জীবনী

হযরত হূদ আ. এর জীবনী

অবাধ্যতার কারণে আল্লাহর গযবে ধ্বংসপ্রাপ্ত বিশ্বের প্রধান ছয়টি জাতির মধ্যে কওমে নূহ-এর পরেই কওমে ‘আদের’ অবস্থান। সেই দুর্ধর্ষ ও শক্তিশালী ‘ আদ জাতির নিকটই প্রেরিত হয়েছিলেন হযরত হূদ আ.। মানব ইতিহাসের নিকৃষ্টতম জাতিগুলোর কথা বলতে গেলে  আদ জাতির কথা উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয়। তাদেরকে মূর্তিপূজা ছেড়ে একত্ববাদের অনুসরণ করতে এবং সর্বপ্রকার অত্যাচার উৎপীড়ন বর্জন করে ন্যায় ও সুবিচারের পথ ধরতে আদেশ করেন হজরত হুদ আ:। কিন্তু তারা নিজেদের ধনৈশ্বর্যের মোহে মত্ত হয়ে তাঁর ডাকে সাঁড়া দেয়নি। ফলশ্রুতিতে ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হয়েছিল এই অবাধ্য জাতি।


হযরত নূহ আ. এরই বংশধর ছিলেন হযরত হূদ আ.।যার আগমণ ঘটেছিল আদ জাতির নিকট। পারস্য উপসাগরের অববাহিকায় অবস্থিত ওমান থেকে লোহিত সাগরের প্রান্তে হাজরামাউত ও ইয়েমেন পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় কয়েকশত বছর আদ জাতির আধিপত্য ছিল। ‘আদ সম্প্রদায়ের ১৩টি পরিবার বা গোত্র ছিল। তারা নানা রকম দেব দেবীর পূজা করত। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সাকিয়া, হাফিজা, রাদিকা ইত্যাদি। এ দেবতাদের একেকজনের কাছে আদ জাতি একেক জিনিস চাইতো। তারা ছিল সুঠামদেহী ও বিরাট বপু সম্পন্ন। তারা পৃথিবীতে অযথা অহঙ্কার করেছে এবং বলেছে, আমাদের চেয়ে শক্তিধর কে আছে? আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজিদে বলেছেন, এমন দীর্ঘকায় ও শক্তিশালী জাতি ইতোপূর্বে পৃথিবীতে সৃজিত হয়নি। নানা প্রকার কৃষিকাজও করত আদ জাতি। এক আল্লাহর ইবাদতের পরিবর্তে তারা তাদের পূর্ব পুরুষ কাফির মুশরিকদের অনুসরণ করত। যারা হযরত নূহ আ. এর আমলেও এক আল্লাহর একত্ববাদ স্বীকার না করে দেব দেবীর পূজা করত। মাত্র কয়েক পুরুষ আগে ঘটে যাওয়া নূহের সর্বগ্রাসী প্লাবনের কথা তারা পুরোপুরি ভুলে গেল। 


এমতাবস্থায় মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন এই জাতির নিকট তাদের হেদায়াতের জন্য হযরত হূদ আ. কে প্রেরণ করলেন। আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনে ঘোষণা দিয়ে জানিয়ে দেন যে হূদ আ. আদ বংশীয় লোক। তিনি স্বীয় কওমকে এক আল্লাহর দিকে ডাকা শুরু করলেন। এক আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত দিতে লাগলেন। কিন্তু আদ জাতির লোকেরা হূদ আ. এর কথা শুনে ঠাট্টা বিদ্রুপ শুরু করে। তাদের নেতারা বলতে শুরু করে তুমি যে আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের হেদায়েতের দাওয়াত দিতে এসেছ এবং তুমি যে আল্লাহর নবী তার প্রমান দাও। আমরা মনে করি তুমি নির্বোধ এবং বোকা। আর তুমি অবশ্যই একজন মিথ্যাবাদী। আল্লাহ চাইলে অবশ্যই আমাদের নিকট ফেরেশতা পাঠাতেন।
হূদ আ. তাদের এ কথার জবাবে বললেন হে আমার সম্প্রদায়! আমার মধ্যে কোন নির্বুদ্ধিতা নেই। বরং আমি বিশ্বপালকের প্রেরিত একজন রাসূল মাত্র। আমি তোমাদের নিকট আমার রবের পয়গাম পৌঁছে দিতে এসেছি। তোমরা ও তোমাদের দেবতারা সবাই মিলে আমার অনিষ্ট সাধনের চেষ্টা কর। তাতে আমার কিছুই হবে না আল্লাহর হুকুম ছাড়া। তিনিই আমার পালনকর্তা। তাঁর উপরেই আমি ভরসা রাখি। যারা সরল পথে চলে, আল্লাহ তাদের সাহায্য করেন। এছাড়া হযরত হূদ আ. তাদেরকে নূহ আ. এর আমলের প্লাবনের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। তিনি বললেন তোমাদের পূর্বে তোমাদের পূর্ব পুরুষদেরও অবাধ্যতার কারণে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। তোমরা আমার ডাকে সাড়া দিয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে এসো। হূদ আ. তাদের মূর্তিপূজা ছেড়ে একত্ববাদের অনুসরণ করতে এবং সর্বপ্রকার অত্যাচার উৎপীড়ন বর্জন করে ন্যায় ও সুবিচারের পথ ধরতে আদেশ করেন। জনগণকে নিজেদের কুফরী, শেরেকী ও অন্যান্য কবীরা গোনাহ সমূহ হ’তে তওবা করার ও আল্লাহর নিকটে একান্তভাবে ক্ষমা প্রার্থনার আহবান জানান।
তারপর কাফের সম্প্রদায়ের লোকজন বলল তুমি কি আমাদের কাছে এমন কোন দাওয়াত নিয়ে এসেছ যার দ্বারা আমাদেরকে আমাদের পুর্ব পুরুষদের দেখানো পথ থেকে বিরত থাকতে বলবা? তাহলে তুমি সেই আযাব নিয়ে আসো যে আযাবের ভয় তুমি আমাদের দেখাচ্ছ। তোমার ঘোষিত আযাব কিংবা তোমার কোন মু‘জেযা না দেখে কেবল তোমার মুখের কথায় আমরা আমাদের বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসা উপাস্য দেব-দেবীদের বর্জন করতে পারি না। বরং আমাদের মনে হচ্ছে তুমি আমাদের দেব দেবীর পূজা না করায় তোমায় ভুতে ধরেছে। তারা হূদ আ. এর কোন কথা তো শুনতোই না। বরং তার প্রতি মিথ্যাচার এবং অপবাদের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে লাগল। নানা বিষয় নিয়ে হুদ আ. এর সাথে অযথা তর্কে লিপ্ত হয়ে যেত। 
পরবর্তীতে তিনি তাদের জানিয়ে দিলেন যে আমাকে যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আমি তা পালন করলাম। আমি তোমদের সব জানিয়ে দিলাম। তোমরা আমার নিকট যে আযাব প্রত্যাশা করেছ সেই  লানত বা গজব তোমাদের উপর অবধারিত হয়ে গেছে। হযরত হূদ আ. এর সাথে বেয়াদবির ফলস্বরূপ আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন এ জাতির উপর ঘোরতর আযাব দিলেন। তাদের পূর্বপুরুষদের প্লাবন দিয়ে ধ্বংস করলেও আল্লাহ পাক এ জাতিকে ভিন্ন রকমের গজব দিয়ে ধ্বংসের অতল গহবরে নিমজ্জিত করলেন।
আদ জাতির অবাধ্যতা এবং বেয়াদবির শাস্তিস্বরূপ ঐ অঞ্চলে টানা তিনবছর বৃষ্টিপাত বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাদের শস্যক্ষেত, ফসলের মাঠ ফেটে চৌচির হয়ে যেতে শুরু করল। চারদিক বালুকাময় মরুভূমিতে পরিণত হতে শুরু হলো। চারদিকে পানির চরম সংকট দেখা দিল। কিন্তু তারপরও তারা নিজেদের সংশোধন করল না। মূর্তিপূজা চালিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু অবশেষে আর সহ্য করতে না পেরে বাধ্য হয়ে আল্লাহর কাছে বৃষ্টি প্রার্থনা করল।তাদের এই প্রার্থনার পর আসমানে সাদা, কালো ও লাল মেঘ দেখা দেয় এবং গায়েবী আওয়ায আসে যে, তোমরা এখান থেকে কোনটি পছন্দ করো? 

তারা কালো মেঘ কামনা করলো। তাদের চাওয়া অনুযায়ী কালো মেঘ আসল। কিন্তু তারা এই কালো মেঘের রহস্য বুঝতে পারল না। তখন হূদ আ. তাদের বলে দিলেন এটা সেই বস্তু যা তোমরা আমার কাছে প্রত্যাশা করেছিলে। মহান আল্লাহর আদেশে এটা তোমাদের ধ্বংস করে দিবে। পরদিন ভোরে নেমে আসে চূড়ান্ত গযব। আট দিন ও সাত রাত্রি অনবরত ঝড়-তুফান বইতে থাকে। ঘর -বাড়ি সব ধ্বসে যায়, প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে গাছপালা সব উপড়ে যায়। বাতাসের এত তীব্রতা ছিল যে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণি জমিন থেকে শূন্যে উত্থিত হয়ে আবার সজোরে জমিনে পতিত হয়। ধ্বংসাত্মক এই গযবের মাধ্যমে শক্তিশালী ও সুঠাম দেহের অধিকারী আদ জাতিকে স্ব মূলে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়।


গযব আসার পূর্বেই আল্লাহ পাক তাঁর পয়গম্বর হূদ আ. কে বলে দিলেন তিনি এবং তাঁর ঈমানদার অনুসারীগণ যাতে এই অঞ্চল ছেড়ে নিরাপদ স্থানে অবস্থান নেন এবং আযাব থেকে রক্ষা পান। তিনি তাই করেছিলেন। ঝড়ের পরবর্তী বছরগুলোতে তারা ধীরে ধীরে নতুন করে তাদের সমাজ গঠন করতে লাগলো এবং আবারো সেই সমাজে শুধুমাত্র এক আল্লাহর উপর বিশ্বাস করা লোকেরাই রয়ে গেল।  হুদ (আঃ) এর মৃত্যু পর্যন্ত আর সেই সমাজে কখনো শিরিক প্রবেশ করেনি । পরবর্তীতে তিনি আরবের হাযরামাউতের উদ্দেশে হিজরত করে চলে আসেন। ওখানেই তাঁর ইন্তেকাল হয় এবং বারহুত উপত্যকার কাছে হাযরামাউতের পূর্বাংশে তারিম শহরে তাঁকে দাফন করা হয়। কেউ কেউ বলেন হজরত হুদ আ.এর কবর হাযরামাউতের ‘কাসিবে আহমার’ অর্থাৎ লাল টিলার চূড়ায় অবস্থিত । ফিলিস্তিনবাসীরা দাবি করেন হযরত হূদ আ. ফিলিস্তিনে সমাহিত হয়েছেন। 

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button