জীবনী

সারাহ বেগম কবরীঃ বাংলাদেশের সিনেমা জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

বিংশ শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকের বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় নায়িকা কবরী। তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শহুরে মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তরাও কবরীকে যতটা নিজেদের মানুষ হিসেবে ভাবতে পেরেছিলেন, ততটা হয়তো বাংলাদেশের সিনেমা জগতে অন্য কোনো অভিনেত্রীর ক্ষেত্রে পারেননি। শুধু  অভিনেত্রী ই নন; এর পাশাপাশি একজন পরিচালক, লেখক এবং রাজনীতিবিদ ছিলেন তিনি । 

জন্ম এবং পরিবার

১৯৫০ সালের ১৯ জুলাই, বোয়ালখালী চট্রগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কবরী। তার আসল নাম মীনা পাল। তার পিতার নাম শ্রীকৃষ্ণ পাল ও মাতার নাম শ্রীমতি লাবণ্য প্রভা পাল। 

খুব অল্প বয়সেই কবরী বিয়ে করেন চিত্ত চৌধুরীকে। তার সাথে সম্পর্ক বিচ্ছেদের পর ১৯৭৮ সালে তিনি পুনরায় ব্যবসায়ী শফিউদ্দিন সারওয়ার এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তখন কবরী সারওয়ার নামে পরিচিত পান তিনি।  ২০০৮ সালে, তাঁদেরও বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এরপর যখন রাজনীতিতে আসেন এবং সংসদ সদস্য হন, তখন থেকে তিনি সারাহ বেগম কবরী নামে পরিচিত পান। ব্যক্তিগত জীবনে পাঁচ সন্তানের জননী তিনি।

১৯৬৩ সালে, মাত্র ১৩ বছর বয়সে নৃত্যশিল্পী হিসেবে আগমন ঘটে কালজয়ী এ জনপ্রিয় নায়িকার।

চলচ্চিত্র জীবন

১৯৬৪ সালে, সুভাষ দত্তের পরিচালনায় ‘সুতরাং’ সিনেমায় নায়িকা হিসেবে সিনেমা জগতে অভিষেক ঘটে কবরীর। সেই চলচ্চিত্র টি বিপুল জনপ্রিয়তা পাওয়ায় আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি কবরী কে। 

চিত্রঃ ‘সুতরাং’ সিনেমার একটি দৃশ্য

এরপর ১৯৬৮ সালে, জহির রায়হানের নির্মিত উর্দু ছবি ‘বাহানা’, ‘সোয়ে নদীয়া জাগে পানি’ এবং লোককাহিনি নির্ভর ‘সাত ভাই চম্পা’ দিয়ে সফলতা অর্জন করেন তিনি।

১৯৬৮ সালে, ‘আবির্ভাব চলচ্চিত্র দিয়ে রাজ্জাকের সাথে তার জুটি গড়ে ওঠে। সত্তরের দশকে রাজ্জাক- কবরী জুটি তুমুল জনপ্রিয়তা এবং গ্রহণযোগ্যতা পায় দর্শকের কাছে। এ সম্পর্কে বাংলাদেশের একজন সিনেমা গবেষক অনুপম হায়াৎ বলেন, “১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়ে বা যুদ্ধ পরবর্তী উত্তাল সময়গুলোতে রাজ্জাক-কবরী জুটি তৎকালীন প্রেক্ষাপটে সমাজের সাধারণ মানুষের চিন্তাধারার প্রতিনিধিত্ব করতো এবং মানুষকে মানসিকভাবে স্বস্তি দিয়েছিল বলে এই জুটি মানুষের মধ্যে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে”।

চিত্রঃ জনপ্রিয় জুটি রাজ্জাক-কবরী

পরবর্তীতে অসংখ্য চলচ্চিত্রে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে অভিনয় করে গেছেন এই গুনী শিল্পী। কাজ করেছেন ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘ময়নামতি’, ‘ঢেউয়ের পর ঢেউ’, ‘রংবাজ’, ‘পরিচয়’, ‘অধিকার’, ‘সুজন সখী’, ‘সারেং বৌ’, ‘বেঈমান’, ‘অবাক পৃথিবী’, ‘সোনালী আকাশ’, ‘দীপ নেভে নাই’-এর মতো দর্শকপ্রিয় সিনেমাতে।

এছাড়াও অভিনয় করেছেন হীরামন, ময়নামতি, চোরাবালি, পারুলের সংসার, বিনিময়, আগন্তুক-সহ অসংখ্য সিনেমায়। পরবর্তীতে ভারতের চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্বিক ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সিনেমাতে ও অভিনয় করেছেন কবরী।

অভিনেতা হিসেবে মানুষের হৃদয়ের কাছে যেতে পারা, মানুষের ভালোবাসার পাত্র হতে পারাটাই কবরীর সবচেয়ে বড় অর্জন বলে মনে করেন কবরীর সামসময়িক অভিনয় শিল্পী মাসুদ পারভেজ, যিনি সোহেল রানা হিসেবেই বেশি পরিচিত।

কবরী সম্পর্কে মতামত দিতে গিয়ে চলচ্চিত্র সাংবাদিক মাহমুদা চৌধুরী বলন, “সিনেমার পর্দায় বাংলাদেশি সাধারণ মেয়ে হিসেবে কবরীকে যেভাবে দেখা যেত, বাস্তবের গ্রামীণ নারী বা শহুরে মধ্যবিত্তের ঘরের মেয়ের চরিত্রটা ঠিক সেরকম ছিল। অভিনয় শিল্পী হিসেবে নিজস্ব স্বকীয়তা ও সহজাত প্রবৃত্তি কবরীকে অন্যদের চেয়ে আলাদা অবস্থান দিয়েছে”। 

আর সেজন্যেই ‘মিষ্টি মেয়ে’ নামে দর্শকদের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন তিনি।

সিনেমায় অভিনয় ছাড়াও সিনেমা প্রযোজনা এবং পরিচালনার সাথে জড়িত ছিলেন কবরী। ২০০৬ সালে, তার পরিচালিত প্রথম সিনেমা ‘আয়না’ মুক্তি পায়। ইদানীং তিনি দ্বিতীয় সিনেমা ‘এই তুমি সেই তুমি’ নির্মাণ করছিলেন। 

অভিনয়ে, প্রযোজনায়, পরিচালনায় – তাঁর সাত দশকের জীবনটা যেন আশ্চর্য সফলতার গল্প।

পুরষ্কার এবং সম্মাননা 

১৯৭২ সালে, ‘লালন ফকির’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী বিভাগে বাচসাস পুরস্কার অর্জন করেন কবরী। ‘দ্বিতীয়োক্ত’ কাজের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও বাচসাস পুরস্কার অর্জন করেন। এছাড়া তিনি ‘সুজন সখী’ (১৯৭৫) ও ‘দুই জীবন’ (১৯৮৮) চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য আরও দুটি বাচসাস পুরস্কার সহ মোট ছয়টি বাচসাস পুরস্কার অর্জন করেন। 

তার অভিনীত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ও ‘সাত ভাই চম্পা’ চলচ্চিত্র দুটি ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট-এর সেরা দশ বাংলাদেশী চলচ্চিত্র তালিকায় যথাক্রমে প্রথম ও দশম স্থান লাভ করে।

তিনি চলচ্চিত্র ‘সারেং বৌ’ এ ক্যাপ্টেন ওয়াইফ এর চরিত্রে অভিনয়ের জন্য জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। এছাড়াও মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননাসহ বহু পুরস্কার ও সম্মাননা রয়েছে তার দখলে।

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা 

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি চলে যান কবরী। সেখান থেকে পাড়ি জমান ভারতে। কলকাতায় গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করতে বিভিন্ন সভা-সমিতি ও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেন কবরী। তখনকার স্মৃতি স্মরণ করে একবার কবরী বলেছিলেন, ‘সেখানকার এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের অবস্থার কথা তুলে ধরেছিলাম। কীভাবে আমি মা-বাবা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন সবাইকে ছেড়ে এক কাপড়ে পালিয়ে সেখানে পৌঁছেছি, সে কথা বলেছিলাম। সেখানে গিয়ে তাদের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের দেশকে সাহায্যের আবেদন করি।’

রাজনৈতিক জীবন 

চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন কবরী। ২০০৮ সালে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতিবিদ হিসেবে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০১৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন তিনি। 

অভিনয় ও সিনেমা পরিচালনার বাইরে লেখালেখিও করতেন তিনি। ২০১৭ সালে, অমর একুশে গ্রন্থমেলায় তার আত্মজীবনীমূলক বই ‘স্মৃতিটুকু থাক’ প্রকাশিত হয়।

মৃত্যু

২০২১ সালের ২ এপ্রিল, কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হন কবরী। ১৬ এপ্রিল, রাত ১২টা ২০মিনিটে রাজধানীর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে সারা দেশ জুড়ে।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button