আন্তর্জাতিকজানা-অজানা

বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল স্কুল ‘ইন্সটিটিউট লি রোজি’

জুডিথ ক্র্যান্টজের প্রিন্সেস ডেইজি (১৯৮০) এবং টিল উই মেট অ্যাগেইন (১৯৮৮) উপন্যাসগুলো যারা পড়েছে তাদেরকে ‘ইন্সটিটিউট লি রোজি’ কে নতুন করে চেনানোর কিছু নেই। এছাড়াও ক্যারেন রবার্ডস এর বেশ কয়েকটি রোম্যান্স উপন্যাসেও উল্লেখ আছে বিশ্ববিখ্যাত এই স্কুল টির নাম। 

‘এ স্কুল ফর লাইফ’ আদর্শে উজ্জীবিত আলোচিত এই ‘ইন্সটিটিউট লি রোজি’ বিশ্বের সবেচেয়ে ব্যয়বহুল স্কুল। সুইজারল্যান্ডে অবস্থিত এই স্কুল টি দেশটির প্রাচীনতম বোর্ডিং স্কুল। যে স্কুল টি কে বলা হয় ‘স্কুল অফ কিংস” অর্থাৎ রাজাদের স্কুল। এমন নামের পেছনে কারণ খুঁজতে হলে তাকাতে হবে এর প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের দিকে। এই স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের তালিকায় চোখ বুলালেই খুঁজে পাওয়া যায় বিভিন্ন দেশের রাজপুত্র-রাজকন্যাদের নাম।

শুরু থেকেই স্কুলটির প্রায় সব শিক্ষার্থীই ছিল অভিজাত পরিবার থেকে আসা। ইরানের শাহ, মোনাকোর প্রিন্স রেইনার, বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় অ্যালবার্ট, করিম আগা খান,এডওয়ার্ড কেন্ট ডিউক, যুগোস্লাভিয়ার প্রিন্স আলেক্সান্ডার, বেলজিয়াম রাজা আলবার্ট দ্বিতীয়, গ্রীসের ক্রাউন প্রিন্সেস এবং তার বোন পিয়া গেটি, মিশরের রাজা দ্বিতীয় ফুয়াদ, আলেকজান্দ্রা ফন ফার্স্টেনবার্গ ও পড়াশোনা করেছেন এখানে।

এই স্কুলের বার্ষিক টিউশন ফি এতটাই বেশি যা বহন করা অনেক বিত্তবানের পক্ষে ও অসম্ভব।

২০১১-১২ হিসাবে, এখানকার বার্ষিক বোর্ডিং এবং একাডেমিক ফি প্রায় এক লক্ষ তেত্রিশ হাজার মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের হিসেবে বছরে যার পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ১২ লক্ষ ৫৭ হাজার টাকা!

প্রতিষ্ঠা 

‘লি রোজি’ এর প্রতিষ্ঠাতা পল কার্নাল উত্তর সুইজারল্যান্ডে জুরা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। সেখান থেকে চলে আসেন সুইজারল্যান্ডের ই আরেক শহর ‘রোলে’ তে। জেনেভা থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে সুইজারল্যান্ডের এই শহরে রয়েছে চতুর্দশ শতকে নির্মিত ‘শ্যাতিও দ্যো রোজি’ নামের একটি ঐতিহাসিক দুর্গ। পল কার্নাল ১৮৮০ সালে, শ্যাতিও দ্যো রোজির একটি অংশে গড়ে তোলেন, সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে পুরোনো প্রাইভেট স্কুল ‘ইন্সটিটিউট লি রোজি’। তাই কয়েক বছর পরেই পল কার্নাল ‘শ্যাতিও দ্যো রোজি’ সহ প্রায় ২০ হেক্টর জমি কিনে নেন স্কুলের জন্য।

১৯১২ সালে, পল কার্নালের ছেলে হেনরি কার্নাল স্কুলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। হেনরির অসাধারণ দক্ষতা ও বৈচিত্র্যময় চিন্তাধারা ‘লি রোজি’কে বিখ্যাত করে তোলে। সুইজারল্যান্ড ছাড়িয়ে পাশের দেশগুলোতেও এর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে।

১৯১৬ সালে, হেনরি কার্নাল লি রোজির জন্য সুইজারল্যান্ডের আরেক শহর জিস্টাডে নতুন একটি ক্যাম্পাস গড়ে তোলেন। জিস্টাড ক্যাম্পাসটি তৈরি করা হয় শুধুমাত্র শীতকালের জন্য। বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের সময়টায় স্কুলের প্রয়োজনীয় সবকিছু শীতকালীন ক্যাম্পাসে স্থানান্তর করা হয়। শুরুর দিকে বছরে ৩ মাসের জন্য রিসোর্ট ভাড়া নিয়ে শীতকালীন ক্যাম্পাসটি করা হলেও বর্তমানে লি রোজির নিজস্ব মালিকানায় স্থায়ীভাবেই শীতকালীন ক্যাম্পাস রয়েছে।

শিক্ষাব্যবস্থা এবং বিশেষত্ব 

যদিও লি রোজি এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল স্কুল, তবে এর বাইরেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ

এই স্কুল টি কে বিশ্বখ্যাতি এনে দিয়েছে। এই স্কুলের শিক্ষাপদ্ধতি থেকে শুরু করে ক্যাম্পাস, ভর্তি প্রক্রিয়াসহ সকল কার্যক্রমেই রয়েছে স্বাতন্ত্র্য, যার ফলে লি রোজি যেমন স্বনামধন্য, তেমনই বেশ আলোচিতও বটে। 

ইনস্টিটিউট লি রোজি সম্পূর্ণরূপে নিউ ইংল্যান্ড অ্যাসোসিয়েশন অফ স্কুল অ্যান্ড কলেজসমূহ, আন্তর্জাতিক পাঠ্যক্রম, ফ্রান্সের জাতীয় শিক্ষা মন্ত্রক এবং আন্তর্জাতিক বিদ্যালয়ের কাউন্সিল কর্তৃক সম্পূর্ণরূপে স্বীকৃত। লি রোজি’র একাডেমিক পাঠ্যক্রমটি আন্তর্জাতিক ছাত্র সংস্থার জন্য “একটি উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা” হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে।

প্রতিবছর ওয়েবসাইট থেকে ভর্তি ফর্মে আবেদনের পর একটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রত্যেক প্রার্থীকে তাদের ক্যাম্পাসে ডাকা হয়। লি রোজির প্রথম ধাপে রয়েছে প্রাথমিক দ্বি-ভাষার শিক্ষা কার্যক্রম। এই কোর্সে ৮-১১ বছর বয়সীদের ভর্তি করা হয়, এবং তাদের শেখানো হয় ফরাসি ও ইংরেজি ভাষা। প্রথম কোর্স শেষ হবার পর শুরু হয় মাধ্যমিক কোর্স। এই কোর্স এ ভর্তি করানো হয় ১২-১৫ বছরের শিক্ষার্থীদের। মাধ্যমিকে আরেকটি ভাষা যুক্ত করা হয়। লি রোজির শেষ ধাপে রয়েছে ফরাসি ও আন্তর্জাতিক পাঠ্যক্রমানুসারে বিভিন্ন বিষয়ে ডিপ্লোমা করার সুযোগ। 

বিদ্যালয়ে বর্তমান ৪০০ এর বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে; যেখানে ছাত্র এবং ছাত্রী উভয় আই সমানভাবে বিভক্ত। প্রতি ৫ জন শিক্ষার্থীর জন্যে বিষয়ভিত্তিক একজন শিক্ষক রয়েছে এবং একটি শ্রেণীকক্ষে ২০ জন শিক্ষার্থী কে পড়ানো হয়।

লি রোজির শিক্ষা কার্যক্রম শুরু থেকেই ছিল ভিন্ন। গতানুগতিক চাপ প্রয়োগ করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য বাধ্য করা হতো না। পড়াশোনার সাথে খেলাধুলা ও বিনোদনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা, শীতকালীন ক্যাম্পাসে তিন মাস শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন, পর্বতারোহন, হাইকিং, স্নোবোর্ডিং, আইস-হকি, কার্লিং, ব্যাডমিন্টন, ড্রয়িং, ওয়াটার স্কিইং, গলফ, হকি, রোয়িং, অশ্বচালনা, সাঁতার, বাস্কেটবল, ভলিবল, ফুটবলসহ বিভিন্ন কার্যক্রম লি রোজিকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করে তোলে।

এর শিক্ষা-কার্যক্রম এতটাই মানসম্মত যে, এখান থেকে ডিপ্লোমা শেষে শতকরা ৩০ ভাগ রোজেন আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে সেরা ২৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায়। 

পল এন্ড হেনরি কার্নাল হল

২০১৪ সালে, এখানে নির্মাণ করা হয় ‘পল এন্ড হেনরি কার্নাল হল’। যেটি লি রোজির জ্ঞানচর্চা ও আভিজাত্যের নিদর্শন বহন করে।

                                      চিত্রঃ পল এন্ড হেনরি কার্নাল হল

এই হলে মোট ৩টি অংশ রয়েছে। একটি অংশ শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের জন্য, যার নাম কালচার। এখানে ৯০০-১,০০০ আসনের একটি কনসার্ট হল রয়েছে, যেখানে প্রতিবছর বিভিন্ন কনফারেন্সের আয়োজন করা হয় এবং শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিষয়ে পারফর্ম করে থাকে। সেই সাথে বিশ্বের নামি-দামি মিউজিক আর্টিস্ট ও এখানে আসেন, পারফর্ম করেন।

দ্বিতীয় অংশটির নাম আর্টস। যেটি শিল্পকলার জন্য ব্যবহার করা হয়। এখানে রয়েছে একটি বৃহৎ মিউজিক্যাল স্টুডিও, যেখানে সঙ্গীতচর্চার করার প্রচুর সরঞ্জাম রয়েছে।

হলটির সর্বশেষ অংশকে বলা হয় কমিউনিকেশন সেক্টর, যেখানে যথাযথ নিয়মানুবর্তিতার মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করে থাকে। এতে করে ভিন্ন দেশ, ভিন্ন সংস্কৃতির শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক বন্ধন গড়ে তোলে, একে অন্যের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা, শদ্ধা করা শিখে, যা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দিক থেকে সমৃদ্ধ করে তোলে।

শেষকথা 

বৈচিত্র্যময় বৈশিষ্ট্যই ইন্সটিটিউট লি রোজিকে গত ১৪০ বছর ধরে এক অনন্য উচ্চতায় ধরে রাখতে পেরেছে। নিঃসন্দেহে স্কুলটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল, তবে এটাও সত্যি যে তাদের শিক্ষা-কার্যক্রম পৃথিবীর যেকোনো দেশ বা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য অনুকরণীয়।

সবশেষে বলা যায়, লি রোজির মতো ভিন্নতা প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকলে হয়তো শিক্ষার্থীরা কখনোই স্কুলবিমুখ হতো না, বরং আনন্দ-উৎসাহের সাথে নিজেদের যোগ্যতার সবটুকু প্রমাণ করার সুযোগ পেত।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button