জীবনীসাম্প্রতিক

গণসংগীতশিল্পী ফকির আলমগীর এর জীবনী

সম্প্রতি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন কিংবদন্তি গণসংগীতশিল্পী ফকির আলমগীর। সখিনা’র রিকশাওয়ালা খ্যাত এই সংগীতশিল্পী ছিলেন ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা।

ফকির আলমগীর ১৯৫০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানার কালামৃধা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মোঃ হাচেন উদ্দিন ফকির এবং মা বেগম হাবিবুন্নেছা। নিজের গ্রামের স্কুলেই প্রাথমিক শিক্ষা নিয়েছিলেন ফকির আলমগীর। ১৯৬৬ সালে, কালামৃধা গোবিন্দ হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন তিনি। পরবর্তীতে জগন্নাথ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রী নিয়ে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় এমএ ডিগ্রি নেন তিনি। 

১৯৬৬ সালে, ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপের সদস্য হিসেবে যোগ দিয়ে ফকির আলমগীর জড়িয়ে পড়েন বাম ধারার ছাত্র রাজনীতিতে। সেই সূত্রে ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী ও গণশিল্পী গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে ষাটের দশকে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সঙ্গীত বলয়ে প্রবেশ করেন। 

ঠিক তার পরপরই এল ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সেই উত্তাল সময়। গানের শিল্পী ফকির আলমগীর তাতেও কণ্ঠ মেলান।এছাড়াও ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী ও গণশিল্পী গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে অসামান্য ভূমিকা রাখেন তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে, একজন শব্দ সৈনিক হিসেবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেন এই গুনী শিল্পী। যদিও ষাটের দশক থেকেই গণসংগীত গেয়ে আসছিলেন তিনি। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে, ফকির আলমগীর একক প্রচেষ্টায় গড়ে তোলেন লোকপ্রিয় ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী।

ফকির আলমগীরের গণমানুষের শিল্পী হয়ে ওঠার পেছনে বড় ভূমিকা ছিল যে চরিত্র টি, তার নাম ‘সখিনা’। ১৯৮২ সালে, বিটিভিতে ঈদের আনন্দমেলায় ‘ও সখিনা গেছস কিনা ভুইলা আমারে’ গানটি প্রচারের পর দর্শকদের মাঝে সাড়া পড়ে যায়। তখন থেকেই মানুষের মুখে মুখে ফিরে এই গান টি। আলতাফ আলী হাসুর লিখা এই গানটি তে কণ্ঠ দেয়ার পাশাপাশি ফকির আলমগীর গানটির সুরও করেছিলেন।

গানে গানে আজীবন অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন ফকির আলমগীর। তিনি গাইতেন মানুষের জন্য, দেশের জন্য। মানবতার কথা, বঞ্চিত মানুষের অধিকারের কথা নিয়েই গানে গানে হাজির হতেন এ গণসংগীতশিল্পী। সুরে সুরে ফকির আলমগীর ছিলেন এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। তার এই বিশেষত্বই দেশের মানুষের হৃদয়ে স্থান করে দিয়েছে।

১৯৮৯ সালে, পৃথিবীর বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের পুরোধা নেলসন ম্যান্ডেলা কে নিয়ে ‘কালো কালো মানুষের দেশে’ শিরোনামে অসাধারণ একটি গান গেয়ে বেশ জনপ্রিয়তা পান ফকির আলমগীর। বাংলাদেশ সফরে আসার পর স্বয়ং নেলসন ম্যান্ডেলাও গানটি শুনে মুগ্ধ হন।

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তার কণ্ঠের বেশ কয়েকটি গান দারুণ জনপ্রিয়তা পায়। এর মধ্যে ‘ও সখিনা’; ‘মায়ের একধার দুধের দাম’; ‘কালো কালো মানুষের দেশে’; ‘নাম তার ছিল জন হেনরী’ গানগুলো মানুষের মুখে মুখে ফেরে এখনও। 

স্বাধীনতার পর ফকির আলমগীর পপ ঘরানার গানে যুক্ত হন। পাশ্চাত্য সংগীতের সঙ্গে বাংলার লোকজ সুরের সমন্বয় ঘটিয়ে তিনি বহু গান করেছেন।

সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯৯ সালে একুশে পদক পান ফকির আলমগীর। এছাড়াও ‘শেরেবাংলা পদক’, ‘ভাসানী পদক’, ‘সিকোয়েন্স অ্যাওয়ার্ড অব অনার’, ‘তর্কবাগীশ স্বর্ণপদক’, ‘জসীমউদ্‌দীন স্বর্ণপদক’, ‘কান্তকবি পদক’, ‘গণনাট্য পুরস্কার’, ‘পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক মহাসম্মাননা’, ‘ত্রিপুরা সংস্কৃতি সমন্বয় পুরস্কার’, ‘ঢালিউড অ্যাওয়ার্ড যুক্তরাষ্ট্র’, ‘জনসংযোগ সমিতি বিশেষ সম্মাননা’, ‘চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড বিশেষ সম্মাননা’ ও ‘বাংলা একাডেমি সম্মানসূচক ফেলোশিপ’ সহ অসংখ্য পুরস্কারে তাকে ভূষিত করা হয়।

সংগীতশিল্পীর পাশাপাশি ফকির আলমগীর একজন লেখক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। ১৯৮৪ সালে, তার প্রথম বই ‘চেনা চায়না’ প্রকাশিত হয়। তার পরবর্তী দু’টি বইয়ের নাম ছিল ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজয়ের গান’ এবং ‘গণ সংগীতের অতীত ও বর্তমান’। ২০১৩ সালে তিনি ‘অমর কথা’, ‘যারা আছে হৃদয় পটে’ এবং ‘স্মৃতি আলাপনে মুক্তিযুদ্ধ’ নামে আরো ৩টি বই প্রকাশ করেন। তিনি মোট নয়টি বই রচনা করেছেন।

গত ২৩ জুলাই ২০২১ শুক্রবার, রাত ১০টা ৫৬ মিনিটে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগলকরেন এই গুনী শিল্পী।

উল্লেখ্য গত ১৪ জুলাই ফকির আলমগীরের করোনাভাইরাস রিপোর্ট ‘পজিটিভ’ আসার পর পরই ১৫ জুলাই রাতে তাকে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালের কভিড ইউনিটে ভর্তি করা হয়। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ১৮ জুলাই তাকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়। পরে হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন ফকির আলমগীর লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। টানা ৮ দিন করোনাভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধ করে অবশেষে হেরে যান তিনি।

কিন্তু আসলেই কি হেরে গেছেন?

না, ঝাকড়া চুলের এই গুনী মানুষ টি কে বাংলাদেশের মানুষ মনে রেখে দিবে আরো শত সহস্র বছর ধরে।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button