আন্তর্জাতিক

পৃথিবীর বৃহত্তম ওপেন এয়ার প্রিজন এবং একটি হার না মানা জাতি

“তরবারির সাথে গর্দানের কখনও আলাপ হতে পারে না।মানব ইতিহাসে কখনই কোন উপনিবেশিক শক্তি ও জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে শান্তিচুক্তি হয়নি।”ফিলিস্তিনি কবি ও বিপ্লবী ঘাসান কানাফানির এই উক্তিগুলো আজকের গাযা অবরোধের মধ্যেও প্রাসঙ্গিক। কারণ,১৯৯৫ সালে যখন ইয়াসার আরাফাত অসলো চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন,তখন বলা হয়েছিল। এই চুক্তির মাধ্যমে ফিলিস্তনিরা তাদের অধিকার ফিরে পাবে। একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারবে। কিন্তু চুক্তির ২৬ বছর পেরিয়ে যাবার পরও,ফিলিস্তিনিরা তাদের অধিকার ফিরে পায়নি বরং ইজরায়েলি বাহিনীর অত্যাচার দিন দিন মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেন ব্যার্থ হলো,এই চুক্তি? কেনই বা ফিলিস্তিনিরা এখনও মরণপণ লড়ে যাচ্ছে?

এর মূল কারণ,ইজরায়েল রাষ্ট্র আসলে কোন দিনই ফিলিস্তিনিদের অধিকার দিতে চায়নি। তাদের মূল লক্ষ্য,প্রাচীন জুডেয়াহ থেকে সামারিয়াহ আর গালিলির পুরোটা নিজেদের ঘরে নিয়ে একটি সুবিশাল ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। আর এই দাবির পেছনে আছে,খোঁড়া ধর্মীয় যুক্তি। তারা বলে ইজরায়েলিরা হলো, ঈশ্বরের নির্বাচিত জাতি হলো ইহুদিরা। আর এই ভূমি তাদের প্রতিশ্রুত ভূমি। অথচ কাগজে কলমে ইজরায়েল সেকুলার রাষ্ট্র! তাদের দাবি তারা মুসা নবীর বংশ। তাই, এই পবিত্র ভূমির উপর অধিকার শুধুমাত্র তাদের। কিন্তু আসলেই কি তাই? নৃতাত্বিক কিংবা ধর্মীয় কোন দাবিই জায়নবাদীদের দাবিকে সমর্থন করে না।

কবি ঘাসান কানাফানি

মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র গণতান্ত্রিক দেশ দাবি করা ইজরায়েল,তার অ-ইহুদি নাগরিকদের দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষ হিসেবে গণ্য করে। আটকে পড়া আরব কিংবা দ্রুজ সম্প্রদায়ের লোকেরা ইজরায়েলে নির্দিষ্ট পরিমাণ ভূমির বেশি কিনতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে তাদের ভোটাধিকার নেই। এর বাইরে ইহুদি গ্রন্থগুলোতে বলা আছে,শুধু মাত্র মেসিয়াহ(মুসলিমরা যাকে দাজ্জাল বলে) আসলেই ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবে। তার আগে নয়। ফলে অনেক অর্থডক্স ইহুদি এই জায়নবাদি রাষ্ট্রকে সমর্থন করে না।

ইজরায়েলে বসবাসরত ইহুদিরা মূলত ইউরোপিয়ান আশকেনাজী ইহুদি। জায়নবাদীদের হাত ধরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ফিলিস্তিনের মাটিতে তারা ঘাঁটি গেড়ে বসে। তারপর ব্রিটিশদের সহায়তায় ইহুদি সশস্ত্র গ্যাং এর সদস্যরা আরবদের উপর জাতিগত নিধন চালিয়ে আজকের ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। সেসময় ফিলিস্তিনে বসবাসরত আরব ইহুদি,খ্রিস্টানরাও এই গণহত্যা থেকে রেহাই পায়নি। সেসময় পরাশক্তিগুলো সহায়তায় ইজরায়েলিরা ফিলিস্তিনের সাড়ে ৭ লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করে।

ইজরায়েল রাষ্ট্র শুরু থেকেই প্রতিবেশি আরবদেশগুলোতে অস্থিরতা ও রাজনৈতিক সংঘাত বৃদ্ধিতে তৎপরতা রেখেছে। আবার কখনো কখনো দুর্নীতিবাজ ও লম্পট আরব নেতৃত্বকে কব্জা করে ফিলিস্তিনিদের মুক্তি সংগ্রামকে বাঁধা দিয়েছে। ১৯৪৮ থেকে পরবর্তীতে লম্বা সময়,পশ্চিমা দেশগুলো ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান জাতিগত নিধনের ব্যাপারে একেবারেই নিশ্চুপ ছিল। ঘাসেম কানাফানিসহ ফিলিস্তিনের প্রায় সব জাতিয় নেতাকে গুপ্তহত্যার মাধ্যমে হত্যা করে মোসাদ। 

লম্বা সময় হত্যাযজ্ঞ,নিপীড়ন,দৈনিক ধড় পাকড়ে অতিষ্ঠ হয়ে ফিলিস্তিনিরা অসলো চুক্তির দিকে হাত বাড়ায় বলে অনেকে মনে করে। ইয়াসার আরাফাতরা হয়ত ভেবেছিলেন অন্তত কিছু হলেও ফিলিস্তিনিরা নিজেদের জমিতে শান্তিতে থাকতে পারবে। কিন্তু তাদের ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়।ইয়াসার আরাফাতে ডিমিলিটারাইজেশন পিএলও’কে একটি অকার্যকর সংগঠনে পরিণত করে। যার জন্য বর্তমানে পশ্চিম তীরের বাসিন্দারা ইজরায়েলিদের বিরুদ্ধে পাথর ছুঁড়ে মারা ছাড়া কিছু করতে পারে না। ইজরায়েল কিন্তু তার ভূমি দখল থামায়নি। এই তো দুদিন আগে শেইখ জাররাহ এলাকার ভূমি দখল করতে শুরু করেছে। দার্শনিক এডওয়ার্ড সাইদ এজন্যই একে ফিলিস্তিনের ভার্সাই চুক্তি বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।

বিধ্বস্ত গাযার সামনে অসহায় এক ফিলিস্তিনি কিশোর

এদিকে পিএলও’কে দুর্বল করতে গাযায় আরেকটি সংগঠন হামাসকে পরোক্ষ সাহায্য করতে শুরু করে ইজরায়েল। তবে সেই হামাসই ধীরে ধীরে ইজরায়েলের গলার কাঁটায় পরিণত হতে শুরু করে। তবে হামাস একটি অসম লড়াইতে আছে। চুক্তির দরুণ পশ্চিম তীরে ইজরায়েল চাইলেও গণহত্যা চালাতে পারে না। কিন্তু হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা দিয়ে ইজরায়েল গাযার মানুষকে তিলে তিলে হত্যা করছে।

২০০৯ ও ২০১৪তে ইজরায়েল গাযায় ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। যা এখনও চলমান। বলা হয়, ২০১১ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনে ইজরায়েলের অনেক স্বার্থ জড়িত ছিল। স্বৈরশাসক সিসিকে ক্ষমতায় বসানোর পরপরই সে গাজার লাইফলাইন রাফা সীমান্ত বন্ধ করে দেয়। এতে করে এক চরম মানবিক বিপর্যয়ে পড়ে গাযার অধিবাসীরা। সিসি শুধু সীমান্ত বন্ধ করেই ক্ষান্ত হয়নি। সে মিসর থেকে পণ্য বহন করার গোপন টানেলগুলো বন্ধ করে দেয়।

গাজায় বিদ্যুৎ, পানির মত নাগরিক সুবিধাগুলো নিয়ন্ত্রণ করে ইজরায়েল। গাযার ৯৭% পানিই বিষাক্ত। গত বছর গাযার বিদ্যুৎ সরবরাহকারী এক্সচেঞ্জ বোমা মেরে উড়িয়ে দেয় ইজরায়েল। করোনা সংক্রমণের মধ্যে এই হামলায়,গাযায় চরম সংকট সৃষ্টি করে। আইসিইউতে থাকা অনেক রোগী মৃত্যুবরণ করে। এমনকি ছোট্ট শিশুরা অসুস্থ হলে ধুকে ধুকে মারা যায়। কিন্তু ইজরায়েল তাদের বের হতে দেয় না। গাযায় ইজরায়েলের মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেকটি নজির হলো,গাযার অধিবাসীদের ৪০%ই শিশু। গাযার প্রাপ্তবয়স্কদের একটি বড় অংশই ইজরায়েলের হামলায় শহিদ হয়ে গিয়েছে। তাই,গাযা হলো,পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জেলখানা। এখানে উল্লেখ করা যায়,আজ অবধি জাতিসংঘে ইজরায়েলের মানবতাবিরোধী অপরাধ তদন্তে যতগুলো চেষ্টা চালানো হয়েছে, তার সবগুলোতেই ভেটো দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।   তবে ফিলিস্তিনিরা অন্য ধাতুতে গড়া মানুষ। এজন্যই আল আকসা থেকে গাযা,কোথাও তারা থেমে নেই। হামাস নেতা খালেদ মিশাল বলেন,“ইজরায়েলিরা আমাদের নিয়মিত অনেক অর্থ ও সুবিধা দেয়ার কথা বলে। কিন্তু বিনিময়ে অস্ত্র ছেঁড়ে দিতে হবে। কিন্তু আমরা দেখেছি,ইয়াসার আরাফাত অস্ত্র ছাড়ার পর তার ভাগ্যে কি হয়েছিল?” গাযার ৯৮% মানুষ শিক্ষিত। তাদের একটি ভালোমানের বিশ্ববিদ্যালয় আছে। চারদিক থেকে ঘিরে রাখা ইজরায়েলিদের নাকে ডগা দিয়ে,হামাস যোদ্ধারা ঠিকই রকেট বানানোর মাল-মসলা যোগাড় করে,ইজরায়েলকে পালটা জবাব দিচ্ছে। এবারের যুদ্ধে আয়রন ডোমের ফাঁক গলে ঠিকই একটি দুটি রকেট ইজরায়েলের অভ্যন্তরে আঘাত হানছে। ইজরায়েলের হয়ত উন্নত যুদ্ধাস্ত্র আছে। হয়ত প্রতিবছর ফিলিস্তিনিরা একটু একটু করে তাদের ভূমি হারাচ্ছে। কিন্তু মৃত্যু যেখানে নিশ্চিত,শাহাদাত সেখানে আকাঙ্ক্ষিত,এই মর্মে ফিলিস্তিনিরা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে ও যাবে।  

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button