আন্তর্জাতিকসাম্প্রতিক

নিম্নবিত্ত পরিবারের মমতা কিভাবে আজ ভারতের বাঘা এক রাজনীতিবিদ

ভারতের রাজনীতির ময়দান কাপিয়ে আবারো পশ্চিমবঙ্গের রাজসিংহাসনে আরোহণ করলেন “বাংলার ঘরের মেয়ে” নামেই অধিক পরিচিত মমতা ব্যানার্জি । 

পায়ে আঘাত পাওয়া হুইলচেয়ারে বসা এই বিদ্রোহী মহিলা আবারো ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতাশালী বিজেপিকে বিপুল ব্যবধানে হারিয়ে বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভ করলেন। 

নির্বাচনটি পুরো দেশেরই নজড় কেড়ে নিয়েছিল। কেন্দ্রীয় ক্ষমতাসীন বিজেপিও তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল এ রাজ্যের গদিতে বসতে। নির্বাচন জয়ের আসায় মোদি,অমিত শাহকে বেশ কয়েকবার রাজ্যটিতে ভ্রমণও করতে দেখা যায়। 

এত চেষ্টার পরও মমতার রাজনৈতিক মারপ্যাচে আবারো কাটা পড়ল বিজেপি। 

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে পশ্চিমবঙ্গের নিম্নবিত্ত এক খেটে খাওয়া পরিবার থেকে উঠে আসা মমতা কিভাবে ভারতের মত একটি দেশের এতটা প্রভাবশালী রাজনীতিবীদ হয়ে উঠতে পারলেন? কি তার সাফল্যের উৎস? 

ব্যাক্তিত্যে সম্মোহনী নেতৃত্ব ধারণ করা মমতা ১৯৭০ এ ছাত্রজীবন থেকেই কংগ্রেসের এক সাধারণ কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। 

রাজনৈতিক জীবনের শুরু হতেই তিনি ছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর একজন অনুরাগী এবং সেকালের প্রভাবশালী সিনিয়র কংগ্রেস নেতা প্রণব মুখার্জীর রাজনৈতিক শিষ্য, যেই প্রণব মুখার্জী আগে যেয়ে ভারতের রাষ্ট্রপতিও হয়েছিলেন। 

১৯৫৫ সালের ৫ই জানুয়ারী পশ্চিমবঙ্গের এক সাদাসিদে নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করা মমতার পিতা ছিলেন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগের একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী। 

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে এম.এ এবং যোগেশচন্দ্র কলেজ হতে আইন বিষয়ে ডিগ্রি নেবার পর মমতার পেশা হয়ে উঠেছিল স্কুল শিক্ষকতা। রাজনৈতিক চর্চা তার ছাত্রজীবন হতেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। 

বাংলার একেবারে নিম্নবিত্ত শ্রেণী হতে উঠে আসার কারণে তিনি শুরু থেকেই মানুষের দুঃখ, কষ্ট, সেন্টিমেন্ট সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান রাখতেন, যা তাকে ভবিষ্যতে রাজনীতির মাঠেও বেশ সহায়তা করেছে। 

১৯৭৬ সালে মাত্র একুশ বছর বয়সেই তিনি পশ্চিমবঙ্গ মহিলা কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক মনোনিত হন৷ কয়েক বছর পরই তিনি নিখিল ভারত যুব কংগ্রেসেরও সাধারণ সম্পাদক হয়ে যান। 

কর্মঠ রাজনৈতিক কর্মী মমতা তার রাজনৈতিক দূরদর্শীতার কারণে যুব অবস্থা হতেই কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের নজরে আসতে শুরু করেছিলেন। 

তার রাজনৈতিক জীবনে বেশ কিছু টার্নিং পয়েন্ট থাকলেও পুরো ভারতের মনোযোগ তিনি নিজের দিকে প্রথম কেড়ে নিতে পেরেছিলেন যখন ১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রবীন রাজনীতিবিদ বামদলীয় সোমনাথ চ্যাটার্জিকে হারিয়ে তিনি ভারতের অন্যতম সর্বকনিষ্ঠ পার্লামেন্ট সদস্য হয়েছিলেন। 

তার কংগ্রেস জীবনে তিনি বরাবরই পত্রিকার হেডলাইন হয়ে থেকেছেন তার নানা অদ্ভূত কর্মকান্ডের কারণে । তাকে তার রাজনৈতিক জীবনে পার্লামেন্ট ভবনে পেট্রোলিয়ামের মূল্য বৃদ্ধির বিরুদ্ধে  প্রতিবাদ করতে দেখা গিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের প্রতি বঞ্চনার প্রতিবাদ জানানোর জের ধরে পার্লামেন্টে রেল মন্ত্রীর দিকে শাল ছুড়ে মারার মত কান্ড করতে দেখা গিয়েছে, কোন এক কারণ বশত এক এমপির সাথে হাতাহাতির মত কাজও করতে দেখা গিয়েছে। 

ব্যাক্তিতে অসাধারণ শক্তিশালী এ রাজনীতিবিদ ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস হতে বেরিয়ে গঠণ করেন তৃণমূল কংগ্রেস নামক এক সংগঠন। সংগঠন হিসেবে তৃণমূল বেশ অগোছাল হলেও শুধুমাত্র এক মমতার শক্তিতেই বারংবার পশ্চিমবঙ্গের সিংহাসনে বসে যাচ্ছে দলটি। 

 ব্যাক্তিগত জীবনে সারাটি জীবন অবিবাহিত হিসেবেই কাটিয়ে দেয়া মমতা ২০০৫ সনে কৃষিজমি বরাদ্দ নিয়ে কৃষকদের পক্ষ নিয়ে এক গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার পর হতেই বনে যান পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বিরোধী দল। 

২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বামফ্রন্টের চাইতে বেশি আসন পায় তৃণমূল।

আর তার দু’বছর পরেই বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের সাথে জোট বেঁধে মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল দল ওই রাজ্যে ৩৪ বছর ধরে ক্ষমতাসীন থাকা বামফ্রন্টকে হারায়।

মমতা ব্যানার্জি হন পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী। এরপর হতে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয় নি মমতাকে। ২০১১ এর পর ১৬ ও ২১ এর বিধানসভা নির্বাচনেও পশ্চিমবঙ্গের গদি ধরে রাখতে সক্ষম হলেন মমতা। 

২১ এর বিধানসভা নির্বাচনে মমতার বিপুল ভোটে জয় এর পর হতে অনেকেই আবার এটাও বলে বসছেন কেন্দ্রে মোদির বিরুদ্ধে হয়ত এবার লড়তে যাচ্ছেন মমতা৷ 

ভারতের মত একটি দেশে এতটা সাফল্যমণ্ডিত রাজনীতিবিদ হওয়ার পিছনে অনেক বিশ্লেষকই তার ক্যারিশম্যাটিক ব্যাক্তিত্বকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে থাকেন। এছাড়াও জনতার জন্য কাজ করার ইচ্ছা, তাদের জন্য করার মানসিকতা, বাংলার একেবারে খেটে খাওয়া শ্রেণি থেকে উত্থান হওয়ায় সে দেশটির বেশিরভাগ মানুষই তাকে নিজেদের আপন মানুষ ভেবে থাকেন৷ 

এখনোকদি পশ্চিমবঙ্গের সর্বেসর্বা দিদি তার দেশের মানুষের জন্য ঠিক কতটা মঙ্গল বয়ে আনতে পারেন সামনের দিনগুলোতে তাই দেখার বিষয়। 

মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ খাঁন(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

আরো পড়ুন;

রহস্যময় হুনজা উপজাতি; https://cutt.ly/9vRivC6

Show More

MK Muhib

A researcher,An analyst,A writer,A social media activist,student at University of dhaka.

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button