেই এক সিনিয়রের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক হয় তার। কিন্তু পরিবার মেনে না নেওয়ায় চরম ভাবে ভেঙ্গে পড়েন পিয়াসা। নতুন জীবন শুরু করতে পাঠানো হয় মামার বাড়ি। পাড়ি জমান ঢাকায়। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাকে ভর্তিও করা হয়। কিন্তু রকেট গতিতে ‘উপরে উঠা’র সিঁড়ি খুঁজতে থাকেন পিয়াসা। বিনোদনজগতে ঠাঁই পেতে মরিয়া হয়েও তাতে ব্যর্থ হন।

তবে ছয় মাসের মধ্যে একটি কোম্পানিতে চাকরি পাওয়ার কথা বলে পিয়াসা মামার বাসা ছেড়ে দেন। এক ব্যবসায়ীর দেওয়া ফ্ল্যাটে উঠেন। তার পরিবার বিষয়টি জানলেও ভাল চাকরি পাওয়ার খবরে খুশি হয়। তবে ঢাকায় তার মামারা সব জেনেও চুপ থাকতেন। বরং তারা বিভিন্ন সময় তার কাছ থেকে টাকা পয়সাও নিতেন।

ঐ সময় মিডিয়া পাড়ায় যোগাযোগ করতে করতে সুন্দরী হওয়ায় পেয়ে যান টিভি চ্যানেলের উপস্থাপিকার চাকুরি। রূপালি পর্দায় নিজেকে দেখার স্বপ্ন নিয়ে বেড়ে উঠা পিয়াসা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় অন্ধকার এক জগতে। পরিবারের পক্ষ থেকে প্রথমে কিছুটা বাধা আসলেও অর্থের জোয়ারে তা থেমে যায়। দিনে দিনে বেপরোয়া হয়ে উঠে পিয়াসা। ডিবির হাতে পিয়াসা গ্রেফতারের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা কাহিনী উঠে আসছে।

২০১৭ সালে পিয়াসা নামটি প্রথম আলোচনায় আসে। উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন করায় সে বছরের ৮ মার্চ তাকে তালাক দেন তার সাবেক স্বামী আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ সেলিমের ছেলে সাফাত হোসেন। এ নিয়ে সামাজিক মহলে আলোচিত হন তিনি।

২০১৭ সালের মে মাসে, বনানীর রেইনট্রি হোটেলে দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। ওই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার এজাহারে নাম ছিল ফারিয়া মাহাবুব পিয়াসার। প্রথমে মামলা করতে ভুক্তভোগীদের সহযোগিতা করেছিলেন পিয়াসা। কিন্তু সেই পিয়াসার বিরুদ্ধেই আবার মামলা তুলে নেওয়ার হুমকির অভিযোগে জিডি করেছিলেন ভুক্তভোগী। 

তবে খবরের পাতায় তার নাম আসে ২০১৯ সালে। ২০১৯ সালের ৫ মার্চ, দিলদার আহমেদ সেলিম তার সাবেক পুত্রবধূ ফারিয়া মাহবুব পিয়াসার বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগ করে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার পর ঢাকার মহানগর হাকিম তোফাজ্জল হোসেনের আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চান পিয়াসা। মামলাটি জামিনযোগ্য হওয়ায় তাকে জামিন দেন আদালত।

এদিকে ২০১৯ সালের ১১ মার্চ, দিলদারের বিরুদ্ধেও একটি মামলা করেন পিয়াসা। মামলায় অভিযোগ আনা হয়, দিলদার আহমেদ পিয়াসাকে গর্ভপাতের চেষ্টা, নির্যাতন, হত্যার হুমকি দিয়েছেন। তবে সে বছরের ১৭ জুলাই পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক মো. মজিবুর রহমান আদালতে দেয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, পিয়াসার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।

তিন বছর পর আবারও আলোচনায় সেই পিয়াসা। এবারে তিনি আলোচিত হন সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘটনায়। কয়েক মাস আগে রাজধানীর গুলশানের একটি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয়েছে মোসারাত জাহান (মুনিয়া) নামে এক তরুণীর মরদেহ। ঘুরে ফিরে এখানেও পিয়াসার নাম। এবার ওই তরুণীর বোন নুসরাত জাহান বাদী হয়ে মামলা করেছেন। মামলার এজাহারে উঠে এসেছে পিয়াসার নাম। এর রেশ কাটতে না কাটতেই আবার আলোচনায় সেই পিয়াসা।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, আলিশান জীবনযাপন ছিল মডেল পিয়াসা ও মৌয়ের। নামিদামি ব্র্যান্ডের প্রসাধনী, দেশি-বিদেশি দামি পোশাক, শেলফের তাকে তাকে সাজানো জুতাসহ বাহারি সব পণ্যের সমাহার ছিল তাদের বাসায়। বাসার ভেতরে প্রবেশ করলে চোখ চড়কগাছ হওয়ার উপক্রম। কারণ তাদের দৃশ্যমান আয়ের উৎসের সঙ্গে জীবনযাপনের ব্যয়ের ছিল আকাশ-পাতাল ব্যবধান। গোয়েন্দাদের ভাষায়, পিয়াসার বাসা ছিল অনেকটা ‘রাজরানি’র ঘরের মতো।

মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা ও তার সহযোগী মরিয়ম আক্তার মৌ ছিলেন সংঘবদ্ধ ব্ল্যাকমেইল চক্রের সদস্য। তারা উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের পার্টির নামে বাসায় ডেকে মদ ও ইয়াবা খাইয়ে আপত্তিকর ছবি তুলতেন। পরে ব্ল্যাকমেইল করতেন বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ডিবি।

গত ১ আগষ্ট ২০২১, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খবর পেয়ে বারিধারায় পিয়াসার বাড়িতে অভিযান চালায় ডিবি পুলিশ। এসময় তিনি বাড়িতেই ছিলেন। পরে বাড়ির প্রতিটা রুম তল্লাশি করে মদ, ইয়াবা ও সিসা সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় পিয়াসা এবং তার  সহযোগী মৌ কে আটক করা হয়।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button