ইতিহাসজীবনীসাম্প্রতিক

কে এই আল-কাসসাম?

গত মে ২০২১, ইসরাইলের নৃশংস আঘাতের প্রতিবাদে কাসসাম বিগ্রেডের শক্ত প্রতিরোধে নাজেহাল হয়ে পড়ে দখলদার ইসরাইল এক তরফা যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা করে। ইজ্ আদ-দীন আল-কাসসাম ব্রিগেড ১৯৯৩ সালে, ইজ্ আদ-দীন আল-কাসসাম এর নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। হামাসের সামরিক শাখা আল কাসসাম ব্রিগেড-এর নামকরণ ও হয়েছে এই ইজ-আদ-দীন আল-কাসসাম এর নামে।

কে ছিলেন এই ইজ-আদ-দীন আল-কাসসাম? কেনই বা আজ তিনি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের পথিকৃৎ? 

প্রাথমিক জীবন 

১৮৮২ সালে, বর্তমান সিরিয়ার লাজকিয়ে শহরের জাবালি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ইজ-আদ-দীন আল কাসসাম। ফিলিস্তিনকে স্বাধীন একটি ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ শুরু করা ব্যক্তিদের মধ্যে প্রথম সারির একজন তিনি। তাঁর আসল নাম ইজ-আদ-দীন বিন আব্দুল কাদির বিন মুস্তাফা বিন ইউসুফ বিন মুহাম্মাদ আল কাসসাম। তাঁর বাবা আবদুল কাদির ছিলেন উসমানীয় যুগে শরিয়া আদালতের একজন কর্মকর্তা এবং কাদেরিয়া তরিকার একজন স্থানীয় নেতা। তাঁর দাদা কাদেরিয়া তরিকার একজন প্রধান শাইখ ছিলেন। পারিবারিকভাবে আল কাসসাম কাদেরিয়া তরিকার সুফি হিসেবে গড়ে উঠেন।

আল-কাসসাম ১৪ বছর পর্যন্ত পারিবারিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। অতঃপর ১৯০২ সালে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উদ্দেশ্যে মিশরের কায়রোতে অবস্থিত বিখ্যাত আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে গমন করেন এবং সেখানে ইখওয়ানুল মুসলিমীনে (মুসলিম ব্রাদারহুড) যোগদান করেন তিনি। আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালে আল-কাসসাম রহ. সুফিবাদের সাথে জিহাদী চেতনায় উজ্জীবিত হন।

১৯০৯ সালে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষে তিনি সিরিয়ায় নিজ গ্রামে ফিরে যান এবং একটি কাদেরিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে তিনি কাদেরিয়া তরিকা এবং কুরআনের আইনতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা শিক্ষা দিতেন। শিক্ষকতা ছাড়াও তিনি ইবরাহিম ইবনে আদহাম মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

ইসলামের পুনর্জাগরণ যে শুধু ইসলামের মৌলিক বিষয়ে ফিরে যাওয়ার মাধ্যমেই সম্ভব এবং এর বিপরীতে সবচেয়ে বড় শত্রু যে সাম্রাজ্যবাদ, তা জনগণের মাঝে তুলে ধরার চেষ্টা করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যসমূহ সমগ্র সিরিয়াতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে।  তিনি শুধু উনার আদর্শের মৌখিক প্রচার করেই ক্ষান্ত হননি, বরং ১৯১১ সালে সাম্রাজ্যবাদী ইতালি উসমানিয়দের কাছ থেকে লিবিয়া দখল করলে সরাসরি ওসমানী সৈন্যদের সাথে এক হয়ে ময়দানে যুদ্ধ করেছেন।

এছাড়াও তিনি সিরিয়ায় লিবিয়ার যোদ্ধাদের জন্য অর্থ  সংগ্রহ করেন। সামরিক প্রশিক্ষণ আছে এমন স্বেচ্ছাসেবকদের সংগঠিত করে তিনি লিবিয়ায় প্রেরণ করেন।

ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম

১ম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে আল-কাসসাম রহ. উসমানীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন ও সামরিক প্রশিক্ষণ নেন।

উসমানি খিলাফতের পরাজয়ের পর ১৯১৮ সালে, যখন ফ্রান্স বাহিনী সিরিয়া হামলা করে, তখন ফ্রান্স বাহিনীর বিরুদ্ধে তিনি সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেন, তিনি তাঁর ঘর বিক্রি করে জিহাদের জন্যে অস্ত্র কিনেন। তিনি বলেন,‘এটা গুরুত্বপূর্ণ নয় যে আমরা বিজয়ী হবো, আমাদের কাছে সর্বপ্রথম গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এই উম্মতকে এবং আগামী প্রজন্মকে আমরা শিক্ষা দিয়ে যাবো’।

ফ্রান্স দামেস্ক দখল করে নিলে যুদ্ধের শেষ দিকে তিনি জাবলাহতে ফিরে আসেন ও জাবলাহ রক্ষার চেষ্টা করেন। কিন্তু উসমানীয় শাসক পরাজয় মেনে নেওয়ায়, তারা আল-কাসসাম রহ.-কে সহায়তা করতে পারেনি। তখন তিনি একটি নিজস্ব বাহিনী গঠন করেন।

পরবর্তীতে সাম্রাজ্যবাদী ফ্রান্সের শাম দখলের বিরুদ্ধে সংগ্রামের লক্ষ্যে জনগণকে এক করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন তিনি। এ সময় ফ্রান্স সরকার তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি ও মৃত্যুদণ্ড পরোয়ানা জারি করে।

১৯১৯ সালে, ফরাসিরা উত্তর সিরিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে প্রবেশ করে। এ সময় আল-কাসসামের বাহিনীর সাথে ফরাসীদের তীব্র যুদ্ধ হয়। বছরখানেক ধরে তিনি ফরাসিদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যান। কিন্তু পরাজিত হন।

ফিলিস্তিন গমন এবং ইসলাম প্রচারণা 

সিরিয়াতে বিপর্যন্ত হওয়ার পর আল-কাসসাম  প্রথমে লেবাননের বৈরুতে যান পরে সেখান থেকে ফিলিস্তিনের হাইফাতে যান। তিনি ফিলিস্তিনে বসবাস শুরু করেন করেন এবং একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা শুরু করেন। এসময় ফিলিস্তিন ব্রিটেনের অধীনে ছিল। তিনি পুনর্জা‌গরণে বিশ্বাসী ছিলেন এবং ফিলিস্তিনের স্থানীয় কিছু প্রথার বিরোধিতা করতেন। এর মধ্যে রয়েছে ইসলাম বহির্ভূত মৃত্যুপরবর্তী‌ প্রথা, সন্তানদের মঙ্গল বা অর্জনের জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে কারমাল পর্বতের নিকটে খিজিরের মাজারে মায়েদের জিয়ারত এবং ধর্মীয় স্থানে গোত্রীয় নৃত্য। এসব কুসংস্কারচ্ছন্ন প্রথা বাদ দিয়ে তাদের সঠিক ইসলামের চর্চায় উদ্বুদ্ধ করেন তিনি। তার আকর্ষণীয় বক্তব্যে মানুষ ভুল পথ পরিত্যাগ করে।

১৯২৮ থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আল-কাসসাম হাইফায় জামিয়া আল-শুব্বান আল-মুসলিমিন দলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

উত্তর ফিলিস্তিনের দরিদ্র মুসলিমদের মধ্যে আল-কাসসাম দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। ১৯২৯ সালে, সুপ্রিম মুসলিম কাউন্সিল কর্তৃক হাইফার শরিয়া আদালতে বিয়ে রেজিস্ট্রার হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি। এই দায়িত্বের কারণে তাকে উত্তরাঞ্চলের গ্রামগুলোতে সফরে যেতে হত। তিনি সেখানকার বাসিন্দাদের কৃষি সমবায় গড়তে উৎসাহিত করেন। তার সফরের সময় তিনি গ্রামবাসীদেরকে তার তেজস্বী বক্তব্যের মাধ্যমে ব্রিটিশ ও ইহুদিদের প্রতিরোধ করতে উৎসাহিত করতেন। জিহাদের প্রতি আত্মোৎসর্গের প্রতীক হিসেবে তিনি পুরুষদের দাড়ি রাখা ও সবসময় সঙ্গে কুরআন রাখার ব্যাপারে উৎসাহিত করতেন।

ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম

১৯৩০ সাল থেকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আল-কাসসাম সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করেন। তিনি এর জন্য “আল-কাফ আল-আসওয়াদ (কালো হাত)” নামে বৃটিশ এবং ইহুদী আধিপত্যবাদ বিরোধী একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। এটি জায়নবাদ বিরোধী ও ব্রিটিশ বিরোধী সামরিক সংগঠন ছিল।

সেখানে তিনি আল ফাতাহ আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক পথপ্রদর্শক আমিন আল হুসাইনির সাথে পরিচিত হন। তাঁদের চেতনার ফসল হিসেবে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতা আন্দোলন বা পিএলও এবং তারই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে হামাস আন্দোলনের উদ্ভব ঘটে।

জায়নবাদী ইয়াহুদিরা যখন বৃটেনের ছত্র ছায়ার পূর্ণ ফিলিস্তিন দখল করে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্যে বিভিন্ন চক্রান্ত ও গুপ্তহত্যা শুরু করে, তখন সিরীয় এ আলেম তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদ শুরু করেন। আল-কাসসামের গেরিলা সংগ্রাম ফিলিস্তিনের মাটিতে ইসরাইল নামক একটি রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনাকারী ব্রিটিশদের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অবধারিতভাবে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সাথে তার সংঘর্ষ শুরু হয়।

জীবনাবসান 

১৯৩৫ সালের ৮ নভেম্বর, ব্রিটিশ কনস্টেবল মোশে রোসেনফেল্ডের লাশ আইন হারুদে খুজে পাওয়া যায়। আল-কাসসাম ও তাঁর অনুসারীদেরকে এর জন্য দায়ী বলে ধারণা করা হয়েছিল। এরপর তাকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেয়া হয়। ফলে আল-কাসসাম ও তাঁর ১২ জন অনুসারী আত্মগোপনের উদ্দেশ্যে হাইফা ত্যাগ করেন। শাইখ জাইদের গ্রামে ইয়াবাদের নিকটে একটি গুহায় ব্রিটিশ পুলিশ আল-কাসসাম কে ঘিরে ফেলে। সম্পূর্ণ সশস্ত্র ও সুসজ্জিত ৫০০ জন ব্রিটিশ সৈন্য আল কাসসাম ও তাঁর সহযোগীদের স্থল ও আকাশ পথে একযোগে হামলা করে অবরোধ করা শুরু করে।

২০ নভেম্বর, সেখানে সংঘটিত দীর্ঘ লড়াইয়ে আল-কাসসাম ও তার তিন অণুসারী শহীদ হন এবং বাকিরা বন্দী হন। সেই সাথে ব্যর্থ হয় আল-কাসসাম এর উদ্দেশ্য। 

কিন্তু আসলেই কি তিনি ব্যর্থ হয়েছেন? না, এখনো দলমত নির্বিশেষে ফিলিস্তিনের সকল মুসলিম তাঁকে বীর হিসেবে স্মরণ করেন। 

বর্তমান পরিস্থিতির দিকে লক্ষ্য করলে দেখতে পাই, প্রায় ৮৬ বছর পূর্বে দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেও এখনো ফিলিস্তিনি মুসলিমদের জিহাদে উজ্জীবিত করে চলেছেন এই বীর।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button