আন্তর্জাতিকইতিহাসজানা-অজানা

রহস্যময় হুনজা উপজাতি

বর্তমান বিশ্বে যেখানে যৌবন ধরে রাখতে,বার্ধক্য ঠেকিয়ে রাখতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে যাচ্ছে মানুষরা সেখানে পাকিস্তানের একটি উপজাতি রয়েছে যারা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ভাবেই তাদের যৌবন কে ধরে রাখতে পারেন। বয়সের তুলনায় এ উপজাতির মানুষদের কম বয়সী দেখা যায়৷ 

যেখানে তাবৎ পৃথিবীর মানুষ এখন ৮০ বছর বয়স পেরুতে কষ্ট হয়ে যায় সেখানে এ উপজাতির মানুষদের ১৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত বাঁচার রেকর্ড রয়েছে। এ উপজাতির একজন ৯০ বছরের বৃদ্ধও বাবা হওয়ার ক্ষমতা রাখেন, এমনকি একজন ৭০ বছরের মহিলাও অনায়াসে গর্ভবতী হন ও বাচ্চা প্রসব করেন। 

বলছি পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের গিলগিট-বালতিস্তান প্রদেশে বসবাসরত রহস্যময়  হুনজা উপজাতির কথা । কারাকোরাম, পশ্চিম হিমালয়, পামির ও হিন্দকুশ পর্বতমালা দিয়ে ঘেরা ছবির মত সুন্দর এ প্রদেশের উত্তরেই আছে হুনজা উপত্যকা। পৃথিবী থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন এ হুনজা উপত্যকতেই বাস করে রহস্যময় হুনজা বা বুরশো নামের এ উপজাতিটি। 

যে জনগোষ্ঠীর মানুষজনকে অমর না বলা গেলেও চিরযৌবনা ত নির্ঘাত বলে ফেলাই যায়। শুনতে অদ্ভূত শোনালেও হুনজারা নাকি মৃত্যুর কোলকে প্রতিবারই ফাঁকি দিয়ে অনায়াসেই জীবনের শতক পূরণ করে ফেলতে পারে। 

যেখানে সারা পাকিস্তানের গড় আয়ু ৬৭, সেখানে হুনজাদের গড়  আয়ু নাকি ১২০ বছর! হুনজা উপত্যকাতে এরচেয়েও অধিক আয়ুর মানুষের অবশ্য কমতি নেই। বিশ্বে সর্বাধিক গড় আয়ু ধারী জাপান হলেও হুনজারা তাদের প্রতিনিয়তই লবডঙ্কা দেখিয়ে যাচ্ছেন বলা চলে। হুনজা উপত্যকাতে প্রায় সাতাষি হাজার মানুষের বসবাস। ধর্মীয় দিক হতে এরা ইসলাম ধর্মের শিয়া সম্প্রদায় ভুক্ত নিজামী ইসমাঈলী মতবাদে বিশ্বাসী জাতি। কথা বলেন বুরুশাসকি ভাষায়৷ 

হুনজারা এত বছর কিভাবে বাচে! এ নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনা শুরু হয় মূলত ১৯৮৪ সাল হতে। ইংল্যান্ডের হিথরো বিমানবন্দরে পাকিস্তান হতে সৈয়দ আব্দুল মাবুদ নামক এক হুনজা আসেন। সেখানে পাসপোর্টে তার জন্ম তারিখ দেখে চমকে যান ইমিগ্রেশন অফিসাররা। 

পাসপোর্টে তার জন্ম সাল দেয়া ছিল ১৮৩২ সাল! সহজ হিসাব মিলিয়ে যখন তারা বুঝলো এ বৃদ্ধের বয়স ১৫২ বছর তখনই তাদের চক্ষু চড়ক গাছ হয়ে গিয়েছিল। এরপর ক্রমেই মিডিয়ার কল্যাণে বিশ্বব্যাপী এ বিষয়টি ছড়িয়ে যাওয়া শুরু করলে হুনজা উপত্যকায় দলে দলে গবেষকরা ভিড় জমাতে শুরু করে। 

এতকিছুর পরও সহজ যে প্রশ্নটি সবার মনে দাঁড়ায়, এতবছর আসলে বাঁচে কিভাবে এরা?  

এর  বেশকিছু ব্যাখ্যা বিজ্ঞানীরা দাড় করিয়েছেন, এ উপজাতি কোন কিছু নিয়েই দুঃশ্চিন্তা করে না। ডিপ্রেশন, মানসিক অবসাদ, চাপ এগুলো তাদের সহজাত প্রবৃত্তিতে নেই বললেই চলে। সব বয়সের নারী-পুরুষ হুনজারাই সুর্যোদয় হতে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পরিশ্রম করে কাটান। একজন ৮০ বছরের হুনজা বৃদ্ধের নিকটেও দৈনিক ১০-১৫ কিলোমিটার পাহাড়ি পথে হাটা দুধভাত। ৪০ কেজি শস্য বোঝাই বস্তা অনায়াসেই তারা ক্ষেত থেকে নিয়ে ফেরেন৷

 ১০০ বছর বয়সেও যথেষ্ট শক্ত সামর্থ্য থাকা  হুনজা পুরুষ ও নারীদের এত বছর বাচার মূল কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা দেখেন তাদের খাদ্যাভ্যাস কে।

 হুনজারা সারাদিনে মাত্র দু’বার খাবার খান। সূর্য উঠার পরে একটা ভারী ব্রেকফাস্ট ও সূর্যাস্তের পরে হালকা ডিনার। এই শেষ, এর মাঝে হুনজারা আর কোন খাবার খান না। 

তারা সবসময় প্রাকৃতিক খাবার খেয়ে থাকেন। প্রয়োজনীয় খাদ্য ও সবজি নিজেরাই উৎপাদন করে থাকেন। হুনজারা মাংস একেবারেই খান না, খেলেও বছরে এক দু’বার ভেড়া বা মুরগির মাংস খান। তারা মূলত বাদাম, ভুট্রা, বার্লি এ জাতীয় খাবার খান। তাদের অন্যতন প্রধান খাদ্য এপ্রিকট নামক এক ধরণের ফল, বিজ্ঞানীদের মতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি-১৭ সমৃদ্ধ এ ফলটি অধিক পরিমাণে খাওয়ার কারণেই বিশ্বের একমাত্র ক্যান্সার-টিউমার ফ্রি জাতি এই হুনজা উপজাতি। দূর্গম এলাকায় বসবাসের কারণে প্রতিদিনই এদেরকে ১০-১৫ কিলোমিটার হাটতে হয়। হাসি, ঠাট্রা এ উপজাতির জীবনের অন্যতম সঙ্গী। একজন বৃদ্ধও এখানে শিশুদের মতই জীবন যাপন করেন, জীবনের প্রতিটা মূহুর্ত উপভোগ করেন তারা। 

তাদের এতবছর বাচার কারণ যাইহোক না কেন, পৃথিবী তাদের এতবছর বাচার কারণ কে আতস কাঁচ দিয়ে ঝাকার চেষ্টা করতে থাকলেও এ নিয়ে তাদের কোন উদ্বেগই নেই। সেখানে আপনি গেলেও মুখে হয়ত এক অনিন্দ্য হাসি নিয়েই অভ্যর্থনা জানাতে প্রস্তুত থাকবে নির্মল হৃদয়ের এ মানুষগুলো। 

মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ খাঁন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

  • আরো পড়ুন;
  • সাবমেরিনের ভেতরকার রুদ্ধশ্বাস জীবন-
  • https://cutt.ly/hvRwMKo
Show More

MK Muhib

A researcher,An analyst,A writer,A social media activist,student at University of dhaka.

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also
Close
Back to top button