প্রযুক্তি

বিটকয়েনঃ মানবজাতির ভবিষ্যত বদলে দিতে চলেছে যে মুদ্রা

সাতোশি নাকামাতো? নামটা অচেনা মনে হচ্ছে? ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসের আগে,এই নামটা সবার কাছে অপরিচিতই ছিল। তবে একটি ঘটনা এই নামটিকে সবার কাছে পরিচিত করে দেয়। এটি এমন একটি ঘটনা যা হয়ত একদিন মানবজাতির ইতিহাসের একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

ডিজিটাল কারেন্সির ধারণাটা প্রথম আসে ১৯৮৩ সালে। তারপর ১৯৮৯ সালে এই বিষয়ে একটি ডাচ প্রতিষ্ঠান গবেষণাপত্র লেখে। ১৯৯৮ সালে প্রথমবারের মত ই-গোল্ড নামে একটি ডিজিটাল কারেন্সি বাজারে আসে।তবে তা বেশিদিন টেকেনি। তবে ২০০৯ সালে প্রথমবারের মত বাজারে আসে বিটকয়েন। বিটকয়েনের আগমন মূলত,২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার পর। শতশত মানুষ তখন রাতারাতি পথের ফকিরে পরিণত হয়।ব্যাংকগুলোর বিপদজনক ব্যাংকিং কার্যক্রম যার পেছনে দায়ী ছিল। স্বাভাবিক ভাবেই লোকের ব্যাংকিং ব্যবস্থার উপর আস্থা উঠে যায়। বিটকয়েনের উৎপত্তি সেখান থেকেই। বিটকয়েন তার পূর্বসুরীদের থেকে বেশ আলাদা।এটি একটি ওপেন সোর্স সফটওয়্যার। যা চাইলে যে কেউ নামিয়ে ইন্সটল করতে পারে। এতে কোন ব্যাংক বা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান নেই। সরাসরি বা পিয়ার টু পিয়ারের ভিত্তিতে বিটকয়েন কাজ করে। লেনদেনগুলো একটি সুনির্দিষ্ট নেটওয়ার্ক নোডের মধ্য দিয়ে একটি পাবলিক খতিয়ানে  লিপিবদ্ধ হয়। যাকে বলা হয়, ব্লকচেইন। এই পুরো প্রক্রিয়াটি ক্রিপ্টোগ্রাফির মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ায় বিটকয়েনের লেনদনকারী পক্ষদের পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন থাকে। এজন্য একে ক্রিপ্টোকারেন্সিও বলা হয়।  

সাতোশি নাকামাতো

একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যাক,ধরা যাক, দু’জন ব্যাক্তি ক আর খ, তাদের মধ্যে ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করবেন।স্বাভাবিক ভাবে, ব্যাংক তাদের আদেশ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ফি’র বিনিময়ে ক/খ এর ব্যাংক একাউন্টে অর্থ যোগ-বিয়োগ করবে। বিটকয়েনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল,এখানে কোন ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। ক ও খ সরাসরি তাদের একাউন্টের মাধ্যমে লেনদেন করতে পারবে। কিভাবে? প্রতিটি বিটকয়েন ব্যবহারকারীর ডিজিটাল ওয়ালেটে,দুটো ‘কী’ থাকে। একটি হলো,পাবলিক কী আর অপরটি প্রাইভেট কী। ধরুন ক আর খ এর মধ্যে লেনদেন হচ্ছে। ক প্রথমে তার একাউন্ট থেকে বিটকয়েন নিয়ে খ এর পাবলিক কী’তে পাঠাবে। ক এই প্রক্রিয়ায় তার প্রাইভেট কী এর মাধ্যমে লেনদেনটি এনক্রিপ্ট করে নিবে।যাতে কেউ ট্র্যাক করতে না পারে। খ তার পাবলিক কী থেকে ডিক্রিপশনের মাধ্যমে তার প্রাইভেট কী’তে বিটকয়েন গ্রহণ করবে। এতে করে সবার পরিচয় গোপন থাকবে। তবে এই পুরো প্রক্রিয়ায় ব্যাংকের বদলে মধ্যস্তাকারী হিসেবে থাকে, অসংখ্য কম্পিউটার দ্বারা বিস্তৃত একদল সার্ভার। সেই সার্ভারগুলো একধরনের ইলেকট্রনিক খতিয়ান। যাতে প্রতিনিয়ত বিশ্বজুড়ে হতে থাকা বিটকয়েনের লেনদেনগুলো সর্বদা আপডেট হতে থাকে। প্রতিটি বিটকয়েন গ্রাহকের কাছেই এই খতিয়ানের একটি কপি থাকে। ফলে এতে প্রতারণার ঝুঁকি কমে যায়। তবে একই সাথে সবাই এটাও জেনে যায় কার কাছে কত বিটকয়েন আছে। এই ডিজিটাল খতিয়ানটিকে বলা হয়,ব্লকচেইন।

ব্লকচেইন যেভাবে কাজ করে

এবার আসা যাক,বিটকয়েন মাইনিং নিয়ে। বিটকয়েন সম্পর্কে জানতে গেলে সবার আগে,বিটকয়েন মাইনিং শব্দটা চলে আসে। মাইনিং বলতে একটা সময় শুধু সোনা খোঁজা বোঝাত। বিটকয়েন মাইনিং অনেকটা সোনা খোঁজার মতই। তবে এটা ডিজিটাল সোনা। একটু আগেই,ব্লকচেইনের কথা বললাম। বাস্তব জীবনে আপনি যদি কারো সাথে লেনদেন করেন। তবে আপনি মুদ্রা বিনিময় করেন। আপনার হাতের নগদ অর্থ আরেকজনের হাতে চলে যায়। তবে যেহেতু বিটকয়েন ডিজিটাল মুদ্রা। তাই চাইলেই একজন ব্যবহারকারী আসল মুদ্রা নিজের কাছে রেখে,তা নকল করে আরেকজনকে দিয়ে দিতে পারেন। এখানেই মাইনারদের আগমন। মাইনারদের কাজ লেনদেনকারীদের মধ্যে হওয়া বিটকয়েনের বিনিময় সঠিকভাবে ব্লকচেইনে অর্ন্তভুক্ত করা। বা বলা যায়,প্রতিটি লেনদেন ভেরিফাই করে,তা ব্লকচেইনে আপডেট করা। এটি বেশ শ্রমসাধ্য একটি কাজ। তবে,এর বিনিময়ে মাইনাররা পুরষ্কার হিসেবে বিটকয়েন পান। প্রতি ২,১০,০০ ব্লক পুরণ করতে পারলে বর্তমানে একজন মাইনার পান ৬.২৫ বিটকয়েন। যা শুরুতে ছিল ৫০ এরপর হয়ে যায় ২৫। এভাবে কমতে কমতে আজকের জায়গায় এসেছে। ২১৪০’র পর আর কোন নতুন বিটকয়েন তৈরি হবে না। তখন ব্যবহারকারীরা মাইনারদের নির্দিষ্ট ফি/পুরষ্কার দিবেন। বর্তমানে বিটকয়েন মাইনিং এক বিশাল কর্মযজ্ঞে পরিণত হয়েছে। শতশত বিটকয়েন মাইনিং ফার্ম, মাইলের পর মাইল জুড়ে শক্তিশালি কম্পিউটার বসিয়ে বিটকয়েন মাইনিং করছে।

বিশাল এলাকা জুড়ে বানানো মাইনিং ফার্ম

আবার সাতোশি নাকামাতোর কাছে ফিরে আসা  যাক। সাতোশি নাকামাতো নামে একজন লোক সত্যিই আছে। তবে তিনিই বিটকয়েনের জনক কি না,তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আবার আরেকদল লোক মনে করে,সাতোশি নাকামাতো কোন একক ব্যাক্তি নন। যেসব প্রোগ্রামাররা মিলে বিট কয়েন ডিজাইন করেছেন,তারা এই ছদ্মনাম ব্যবহার করেন। এই তালিকায় সাতোশি নাকামাতোর পাশাপাশি আরো ৩ জন প্রোগ্রামার আছেন। তার হলেন,হ্যাল ফ্যানি। নাকামাতোর পর,তিনিই প্রথম বিটকয়েন ব্যবহার করেন। এর বিভিন্ন ত্রুটি,বাগ ফাইল তিনিই মেরামত করেন। অবশ্য তার বাড়ি থেকে মাত্র দু’ব্লক দূরেই নাকামাতোর বাড়ি। এর বাইরে আছেন,আরেকজন প্রোগ্রামার, নিক জাবো। অবশ্য নিক নিজেই বলেছেন,তিনি,ফ্যানি,ওয়েই দেই ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তবে নাকামাতো একে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। বর্তমানে বিটকয়েনে একটি ভিন্নমাত্রার বস্তু। প্রতিদিনই সংবাদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে এটি। ধনকুবের জেফ বেজোস,বিল গেটস থেকে শুরু করে এলন মাস্ক,সবাই বিটকয়েনে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছেন। লক্ষ লক্ষ মানুষ বিটকয়েন নিয়ে দিন-রাত অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করছেন। সবাই একে ভবিষ্যতের মুদ্রা,অর্থনীতির ধারক-বাহক বলছেন।তবে বিটকয়েন নিয়ে এই মাতামাতি কতদিন চলে,তা ভবিষ্যতই বলে দেবে।   

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button