জীবনী

হোসে মুজিকাঃ বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র প্রেসিডেন্ট

প্রেসিডেন্ট বলতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে একজন ক্ষমতাবান ও বিত্তবান ব্যক্তিত্বের ছবি। যার চলার পথ থাকবে একদম বাধাহীন এবং রক্ষীবাহিনী দিয়ে আবৃত। যার বাসগৃহ থাকবে বিশাল এবং অসংখ্য পাহারাদার দিয়ে ঘেরা। এক কথায় রাজকীয় ভাবে চলাফেরা করবেন তিনি। এসবের বাহিরে একজন প্রেসিডেন্ট কে যেনো কল্পনা ই করা যায়না। 

কিন্তু আজ সম্পূর্ণ অন্যরকম এক প্রেসিডেন্ট এর জীবন কাহিনি জানাবো। ২০১২ সালে, যিনি সংবাদ শিরোনাম হয়েছিলেন ‘বিশ্বের সবচেয়ে গরিব প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে।

হোসে মুজিকা, উরুগুয়ের চল্লিশতম প্রেসিডেন্ট। দেশবাসী যাকে আদর করে ডাকেন ‘এল পেপে। 

১৯৩৫ সালের ২০ মে, উরুগুয়ের মোন্তেবিদেও তে জন্মগ্রহণ করেন হোসে মুজিকা। তার পুরো নাম হোসে আলবার্তো “পেপে” মুজিকা কর্ডানো। তার বাবার নাম দিমিত্রিও মুজিকা এবং মা লুসি করডানো। দিমিত্রিও মুজিকা পেশায় ছিলেন একজন কৃষক। হোসে মুজিকার বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর, তখন তার বাবা মারা যান। সংসারে নেমে আসে চরম দারিদ্র্য। এই সময় তিনি স্থানীয় এক বেকারির ডেলিভারি বয় হিসেবে কাজ শুরু করেন। আবার কখনো কখনো হোটেল বয় হিসেবেও কাজ করেন। এসবের পাশাপাশি বাড়ির পেছনে বয়ে যাওয়া খাঁড়ি থেকে অ্যারাম লিলি ফুল তুলে বিক্রি করেও সংসারের খরচ যোগান। এভাবেই দারিদ্র্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে তার জীবন। 

তরুণ বয়সে বাম চরমপন্থী নেতা হিসেবে উরুগুয়ের ত্রাস হয়ে ওঠেন তিনি। নতুন কিছু করার তাড়না থেকে মুজিকা ও তার সঙ্গীরা শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করা শুরু করেন। তাদের হাতেই জন্ম নেয় গেরিলা বাহিনী ‘টুপামারো। তারা ব্যাংক লুট করে বিত্তশালীদের অবৈধ অর্থ দরিদ্রদের উন্নয়নে ব্যয় করেন। শুধু তাই নয়, ধনী ব্যবসায়ীদের খুন করে তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা, দামী ক্যাসিনো দখল করে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের টাকা পাঠানো প্রভৃতি কাজ করতে থাকে। ১৯৬৯ সালে যে কারণে টাইমস ম্যাগাজিনে তাদেরকে আখ্যায়িত করা হয়েছিল ‘রবিন হুড গেরিলা’ হিসেবে। ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ১৯৭০-এর দশকের শুরুর সময় পর্যন্ত স্থায়ী ছিল উরুগুয়ের শহরভিত্তিক এই বিদ্রোহ।

এক সময় তাদের দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। জনপ্রিয়তা হারাতে শুরু করে তাদের গড়া সংগঠন ‘টুপামারো’। ১৯৭০ সালের মার্চে, এক পানশালায় পুলিশের সঙ্গে গুলির লড়াইয়ের পর গ্রেপ্তার হন এল পেপে। পরবর্তীতে অমানুষিক অত্যাচার করা হলেও নিজের আদর্শ থেকে বেরিয়ে আসেননি তিনি।

জেল থেকে দু’বার পালিয়ে গিয়েও ১৯৭২ সালে ফের ধরা পড়েন মুজিকা। দীর্ঘ ১৪ বছর বন্দি জীবনের পর ১৯৮৫ সালে এসে মুক্তি পান মুজিকা। জেল থেকে মুক্ত হওয়ার পর খুব দ্রুতই জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠেন মুজিকা।

হোসে মুজিকা ২০০৫-২০০৮ সাল পর্যন্ত পশুসম্পদ, কৃষি ও মৎস্য মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। শুধু তাই নয়, পরে তিনি সিনেটর হিসেবেও দায়িত্বে ছিলেন। বোর্ড ফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে তিনি ২০০৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জেতেন এবং ১ মার্চ ২০১০ সালে কার্যভার গ্রহণ করেন মুজিকা।

মুজিকার তুমুল জনপ্রিয়তার পিছনে রয়েছে তার সোজাসাপটা কথা, আদর্শবাদী ভাবমূর্তি এবং সহজ-সরল জীবন-যাপন। বিলাসবহুল প্রাসাদে থাকার বদলে প্রেসিডেন্ট হয়েও তিনি বেছে নিয়েছেন নিতান্তই এক সাধারণ জীবন। তার বাড়িতে পানি সরবরাহের একমাত্র ব্যবস্থা হচ্ছে ভাঙাচোরা একটি পুরানো কুয়া। বিশ্বের দরিদ্রতম এই প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত আছে মাত্র দুজন পুলিশ আর ম্যানুয়েলা নামের একটি আদুরের কুকুর। তার দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত এই কুকুরটিরও একটি পা খোঁড়া। 

চিত্রঃ হোসে মুজিকার সাথে তার কুকুর ম্যানুয়েলা

এক সময়কার বামপন্থি গেরিলা নেতা মুজিকার নামে কোনো ঋণ নেই, তিনি ই বোধহয় একমাত্র প্রেসিডেন্ট যার নিজের কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে প্রাপ্ত ১২০০০ ডলার বেতনের ৯০ ভাগই তিনি গরিবদের সহায়তা এবং ছোট বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে দেশের সামাজিক সেবামূলক বিভিন্ন কার্যক্রমে দান করেন এবং নিজের জন্য অবশিষ্ট রাখেন মাত্র ৭৭৫ ডলার। এই দানশীলতার কারণেই তাকে বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র প্রেসিডেন্ট হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছে।

যদিও মুজিকা বলেন, ‘আমাকে সবাই দরিদ্রতম প্রেসিডেন্ট বলে। আমার তো মনে হয়, দরিদ্র তারাই যারা সারাটা জীবন কেবল ভোগ্যপণ্য কেনার অর্থ জোগাড় করতে দাসের মতো খেটে যাচ্ছে।’

এক বিপ্লবী সতীর্থ লুসিয়া টোপোল্যানস্কির সঙ্গে দীর্ঘ বিশ বছর প্রেমের পর ২০০৫ সালে এসে বিয়ে করেন তিনি। মুজিকার বাড়িটি রাজধানী মন্টেভিডিওর বাইরের এক পাহাড়ি কৃষি জনপদে। সেখানে তিনি ও তার স্ত্রী মিলে ফুলের চাষ করেন। পরিবার চলে স্ত্রীর আয় থেকে। নিঃসন্তান এই দম্পতির সবচেয়ে দামি সম্পত্তি হলো ১৯৮৭ সালে কেনা এক হাজার ৮০০ ডলারের একটি গাড়ি।

২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত উরুগুয়ের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি আর প্রতিদ্বন্দিতা করেনি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এখন তার অবসরের সময় হয়েছে এবং তাই তিনি রাজনীতি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছেন। এমনকি প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে যাওয়ার পরও তিনি সিনেটর হিসেবে মানুষের জন্য কাজ করে গিয়েছেন। যার জন্য নিজের অবসরভাতা পর্যন্ত বিসর্জন দেন তিনি। আর এ কারণেই আজ ও মানুষ তাকে এত ভালবাসেন এবং শ্রদ্ধা করেন।

পাঁচ বছর উরুগুয়ের সার্বিক উন্নতিতে অবদান রাখার পর তিনি যখন অফিস ত্যাগ করছেন তখন বলা হয়েছিল “পৃথিবীর সব চাইতে বিনীত লোকটি আজ পদত্যাগ করলেন”- এর চাইতে বড় পাওয়া একটা মানুষের জীবনে কি হতে পারে!

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button