জীবনীসাম্প্রতিক

মাহা ভাজিরালংকর্ণঃ পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী এবং বিতর্কিত রাজা

পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী রাজা/রানী কে? এই প্রশ্ন করলে সবার আগে কার নাম মাথায় আসে? 

রানী ২য় এলিজাবেথ? 

ব্রিটিশ রয়্যাল ফ্যামিলির ব্যক্তিগত সম্পত্তি সম্পর্কে সোশ্যাল মিডিয়ায় সবসময় আলোচনায় থাকলেও, এর নিচে চাপা পড়ে যায় দক্ষিণ-পূ্র্ব এশিয়ার আরেকজন রাজার নাম।

জনপ্রিয় জার্নাল ‘বিজনেস ইনসাইডারের’ মতে, রানী এলিজাবেথ এর তুলনায় ৮০ গুন বেশি সম্পত্তির মালিক এই রাজা। কি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে? হ্যাঁ, আপনি ঠিকই দেখছেন।

আর ইনিই হলেন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী রাজা। যার সম্পত্তির মূল্য ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকেও বেশি।

দেহরক্ষী কে বিয়ে করে, ব্যক্তিগত বিলাসবহুল আকাশযানে এ চড়ে, পোষ্য কুকুরের জন্যে ৪ দিন ব্যাপী ব্যয়বহুল অন্তেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন করে বারবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত এই রাজা। তিনি সম্পূর্ণভাবে একজন রহস্যময় ব্যাক্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন।

এই ব্যক্তি টি হলেন থাইল্যান্ডের বর্তমান সিংহাসন অধীষ্ঠ রাজা, রাজা ১০ রামা।

প্রাথমিক জীবন 

১৯৫২ সালের ২৮ জুলাই, ব্যাংককের ডুসিট প্যালেস এ জন্মগ্রহণ করেন রাজা ১০ রামা। তার প্রকৃত নাম মাহা ভাজিরালংকর্ণ।

চক্রী রাজবংশের দশম রাজা হিসেবে , তিনি ১০ রামা নামেই বেশি পরিচিত। ১৭৮২ সাল থেকে থাইল্যান্ডে রাজত্ব করছে চকরি রাজবংশ। রাজা ভূমিবল আদুলিয়াদেজ এবং কুইন সিরিকিতের একমাত্র পুত্র তিনি। ১৯৭২ সালে, মাত্র ২০ বছর বয়সে, তাকে তার পিতা ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। 

শিক্ষাজীবন 

১৯৫৬ সালে, ডুসিট প্যালেস এ চিত্রলাদা স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন ভাজিরালংকর্ণ। সেখানে  ম্যাথায়ম ১ (গ্রেড ৭) শেষ করার পর যুক্তরাজ্যের ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্কুলে ভর্তি করানো  হয় তাকে। প্রথমে একটি প্রেপ স্কুল, তারপর কিংস মেড, সি ফোর্ড, সাসেক্স এবং সোমারসেট এর মিলফিল্ড স্কুলে ভর্তি হন তিনি। সেখান থেকে ১৯৭০ সালের জুলাই এ, মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। আগস্ট ১৯৭০ সালে, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি তে অবস্থিত দ্য কিং স্কুলে ৫ সপ্তাহের একটি সামরিক প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশগ্রহণ করেন “ফুটবল প্রিন্স” হিসাবে পরিচিত এই রাজা।

১৯৭২ সালে, ক্যানবেরায় অবস্থিত ডান্ট্রন এর রয়্যাল মিলিটারি কলেজে ভর্তি হন তিনি। প্রথমে অস্ট্রেলিয়ান সেনাবাহিনী হতে সামরিক প্রশিক্ষণ নেন, পরবর্তীতে নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। 

১৯৭৬ সালে, একটি উদার শিল্পকলা ডিগ্রিসহ একজন কর্পোরাল হিসেবে স্নাতকোত্তর অর্জন করেন এ রাজা।

১৯৭৭ সালে, কমান্ডো এবং জেনেরাল স্টাফ কলেজে যোগদান করেন।

১৯৮২ সালে, সুখোথাই থাম্মাথিরাট উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন নিয়ে ২য় বারের মত সম্মান ডিগ্রি অর্জন করেন ভাজিরালংকর্ণ ।

কর্মজীবন

পড়াশোনা শেষ করার পর ভাজিরালংকর্ণ রয়েল থাই আর্মি তে কেরিয়ার অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে সেনা গোয়েন্দা অধিদপ্তরে স্টাফ অফিসার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। 

তিনি একজন যোগ্য ফিক্স-উইং এবং হেলিকপ্টার পাইলট ছিলেন। ১৯৭৮ সালে, তিনি রাজার নিজস্ব দেহরক্ষী ব্যাটালিয়নের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন। 

রাজ্যাভিষেক 

১৩ ই অক্টোবর, ২০১৬ সালে তার বাবার মৃত্যুর পরে থাইল্যান্ড এর সিংহাসনে আরোহন করবেন বলে আশা করা হলেও ২০১৯ সালের ৪ মে, ৬৪ বছর বয়সে আনুষ্ঠানিকভাবে সিংহাসনে আরোহণ করেন ক্রাউন প্রিন্স মাহা ভাজিরালংকর্ণ। গত ৬৯ বছরে দেশটির কোন রাজার সিংহাসনে আরোহণের এটাই প্রথম ঘটনা।

২০১৯ সালের ৪-৬ মে, ৩ দিন ব্যাপী আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাজা কে রাজকীয় পালঙ্কে চড়িয়ে ব্যাংকক শহর প্রদক্ষিণ করানো হয়। সাড়ে চার মাইল ব্যাপী এই সফরে রাজকীয় বহরে ১৩শ পারিষদ ছিলেন।

চিত্রঃ রাজ্যাভিষেকের দিন শহর প্রদক্ষিণ করার দৃশ্য

অভিষেক অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য থাই সরকার একশো কোটি থাই বাথ বা তিন কোটি মার্কিন ডলারের বেশি খরচ করেছে।

সাম্প্রতিককালে তীব্র সমালোচিত যে কারণে

রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে থাই তরুণ-তরুণীদের বিক্ষোভ এশিয়ার অনেক দেশের অভিজ্ঞতায় অভিনব কিছু নয়। কিন্তু থাইল্যান্ড যে রাজা মহা ভাজিরালংকর্ণের বিরুদ্ধে কথা বলছে সেটা বিস্ময়কর। দেশটিতে ‘রাজা’কে সমালোচনা-পর্যালোচনার ঊর্ধ্বে বিবেচনা করা হতো। এখনো বিপুল মানুষের কাছে তিনি তাই বলে বিবেচিত হন। রাজপরিবার যেখানে ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে পবিত্র কিছু। সেখানে ফৌজদারি দণ্ডবিধির ১১২ ধারায় রাজবংশের যে কোনো ধরনের সমালোচনা ১৫ বছরের দণ্ডযোগ্য করে রাখা হয়েছে। ফলে জবাবদিহিতাহীন বিপুল ক্ষমতার অধিকারী হয়ে আছে থাই রাজপরিবার। 

কিন্তু একদল কিশোর-তরুণ সেই বিশ্বাস থেকে দেশকে মুক্ত করতে রাস্তায় নেমেছে। 

অতিতের শেকড় বাদ দিলেও চলতি থাই রাজতন্ত্রের ইতিহাস প্রায় ২৫০ বছরের পুরনো। প্রায় ৯০ বছর হলো রাজার নির্বাহী ক্ষমতা নেই। তবে দাফতরিক ভাবে তিনি ই রাষ্ট্রের প্রধান, সশস্ত্রবাহিনীর প্রধান এবং ধর্মের রক্ষক। 

এসব পদের ক্ষমতা কতটুকু সেটাও রাজা এবং তার অনুগতরা ই ব্যাখ্যা দেন।

তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সম্পদ বাড়ছে তুমুল গতিতে। ব্যাংক থেকে সিমেন্ট ফ্যাক্টরি পর্যন্ত সবই আছে তাদের। ক্রাউন প্রোপার্টি ব্যুরো (সিপিবি) নামের একটা সংস্থাই আছে এই সম্পদের ব্যবস্থাপনায়। এই ব্যুরোর সম্পদ, বিনিয়োগ ও ব্যবসাপাতি কর ব্যবস্থার আওতাবহির্ভূত থাকায় জনগণের একাংশ ক্ষুব্ধ। এসব সম্পদ রাজার ব্যক্তিগত হলেও তার পরিবারের ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিতদের বেতন–ভাতা জনতার কর থেকেই দিতে হয়। বছরে ১৫ থেকে ২০ কোটি ডলার ব্যয় হয় রাজপরিবারের জন্য নিয়োজিত কর্মীদের পেছনে।

যেহেতু রাজপরিবার নিয়ে প্রশ্ন তোলা বেয়াইনি। তাই সিপিবি ও থাকতে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে।

খুবই রক্ষণশীল হিসেবে ভাজিরালংকর্ণের রয়েছে ৪০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের সম্পদ। 

২০২০ সালে, করোনা ভাইরাস সংক্রমনের জেরে দক্ষিণ জার্মানির বাভারিয়ার গ্র‍্যাণ্ড হোটেলে সোনেনবিখ হলে ২১ উপপত্নী কে নিয়ে স্বেচ্ছা নির্বাসনে যান রাজা মাহা ভাজিরালংকর্ণ।

সাধারণত জার্মানিতেই বছরের বেশিরভাগ সময় কাটান রাজা দশম রাম বলে পরিচিত এই রাজা। বাভারিয়া প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে গোটা হোটেলই দখল করেছেন রাজা ও তার অনুচরেরা। সেখানে থাকাকালে দেশে কাউকে যাতে তার ক্ষমতার অস্থায়ী দায়িত্ব দিয়ে ‘রিজেন্ট’ নিয়োগ দিতে না হয়, সেটাও তিনি সংবিধানে লিখিয়ে নিয়েছেন ২০১৭ সালে। এভাবেই থাইল্যান্ড দেশটি বছরের কিছু সময় জার্মানি থেকে শাসিত হচ্ছে।

সংগত কারণেই জার্মানিতে তার বিলাসী জীবনযাপনের জ্বালানিও জাতীয় বাজেট থেকে নির্বিঘ্নে যাচ্ছে। কিন্তু করোনায় দেশজুড়ে যখন অর্থনৈতিক মন্দা চলছে, আর বেকার বাড়ছে তখন এভাবে অর্থ খরচে করদাতারা আপত্তি তুলছেন। ব্যাংককে বিক্ষোভকারীদের জিজ্ঞাসা ছিল: ‘দেশটা কি রাজপরিবারের? নাকি সমগ্র জনতার?’

থাইল্যান্ডের বিক্ষোভকারীরা রাজপ্রাসাদের কাছে একটি ফলোক বসিয়েছে,  যাতে ঘোষনা করা হয়েছে “থ্যাইল্যান্ড রাজার নয়, জনগনের’। 

প্রধানত ছাত্রদের নেতৃত্বে গত জুলাই, ২০২০ থেকেই যে বিক্ষোভ চলছে, তার মূল দাবি : থাইল্যান্ডের রাজতন্ত্র আর রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটাতে হবে।

এছাড়াও প্লেবয় হিসেবে খ্যাত এই রাজা ২০ জন নারী কে তার মিস্ট্রেস হিসেবে নিযুক্ত করেছেন। যেটি একজন রাজার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

বিবাহিত জীবন

১৯৭৭ সালের ৩ জানুয়ারি, মামাতো বোন সোমসওয়ালি কিতিয়াকর এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ভাজিরালংকর্ণ। তাদের ঘরে একটি কন্য সন্তান আছে। ১৯৯৪ সালে, অভিনেত্রী যুধিদা পোলপ্রেসার্থের সঙ্গে ২য় বারের মত বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। তাদের ঘরে ৫ টি সন্তান জন্মগ্রহণ করে। পরবর্তীতে ২০০১ সালে, শ্রীরাস্মী সুবাদী এবং ২০১৯ সালে, সুথিদা তিদজাই কে বিয়ে করেন তিনি।

সামরিক পদবী

১. ফিল্ড মার্শাল (রয়্যাল থাই আর্মি)

২. এডমিরাল অফ দ্য ফ্লিট (রয়্যাল থাই নেভি)

৩. মার্শাল অফ দ্য রয়্যাল থাই এয়ারফোর্স 

সম্মাননা

১.ফ্রিম্যান সেফগার্ডিং মেডেল

২. বর্ডার সার্ভিস মেডেল

৩. চক্র মালা পদক

৪. কিং রামা নবম রয়্যাল সাইফার পদক

৫. রাজা রাম নবম রাজারুচি পদক (স্বর্ণ শ্রেণি)

৬. রেড ক্রস পদক

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button