ইতিহাস

রথচাইল্ডঃ যে ইহুদি পরিবারটির হাতে বন্দি গোটা বিশ্ব!

জুন ১৯,১৮১৫

ওয়াটার লু’র যুদ্ধে নেপোলিয়ান বোনাপার্টের পরাজয়ের ২৪ ঘন্টাও পার হয়নি। লন্ডনের মুদ্রা বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নাথান রথচাইল্ডের কাছে একটি কুরিয়ার এসে পৌঁছায়। সেখানে বলা আছে-বেলজিয়ামের ওয়াটার লু প্রান্তরে ডিউক অব ওয়েলিংটন ও প্রুশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে নেপোলিয়ানের গ্র্যান্ড আর্মির পরাজয় হয়েছে। নাথান রথচাইল্ডের মাথায় চকিতে একটা বুদ্ধি খেলে গেলো। যুদ্ধ শুরুর আগে যুদ্ধের খরচ মেটানোর জন্য ব্রিটিশ সরকার বিপুল পরিমাণ বন্ড ছেড়েছিল। এদিকে পুরো ইউরোপে থাকা ব্রিটিশ ও তাদের মিত্রদের খরচ মেটানোর জন্য স্বর্ণ সরবরাহের কাজটা ছিল রথচাইল্ডদের। অতীতের মত দীর্ঘ যুদ্ধের আশংকায় রথচাইল্ডরা প্রচুর স্বর্ণ কিনে নিজেদের কাছে মজুদ করে রেখেছিলেন। কিন্ত ওয়াটার লু’র যুদ্ধ এত দ্রুত শেষ হয়ে যাবে,তা ছিল তার অনুমানের বাইরে। যুদ্ধের এই আকস্মিক সমাপ্তি তাদের সামনে বিরাট ক্ষতি হয়ে দেখা দিতে পারে। নাথান রথচাইল্ড ইংল্যান্ডের এই জয়ের খবর ব্রিটিশ রাজার কাছে পৌঁছে দেন। কিন্তু তারপরই নাথান রথচাইল্ড ফাইন্যান্সিয়াল জগতের ইতিহাসের সবচেয়ে সাহসী সিদ্ধান্তগুলোর একটি নেন। আর তা হল,লন্ডনের বন্ড মার্কেটে পা রাখা। তিনি হিসেব করে বের করেন, পরের ২ বছরের মধ্যে লন্ডনের বন্ডের  দাম ব্যাপক বৃদ্ধি পাবে। তিনি বন্ড কিনলেন। আর সত্যি সত্যি ১ বছরের মধ্যে বন্ডের দাম ৪০% বৃদ্ধি পেল। আর এভাবেই উত্থান ঘটলো রথচাইল্ড পরিবারের।কিন্তু উপরের গল্পটা রথচাইল্ডের অফিশিয়াল ভাষ্য। সত্যিই কি এমনটাই হয়েছিল? না এর পেছনে আরো গল্প আছে। চলুন তার আগে রথচাইল্ড পরিবার সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক।

রথচাইল্ড পরিবারের প্রতীক

৭০ খ্রিষ্টাব্দে রোমানদের হাতে জেরুজালেম থেকে বিতাড়িত হয়ে,ইহুদিরা পুরো ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। তবে সেখানেও তারা ছিল অচ্ছুৎ। তারা শহরে থাকা অনুমতি পেত না। শহরের বাইরে বিশেষ এলাকা ‘ঘেঁটো’তে থাকতে হত তাদের। ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইহুদি বাস করতো হলি রোমান সাম্রাজ্য। যার মধ্যে ছিল আজকের জার্মানি। সেই জার্মানির ফ্র্যাংকফুর্টের ইহুদি ঘেঁটোতে বাস করতেন এখলানান রথচাইল্ড। সেসময় ইহুদি বাড়িগুলো নির্দিষ্ট প্রতিক দিয়ে আলাদা করা হত। তো এখলানান রথচাইল্ডের বাড়িটির প্রতিক ছিল লাল রঙের ঢাল। ‘রথ’,’শিল্ড’ বা লাল ঢালের জার্মান নাম রথচাইল্ড থেকেই পারিবারিক উপাধি নেন তিনি। রথচাইল্ডদের পারিবারিক ব্যবসা ছিল মুদ্রা বিনিময় করা ১৭৪৪ মেয়ার আমসখেল রথচাইল্ড হাত ধরেই রথচাইল্ডদের উত্থান শুরু। তিনি মুদ্রার ব্যবসাকে একটা নিয়মের মধ্যে আনেন এবং ইউরোপ জুড়ে একটি নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করে ফেলেন। ফলে মুদ্রা দাম হ্রাস বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি আগাম খবর পেয়ে যেতেন। মেয়ার আমসখেল রথচাইল্ডের দ্রুত উত্থান তাকে জার্মানির হেসে’র রাজদরবারে স্থান করে দেয়।

মেয়ার আমসখেল রথচাইল্ড

তবে বুদ্ধিমান মেয়ার আমসখেল রথচাইল্ড বুঝতে পেরেছিলেন। ইতিহাসে সম্পদ অর্জন করে টিকিয়ে রাখতে পারেনি। বিশেষত ইহুদিদের থেকে নানা সময়ে জোর করে তাদের সম্পদ কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা হাতে নিলেন। মেয়ার আমসখেল তার ইউরোপিয়ান নেটওয়ার্কে তার ৫ পুত্রকে বসিয়ে দিলেন। তার বড় ছেলে আমসখেল বাবার সাথে জার্মানিতে থেকে গেলেন। জেমস রথচাইল্ড প্যারিসে, সলোমন ভিয়েনায়, কার্ল ইতালির ন্যাপলসে আর নাথান গেলেন লন্ডনে। এভাবে ১৭৯০ সাল নাগাদ ইউরোপে রথচাইল্ডদের নেটওয়ার্ক শক্তিশালি রুপ লাভ করে।

ইংল্যাণ্ডের মাটিতে রথচাইল্ডদের একটি ম্যানশন

তবে ১৭৯০ সালে ফরাসি বিপ্লবের ১ বছর পর থেকে ইউরোপের পরিস্থিতি অবনতির দিকে যেতে থাকে। এরই মাঝে ক্ষমতায় আসেন নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। আর দ্রুত ইউরোপ যুদ্ধের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। মস্কো থেকে শুরু করে আমস্টারডম,নেপোলিয়নের গ্র্যান্ড আর্মিকে বাঁধা দেয়ার মত কোন শক্তি ইউরোপে ছিল না। আর প্রতিটি যুদ্ধতেই রথচাইল্ডদের সম্পৃক্ততা ছিল। রথচাইল্ডদের প্রধান কাজই ছিল যুদ্ধে অর্থ সহায়তা দেয়া। যুদ্ধ বিধ্বস্ত ইউরোপের নানা প্রান্তে থাকা রথচাইল্ডদের লোকেরা দুই পক্ষকেই আর্থিক সহায়তা দিত।

রথচাইল্ডরা মূলত মুদ্রা বিনিময়ের ব্যবসা করতো। তাদের পারিবারিক উৎপত্তি সুপ্রাচীন ব্যবিলনের সময় থেকে। তারা যুদ্ধের আগে যতটা সম্ভব স্বর্ণ ও স্বর্ণমুদ্রা কিনে মজুদ করতো। তারপর যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে,বেড়ে যাওয়া স্বর্ণের চাহিদা বুঝে তারা ব্যবসা করতো। ওয়াটার লু’র যুদ্ধের আগেও তারা একই কাজ করেছিল। তবে গল্পের অফিসিয়াল ভাষ্যের বাইরেও বেশ কিছু গল্প আছে। ওয়াটার লু’র যুদ্ধের আগে, ডিউক অব ওয়েলিংটনের সেনাদের বেতন দেয়া ও যুদ্ধের খরচ মেটানোর জন্য ব্রিটিশ সরকারের ছাড়া বন্ড থেকে প্রচুর টাকা আসে। কিন্তু বন্ড দিয়ে তো আর খরচ মেটানো যাবে না। তাদের দরকার ছিল এমন কোন বিনিময় মাধ্যমে যা সবপক্ষই গ্রহণ করবে। তখন ব্রিটিশ সরকার নাথান রথচাইল্ডকে দায়িত্ব দেয় ওয়েলিংটনের বাহিনীর কাছে স্বর্ণ মুদ্রা পৌঁছে দেয়ার। এই কাজে ব্যবহৃত হয় রথচাইল্ডদের নেটওয়ার্ক। যুদ্ধের আগে সবাই ভেবেছিল নেপোলিয়নের অপারেজয় সেনাদের সামনে ব্রিটিশরা দাঁড়াতেই পারবে না। প্যারিসের বন্ড মার্কেটের ফরাসি বন্ডের দাম আকাশ ছুঁয়ে যায়। কিন্তু সেখানে থাকা জেমস রথচাইল্ড সেই সব শেয়ার বিক্রি করে দেয়।

তেল আভিবের রথচাইল্ড বুলেভার্দ।ইজরায়েলের প্রথম ব্যাংক,প্রশাসনিক ভবন এখানেই ছিল

এদিকে ১৯ তারিখ ব্রিটিশ সরকার তখনও খবর পায়নি, যুদ্ধে ব্রিটিশদের জয়ের। নাথান তার সমস্ত বন্ড বিক্রি করে দিলেন। আর দ্রুত গুজব ছড়িয়ে গেল যুদ্ধে ইংল্যান্ড হেরে গেছে। মুহুর্তেই ব্রিটিশ বন্ডের দাম প্রায় শূন্য হয়ে গেল। তারপর সবাইকে অবাক করে দিয়ে সব বন্ড কিনে নিলেন নাথান রথচাইল্ড ২১ তারিখ যখন ব্রিটিশ সরকার ওয়াটার লু যুদ্ধে জয়ের খবর প্রকাশ করলো। ততক্ষণে ব্রিটিশ অর্থনীতির প্রায় পুরোটা রথচাইল্ডদের পকেটে চলে গিয়েছে। তবে সেখানেই থেমে থাকেনি তারা। এককালের মুদ্রা বিনিময়কারী,মুদ্রা সরবরাহকারী বনে যায়। ইউরোপ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ল্যাটিন আমেরিকায় রথচাইল্ড ব্যাংকিং কার্টেল গড়ে উঠে। ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাবস্থায় তাদের হাত প্রসারিত হতে থাকে।

১৮২৪ সালে পর্তুগাল থেকে ব্রাজিলের স্বাধীনতার পেছনে সরাসরি জড়িত ছিল রথচাইল্ডরা। আফ্রিকায় সিসিল রোহডস তাদের সহায়তায় প্রতিষ্ঠা করে রোডেশিয়া(বর্তমান জিম্বাবুয়ে)। তবে এগুলোর পেছনে ছিল নিখাদ ব্যাবসায়িক স্বার্থ। ব্রাজিলের হীরার খনি কিংবা আলজেরিয়ার তেলের খনি। জিম্বাবুয়ের সোনার খনি। এগুলোর দখল রথচাইল্ড সাম্রাজ্যকে শক্তিশালী করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিভিল ওয়ারের দুই পক্ষকেই অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সহায়তা করেছে রথচাইল্ডরা। ফলে বিজয়ের মুকুট তাদের ঘরেই এসেছে।এভাবে রথচাইল্ডরা বিশ্বের মানচিত্র বদলে দিতে ভুমিকা রেখেছে।

তবে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এসে রহস্যজনকভাবে নিরব হয়ে গেছে রথচাইল্ডরা। তাদের অনেক ব্যবসায়ী প্রায় ৩০০ বছরের পুরানো পরিবারটির বিভিন্ন উত্তরাধিকারদের মধ্যে ভাগ করে দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের ভেতর ইজরায়েল প্রতিষ্ঠার পেছনে হাত দেয় এই ইহুদি পরিবারটি। বলা হয়ে থাকে, রথচাইল্ডদের অর্থ না পেলে কখনই ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হত না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদি হবার কারণে তাদের অনেকেই ইউরোপ ছেড়ে পালিয়ে আসে। তাদের বহু ম্যানশন আর সম্পদ নাৎসিরা লুট করে নিয়ে যায়। তবে আবার তাদের  বিরুদ্ধেই নাৎসিদের সাথে আঁতাতের অভিযোগ পাওয়া যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ধীরে ধীরে নিজেদের লোকচক্ষু আড়ালে নিয়ে যেতে থাকে তারা। তবে বিশ্বজুড়ে এখনও নানা জায়গায় তাদের সম্পদ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।বলা হয়,এখনও বিশ্ব ব্যাংকিং ব্যবস্থা তাদের নিয়ন্ত্রণে। তাদের রহস্যময়তা ও গোপনীয়তা জন্ম দিয়েছে নানা ষড়যন্ত্র তত্বের। হয়ত এদের বেশিরভাগই সত্য,হয়ত না।  

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button