আন্তর্জাতিক

কেন ইজরায়েলকে এত সমর্থন দেয় আমেরিকা?

মার্কিন-যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল। এই দুটো দেশ,একে অপরের সাথে এমনভাবে জড়িত। সাধারণত কুটনৈতিক বিশ্লেষকরা মার্কিন-ইজরায়েলি-ব্রিটিশ লবিকে,জায়নিস্ট লবি বলে থাকে। এর পেছনে যৌক্তিক কারণও আছে। ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিতে ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল ব্রিটিশ ও মার্কিন সরকার। শুধু প্রতিষ্ঠা করেই ক্ষান্ত হয়নি। অবৈধ রাষ্ট্র ইজরায়েলকে টিকে থাকা ও ফিলিস্তিনিদের উপর আগ্রাসন চালাতে সরাসরি সহায়তা করছে মার্কিন সরকার। কিন্তু কেন এই সহায়তা?

এর পেছনে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কারণগুলো খুঁজে বের করার আগে,বিষয়টিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যাক। নৃতাত্বিকদের মত,শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান আর বর্তমানে ইজরায়েলে বসবাসরত আশকেনাজী ইহুদিদের মধ্যে একটা নৃতাত্বিক মিল রয়েছে। প্রথমত এই আশকেনাজী ইহুদিরা ২০০০ বছর আগে জেরুজালেমে বাস করা আসল ইহুদি নয়। বরং তাদের বেশিরভাগই ইউরোপ কিংবা ককেশাস অঞ্চলের মানুষদের সাথে মিশে একটি মিশ্র জাতিতে পরিণত হয়েছে। তারা ধর্মে ইহুদি কিন্তু সাংস্কৃতিকভাবে ইউরোপীয়। ৩০০ বছর আগে,ইউরোপ থেকে আসা শ্বেতাঙ্গরা যেভাবে স্থানীয় ইন্ডিয়ানদের মেরে,তাদের ভূমি দখল করে আজকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। তেমনি এসব ইউরোপিয় আশকেনাজী ও খাজার ইহুদিরা,ফিলিস্তিনি এসে জাতিগত নিধনের মাধ্যমে ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। ফলে মার্কিন জনসাধারণ ও ইজরায়েলের মধ্যে একটি  আত্মিক সম্পর্ক আছে।

ইজরায়েলের সমর্থনে মিছিলরত মার্কিনিরা

এর বাইরে বাকি সব কারণই রাজনৈতিক। মূলত তেল সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি পশ্চিমের লোভ সবসময়। বিপুল এই প্রাকৃতিক সম্পদ নিজেদের হস্তগত করতে তাদের কৌশলি হতে হয়েছে। তারা কখনই একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্য চায় না। যার  প্রথম ধাপ হিসেবে,ব্রিটেন ও ফ্রান্স প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর,মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে এমনভাবে ভাগ করেছিল। যাতে আরবদের বিভিন্ন গোত্র ও উপজাতিদের মধ্যে সবসময়স সংঘাত লেগে থাকে। ইতিহাসে যা,সাইকস-পিকট চুক্তি নামে কুখ্যাত। ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বহু আগ থেকেই,জায়নিস্ট বাঁ ইহুদীবাদিরা ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য কাজ করছিল। তখন তাদের মূল কেন্দ্র ছিল ব্রিটেন। তবে আটলান্টিকের অপরপ্রান্তেও তাদের শক্তিশালী সমর্থন ছিল। রথচাইল্ড,রকফেলার কিংবা বেনগুরিয়ানের মত শিল্পপতি ও ব্যাংকাররা ইহুদিদের জন্য লবি চালাত। যা এখনও বিদ্যমান। তাদের প্রতিষ্ঠিত ‘জিউইশ এজেন্সি’ এখনও বিশ্বব্যাপি ইজরায়েলি লবিগুলোর কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। যার হেডকোয়ার্টার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।

ইহুদি মিডিয়া,হলিউড,লবিস্ট ফার্মগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বব্যাপি ইজরায়েলের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে। যাই হোক,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইজরায়েলি বর্বরতার বিষয় নগ্ন সমর্থনের পেছনে প্রত্যক্ষ কারণ হিসেবে।নিচের কারণগুলোর কথা বলা যায়-

১। লেবানন,জর্ডান ও ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদীদের উত্থান ঠেকানো। কৌশলগত দিকে দিয়ে যা মার্কিন স্বার্থের জন্য জরুরি।

২। মধ্যপ্রাচ্যে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন বাঁ বর্তমান রাশিয়ার একমাত্র মিত্র সিরিয়াকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। পুরো মধ্যপ্রাচ্যে  একমাত্র সিরিয়াতেই রুশ সামরিক ঘাঁটি আছে।

৩। তেল সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করা। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান হাতিয়ার ইজরায়েলের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ।

৪। ইজরায়েলের সাথে গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তি আদান প্রদান করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই ইজরায়েলের মাধ্যমে তাদের অনেক নতুন সামরিক প্রযুক্তি ‘কমবেট টেস্ট’ সম্পন্ন করে।

৫। মধ্যপ্রাচ্যে নিজের অস্ত্র বাজার চাঙ্গা রাখা।

৬। যেসব দেশ বা সন্ত্রাসী সংগঠনের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজে সম্পর্ক রাখতে পারে না। ইজরায়েলকে সেখানে মধ্যস্তাকারী হিসেবে রাখা।

৭।স্নায়ুযুদ্ধের সময় ইজরায়েলের পরমাণু অস্ত্র ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রিজার্ভ ইউনিটের মত। কারণ,ইজরায়েলের পরমাণু অস্ত্রের নাগাল সোভিয়েত ইউনিয়ন পর্যন্ত ছিল।

৮। মধ্যপ্রাচ্যে দুটি দেশ তাদের শত্রু দেশগুলোর বিরুদ্ধে একসাথে কাজ করা। যেমন,ইরানের ক্ষেত্রে মার্কিন ও ইজরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা একই সাথে কাজ করে থাকে।  

এর বাইরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্যও ইজরায়েল একটি গুরত্বপূর্ণ নিয়ামক। ইহুদি লবির সমর্থন ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে টিকে থাকা একরকম অসম্ভব। দলমত নির্বিশেষে তাই ইজরায়েলকে সমর্থন দিয়ে আসছে তারা। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের ইভ্যাঞ্জিলিক্যাল খ্রিষ্টানরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইজরায়েলের অন্যতম বড় লবি হিসেবে ধরা হয়। এই ইভ্যাঞ্জিলিক্যালরা প্রতিবছর বেশ বড় অঙ্কের অর্থ পাঠায়। ইভ্যাঞ্জিলিক্যালদের অনেকেই ইজরায়েলি সামরিক বাহিনীতে গোপন কাজ করে। ২০১১’তে একটি রুশ টিভির অনুসন্ধানে ফিলিস্তিনে যুদ্ধপরাধের পেছনে মার্কিন নাগরিকদের জড়িত থাকার বিষয়টি উঠে আসলে,ইভ্যাঞ্জিলিক্যালদের ইজরায়েলের সামরিক বাহিনীতে কাজ করার বিষয়টি বেরিয়ে আসে। তবে এর পেছনের কারণটা বেশ অদ্ভুত। ইভ্যাঞ্জিলিক্যাল খ্রিস্টানদের বিশ্বাস, যতদিন না পর্যন্ত পুরো ইজরায়েল ইহুদিদের অধিকারে না আসবে।ততদিন পর্যন্ত যীশু খ্রিস্ট পৃথিবীতে ফিরে আসবেন না। তাই, ইভ্যাঞ্জিলিক্যালরা ফিলিস্তিনি ভূমি দখলের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে প্রচুর প্রচারণা চালায়।

জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর অনুষ্ঠানে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু

এছাড়া মার্কিন ডানপন্থি ও উগ্র ডানপন্থি সংগঠনগুলো ইজরায়েলকে জোর সমর্থন দেয়। মার্কিন সমাজে ও সংস্কৃতি আরব,মুসলিমদের প্রতি মিশে থাকা বর্ণবাদ,মার্কিন জনগনকে ইজরায়েলের দিকে ঠেলে দেয়। প্রতিবছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইজরায়েলকে কয়েক বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দেয়। ইজরায়েলকে নিয়মিত সামরিক প্রযুক্তি সহায়তা দেয়া। যার ফলে ইজরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী বিমানবাহিনীর মালিক। তবে এর বিনিময়ে ইজরায়েল নিয়মিত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থের জন্য বিমান হামলা চালায়। আসলে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার স্বার্থ হাসিলের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হল ইজরায়েল। যার কারণে ইজরায়েলে সকল অন্যায় ও যুদ্ধাপরাধ চোখ বুঝে সমর্থন করে আমেরিকা। জাতিসংঘে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে আনা যুদ্ধাপরাধসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে আনা প্রতিটি রেজুল্যুশনের বিরুদ্ধে ভেটো দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এবং সর্বশেষ ট্রাম্প প্রশাসনের সময়, ইজরায়েলের হাতে জেরুজালেমের মালিকানা তুলে দিয়েছে তারা। তাই, ফিলিস্তিন ইস্যতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে নিরপেক্ষ থাকার কথা বলে। তা ভন্ডামি ছাড়া কিছুই না।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button