জীবনী

মাহমুদ দারবিশঃ একজন অপরাজেয় শব্দযোদ্ধা

“লিখে রাখো!’

আমি একজন আরব

এবং আমার পরিচয়পত্রের নম্বর পঞ্চাশ হাজার

আমার আটটি সন্তান

আর নবমটি পৃথিবীতে আসবে গ্রীষ্মকালের পর

তোমরা কি ক্ষুব্ধ হবে তাতে?”

একটি সংগ্রামী কবিতার গুটিকয়েক লাইন পড়ার পর ই যদি পাঠকসমাজ পুলকিত হয়ে উঠে, চেতনা জাগ্রত হয়। সেখানেই তো একজন কবির সার্থকতা।

বলছিলাম ফিলিস্তিনের জাতীয় কবি মাহমুদ দারবিশ এর কথা। ফিলিস্তিনের জাতীয় কবি হলেও তিনি তাবত বিশ্বের আগ্রাসনবিরোধী মানুষের প্রাণের কবি। বিশ্বের প্রায় পঞ্চাশটি ভাষায় তার লেখা গ্রন্থ অনুবাদ হয়েছে এবং সব ভাষায় অনুবাদকৃত বই ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। 

মাহমুদ দারবিশ ১৯৪১ সালের ১৩ মার্চ, ফিলিস্তিনের ছোট্ট গ্রাম আল-বোরোতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা সালিম দারবিশ এবং মা হুরিয়াহ দারবিশ। তারা ছিলেন কৃষক, নিজেদের জমিতে চাষবাস করতেন। 

দারবিশের প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয় বাড়িতে, তার দাদার কাছে, তারপর তিনি কাফর ইয়াসিফে হাইস্কুলে ভর্তি হন। তারপর চলে যান হাইফায়। 

১৯৪৮ সালে, ইহুদিবাদী ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ইসরায়েলি সৈন্যরা ফিলিস্তিনিদের ওপর সর্বাত্মক আক্রমণ চালায়। জোরপূর্বক দখল করে নেয় ফিলিস্তিন ভূমি। তাদের বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও বাগান সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে ফেলে, যেন আসল বাসিন্দারা আর কখনো তা চিনতে না পারে এবং ফিরতে না পারে। জাতিসংঘের হিসাবে ৭,২৬,০০০- ৯,০০,০০০ ফিলিস্তিন দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। দারবিশের গ্রামও আক্রান্ত হয়, তাঁরা অন্যদের সঙ্গে পালিয়ে যান লেবাননে, সেখানে প্রথমে জেজিন, পরে দামুরে আশ্রয় নেন। বছরখানেক পরেই প্রত্যাবর্তন করেন অ্যাকরে (যা এখন ইসরাইলের অংশ), এবং ডেইর আল-আসাদ-এ বসবাস শুরু করেন।

সাত বছর বয়সে, দারবিশ লেবাননের সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করেন, তার হারানো জন্মভূমিতে। কিন্তু শিশু দারবিশ দেখলেন ইসরায়েলী গোলার আগুনে পুরে গেছে তার বাড়ি-গ্রাম্ত ফিলিস্তিনের মানচিত্র। দারবিশ লিখেছেন : “এক রাতে আমার চাচা এবং একজন পথপ্রদর্শকের সাথে লেবাননের সীমান্ত দিয়ে আমি প্রবেশ করলাম ফিলিস্তিনে। সকালে উঠে দেখি আমি একটি ইস্পাতের দেয়ালের মুখোমুখি : আমি ফিলিস্তিনে। কিন্তু কোথায় আমার ফিলিস্তিন? আমি কখনো আমার বাড়িতে ফিরে যেতে পারিনি। প্রচন্ড কষ্ট নিয়ে আমি দেখতে পেলাম আমার গ্রাম বিধ্বস্ত-ভস্ম।”

মাত্র উনিশ বছর বয়সে প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আসাফির বিলা আজনিহা’ প্রকাশ করেন দারবিশ।

ইসরাইলি দমন-পীড়নে নিজের দেশের দুরবস্থা, জনগণের দুর্দশা ও নিজের মাতৃভূমি বধ্যভূমিতে পরিণত হওয়ার বিষয়ে লিখেছেন,

‘ভদ্র লোকেরা, আপনারা আমাদের দেশকে

পরিণত করেছেন কবরে

বুলেটের চাষ করেছেন আমাদের মাথায়

এবং সম্পন্ন করেছেন গণহত্যা।’

তিনি ১৯৬১ সালে, ইসরায়েলি কমিউনিস্ট পার্টি রাকাহ’র সদস্য হন। এই রাজনৈতিক দলের সাহিত্য পত্রিকা ‘আল-জাদিদ’ এ কবিতা লিখতে শুরু করেন। তিনি ইসরায়েলি ওয়ার্কার্স পার্টির সাহিত্য পত্রিকা আল-ফজরের সহকারী সম্পাদকের কাজও করেন কিছুকাল। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত, ইসরায়েল-অধিকৃত প্যালেস্টাইনি এলাকায় জরুরি সামরিক শাসন চালু ছিল। অনুমতি ছাড়া যাতায়াত করার জন্য দারবিশকে ১৯৬১ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত বারবার কারাভোগ করতে হয়েছে। দারবিশ ১৯৭০ সালে, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে পাড়ি জমান উচ্চশিক্ষা নিতে। সেখানকার লমোনোসভ মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে এক বছর কাটিয়ে চলে যান মিসরে। সেখানে আল-আহরাম পত্রিকায় কাজ নেন। ১৯৭৩ সাল লেবাননে পাড়ি দেন। সেখানে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত অবস্থান করেন।

১৯৭৩ সালে, বৈরুতে সু’উন ফিলিস্তিনিয়া (প্যালেস্টাইনিয়ান অ্যাফেয়ার্স) নামক মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন, এবং পিএলও’র প্যালেস্টাইনিয়ান রিসার্চ সেন্টার-এর ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেন। সে-বছরই প্যালেস্টাইনি লিবারেশন অরগানাইজেশনে (পিএলও) যোগ দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ইসরায়েল তার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পরবর্তীতে ইসরায়েল বৈরুতে আক্রমণ করলে অন্য পিএলও নেতাদের সঙ্গে তিনি বৈরুত ত্যাগ করেন। 

৯৮৭ সালে, তিনি পিএলওর নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৮ সালে, ‘প্যালেস্টিনিয়ান পিপলস ডিক্লারেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্সে’র মেনিফেস্টো রচনা করেন। ১৯৯৩ সালে, আমেরিকার উদ্যোগে পিএলও ও ইসরায়েল তথাকথিত শান্তিচুক্তি (অসলো চুক্তি) স্বাক্ষর করে। তার প্রতিবাদে তিনি পিএলওর নির্বাহী কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি সবসময়ই ইসরাইলের সঙ্গে আপোসের ক্ষেত্রে “দৃঢ় এবং নিরপেক্ষ” ভূমিকা নেবার পক্ষপাতি ছিলেন। তিনি বলেন, তার প্রতিবাদের কারণ এই নয় যে, তিনি শান্তি চান না বরং এজন্য যে, এই চুক্তি শান্তি স্থাপনে ব্যর্থ হবে। বাস্তবে তা-ই হয়েছে। 

যাযাবরের মতো সিরিয়া, সাইপ্রাস, কায়রো ও তিউনিস হয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি প্যারিসে পাড়ি জমান। ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তিনি প্যারিসে অবস্থান করেন। 

দু’বার যৌথজীবনের আয়োজন করেছিলেন দারবিশ, দু’বারই বিচ্ছেদ অনিবার্য হয়ে দেখা দিয়েছে। প্রথমবার বিয়ে হয় লেখক রানা কাব্বানির সঙ্গে, দ্বিতীয়টি মিশরীয় অনুবাদক হায়াত হিনি’র সঙ্গে। কোনোপক্ষেই তাঁর কোনো উত্তরাধিকারী নেই।

তিনি বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো – ইউনিয়ন অব আফ্রো-এশিয়ান রাইটার্সের দ্য লোটাস প্রাইজ (১৯৬৯), সোভিয়েত ইউনিয়নের লেনিন পিস প্রাইজ (১৯৮৩), ফ্রান্সের সর্বোচ্চ পুরস্কার দ্য নাইট অব দ্য অর্ডার অব আর্টস অ্যান্ড লেটার্স (১৯৯৩), আমেরিকার ল্যান্নান ফাউন্ডেশনের প্রাইজ ফর কালচারাল ফ্রিডম (২০০১), 

প্রিন্স ক্লস অ্যাওয়ার্ডস (২০০৪), দ্য ইন্টারন্যাশনাল ফোরাম ফর অ্যারাবিক পোয়েট্রি প্রাইজ (২০০৭) ইত্যাদি।

তাঁর প্রকাশিত অসংখ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোঃ- আসাফির বিলা আজনিহা (১৯৬০), আওরাক আল-জাইতুন (১৯৬৪), আশিক মিন ফিলাস্তিন (১৯৬৬), আখির আল-লাইল (১৯৬৭), ইয়াওমিয়াত জুর্‌হ ফিলাস্তিনি ( ১৯৬৯), হাবিবাতি তানহাদ মিন নাওমিহা (১৯৬৯), আল-কাতাবাহ ’আলা ধাওয়ি আল-বনদুকিয়াহ (১৯৭০), আল-আসাফির তামুত ফি আল-জালিল (১৯৭০), মাহমুদ দারবিশ সমগ্র (১৯৭১), কা-জাহর এল-লজ অ আব’আদ (২০০৫) ইত্যাদি । গদ্যের বইয়ের মধ্যে আছে সামথিং অ্যাবাউট দ্য হোমল্যান্ড (১৯৭১), মেমোরিজ অব ফরগেটফুলনেস (১৯৮৭), বাইপাসারস ইন বাইপাসিং ওয়ার্ডস (১৯৯১) এবং ২০০৬ সালে প্রকাশিত ইন দ্য প্রেজেন্স অব অ্যাবসেন্স ইত্যাদি।

১৯৮৪ এবং ১৯৯৮ সালে দারবিশের দুবার হার্ট অ্যাটাক হয়। তার হৃৎপিন্ডের জটিলতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ২০০৮ সালের ৬ আগস্ট আমেরিকার টেক্সাসে মেমোরিয়াল হারম্যান হাসপাতালে তার হার্টের অপারেশন করা হয়। কিন্তু তিনি আর সেরে ওঠেননি। ৯ আগস্ট, মাত্র ৬৭ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

মৃত্যুর আগে তিনি প্রমাণ করে গেছেন, একজন কবি চাইলেই তার শক্তিশালী অস্ত্র কলমের মাধ্যমে নিজের পরিচয়, মাতৃভূমি, দেশ ও জাতির পরিচয়, হারানো শৈশব নিখুঁত অঙ্কনের পাশাপাশি কলম দিয়ে শব্দ চাষ করে সে শব্দগুলো জোড়া দিয়ে যুদ্ধ করতে পারে। অনন্তকাল এই পৃথিবী স্মরণ করবে শব্দসৈনিক মাহমুদ দারবিশকে।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button