আন্তর্জাতিকইতিহাস

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মহানায়ক বুচাহেরিকে দেয়া তার বাবার জীবন বদলানো শিক্ষা

আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগের ঘটনা। আমেরিকার মাটিতে তখনকার সময়ে ‘ এডওয়ার্ড ও হারে  নামক জগৎ বিখ্যাত এক আইনজীবী ছিলো। 

এ মানুষটি ওকালতি পেশায় এতটাই সিদ্ধহস্ত ছিল যে তিনি যদি কোন কেস নিয়ে নিতেন তাহলে ধরেই নেয়া হত তিনি সে কেস জিতে যাবেন।

তার উপস্থিত বুদ্ধি ছিল অসাধারণ। সারা বিশ্বে তিনি তখন একজন  অপ্রতিরোধ্য আইনজীবী হয়ে উঠেছিলেন।

সে সময়কার বড় বড় মাফিয়ারা তাই তাকে লাখ লাখ টাকা দিয়ে ভাড়া করা শুরু করে।অপরাধ যত বড়ই হোক না কেন তার কারণে কোন না কোন ভাবে অপরাধীরা বেঁচে যেত। 

অপরাধীদের অপরাধ করা তিনি এতটাই সহজ করে দিয়েছিলেন যে তার নাম রেখে দিয়েছিল ইজি এডি ” যে নামেই পৃথিবীবাসী বর্তমানকালে এডওয়ার্ড ও হারে কে চিনে। 

তৎকালীন সময়ের আমেরিকার আন্ডারগ্রাউন্ডের শ্রেষ্ঠ মাফিয়া গডফাদার ছিল আল কুপন।এই আল-কুপনের কেসও লড়ত “ইজি এডি”।যার কারণেই নানা অপরাধ করেও ফাকফোকর গলে বের হয়ে যেতেন আল-কুপন।

 

সারা দুনিয়ায় আইনজীবীদের সম্রাট হিসেবে বিবেচিত ইজি এডি নিজ জীবনও সম্রাটদের মতই বিলাসবহুল ভাবে অতিবাহিত করছিলেন। 

কিন্তু একদিন হঠাৎ করে সব কিছু বদলে গেল। এজি এডির একজন শিশু সন্তান ছিল।যার নাম বুচ ও হারে। 

কোন একদিন ঘটনাক্রমে ইজি এডি ভাবতে লাগলেন তার ছেলে যে সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে তাতো শুধু রাজপুত্ররাই পেতে পারে।

কিন্তু আমি তো এমন কিছুই করিনি যার কারনে তার বাবাকে নিয়ে সে গর্ব করবে।উলটো বড় হয়ে যখন সে বুঝবে আমি ক্রিমিনালদের সহোযোগিতা করেছি তখন সে আমাকে ঘৃণা করা শুরু করবে । 

অনেক ভেবেচিন্তে অবশেষে ইজি এডি এক লাইফচেঞ্জিং ডিসিশন নেয়৷সে সিদ্ধান্ত নেয় এতদিন যত মাফিয়াদের হয়ে কাজ করত তাদের সবাইকে সে ধরিয়ে দিবে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে এবার আমেরিকার সর্বোচ্চ সরকারী আইনজীবী এটর্নি জেনারেলের সাথে গোপনে যোগাযোগ করেন তিনি।

তাদের সাথে কথা বলার পর এবার ইজি এডি আল-কুপন ও তার সহচরদের ধরিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে রাষ্ট্রের পক্ষে আন্ডারকভার এজেন্টের মত কাজ করা শুরু করে।

নিজের অসাধারণ চৌকসত্বকে  কাজে লাগিয়ে একের পর এক তথ্য পাচার করে বড় বড় মাফিয়াদের ধরিয়ে দিতে লাগল।

এ ঘটনার কারণে স্মাগলিং,ড্রাগ ডিলিং,উমেন ট্রাফিকিং এর মত কাজগুলো থমকে যেতে শুরু করল সেখানে।

কিন্তু মাফিয়াদের গডফাদার আল-কুপন থেমে থাকে নি,তার নির্দেশে কয়েক মাস পর আততায়ীদের গুলিতে প্রাণ হারায় ইজি এডি। 

তার ছেলে বুচ ও হারে সত্যিই সেদিন তার বাবাকে নিয়ে গর্ব বোধ করেছিল। কিন্তু বাবাকে ছেলের চোখে সে সম্মান কিনতে হয়েছিল নিজের প্রাণ দিয়ে। 

এ ঘটনার কয়েক দশক পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ইজি এডির ছেলে বুচ ও হারে তখন ইউএস আর্মির একজন বোম্বিং ফাইটার বিমানের পাইলট। 

যুদ্ধের এক পর্যায়ে বুচ ও হারে শত্রুপক্ষকে ধাওয়া করার উদ্দ্যেশ্যে বিমান নিয়ে বের হয়েছিলেন। মাঝ রাস্তাতে যাওয়ার পর টের পেয়েছিলেন তার বিমানে বেশি ফুয়েল নেই।

তিনি ফুয়েল নেয়ার জন্য ফেরার সময় দেখেন ইউএস আর্মির একটি লেক্সিনটন এয়ারক্র‍্যাফটকে ধাওয়া করছে নয়টি জাপানিজ বোম্বার বিমান। 

তখন এয়ারক্র‍্যাফটে থাকা বহু সৈন্যের জীবন বাচানোর জন্য বুচ একাই নয়টি বোম্বার বিমানের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন।

বুচ এতটাই উন্মাদের মত তার ফাইটার জেট দিয়ে বোম্বিং শুরু করেন যে পাঁচটি বিমানই সাগরে পতিত হয়।

তার এমন অতিমানবীয় ফাইটিং স্কিল দেখে ভয়ে বাকি চার জাপানিজ  বোম্বার প্লেন পালিয়ে যায়। পুরো ঘটনাটির প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে যান ইউএস লেক্সিন্টন এয়ারক্র‍্যাফটে থাকা সৈন্যরা। 

সেদিন অসাধারণ নৈপুণ্যে বুচ ও হারে যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন তা অনেক পাইলট তার সারা ক্যারিয়ারেও করতে পারে না। 

এ ঘটনা তখনকার সময়ে তুমুল সাড়া ফেলে। একইসাথে অসাধারণ সাহসিকতা ও নৈপুণ্যের জন্য বুচ ও হারে প্রথম ব্যাক্তি হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সর্বোচ্চ পদক মেডেল অফ ওনার সম্মনায়ায় ভূষিত হন।

আমেরিকার শিকাগোয় অবস্থিত বুচাহেরী বিমানবন্দর টির নামকরণও তার নামেই করা হয়েছিল। 

“মেডেল অফ ওনার” প্রাপ্ত ব্যাক্তি সম্পর্কে সাংবাদিকরা যখন অনুসন্ধান শুরু করে তখন তারা বুঝতে পারে,ইনি হলেন সেই ব্যাক্তির ছেলে যার বাবা তৎকালীন সন্ত্রাসীদের গডফাদার আল-কুপনকে ধরাশায়ী করে দিয়েছিল। 

বাবার সেদিনের নির্ভয়ে নিজের প্রাণ অন্যের জন্য বিলিয়ে দেয়ার শিক্ষা ছেলেও আজীবন লালন করে গিয়েছিল।

ইজি এডি ও বুচ ও হারের  এ ঘটনা প্রমাণ করে দেয় পিতামাতা সন্তানকে সঠিকভাবে লালন-পালম করলে এমনও সন্তান গড়ে তোলা সম্ভব যে কিনা নিজ জীবনের কথা না ভেবে অন্যের জীবনের কথা ভাববে। 

মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ খাঁন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

Show More

MK Muhib

A researcher,An analyst,A writer,A social media activist,student at University of dhaka.

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also
Close
Back to top button