জীবনী

রাসূল সা. এর জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী (পর্ব ২)

তরুণ বয়সে মুহাম্মদ সা. এর নির্দিষ্ট কোন কাজ বা পেশা ছিল না। তবে বিভিন্ন বর্ণনামতে তিনি সামান্যকিছু পারিশ্রমিকের বিনিময়ে বিভিন্ন গোত্রের বকরি চরাতেন। এরপর তিনি ব্যবসায়িক কাজে সিরিয়া, বসরা ও বাহরাইনে সফর করেন। তাঁর সততা ও বিশ্বস্ততায় সকলেই মুগ্ধ হত। তিনি কখনো মাপে কম দেয়া, পন্যে ভেজাল মিশ্রণ, পন্য নিয়ে মিথ্যাচার এ কাজ গুলো করতেন না। তাঁর বিশ্বস্ততা এবং আমানতদারীতায় মুগ্ধ হয়ে তাঁর আশেপাশের মানুষগুলো তাঁকে আল আমিন তথা বিশ্বস্ত উপাধিতে ভূষিত করেছিলো।

ধীরে ধীরে মুহাম্মদ সা. এর সততা ও ব্যবসায়িক দূরদর্শিতার খবর পেলেন ততকালীন আরবের অভিজাত, ধনবতী মহিলা খাদিজা বিনতে খোয়াইলিদ। তিনি মুহাম্মদ সা. কে নিজের ব্যবসার কাজে জড়িত হওয়ার অনুরোধ করেন। পাশাপাশি এটাও বলেন অন্যদের চেয়ে মুহাম্মদের পারিশ্রমিক হবে দ্বিগুণ। মুহাম্মদ সা. খাদিজার প্রস্তাবে রাজি হলেন। রাসূল সা. খাদিজার কৃতদাস মাইছারাকে সাথে নিয়ে ব্যবসায়িক পন্য নিয়ে সিরিয়া গমণ করলেন।

সিরিয়া থেকে আসার পর খাদিজা লক্ষ্য করলেন অতীতের তুলনায় লাভের পরিমাণ অনেক বেশি৷ তাছাড়া মাইছারার মুখে মুহাম্মাদের সততা ও ন্যায়পরায়ণতার ভূয়সী প্রশংশা শুনে খাদিজা অভিভূত হন। রাসূল সা. এর ব্যবসায়ের সফলতা দেখে তিনি তার যোগ্যতা সম্বন্ধেও অবহিত হন। এক পর্যায়ে খাদিজা মুহাম্মদ সা. কে বিবাহ করার প্রস্তাব দেন। ইতিপূর্বে মক্কার অনেক সম্ভ্রান্ত ও ধনাঢ্য ব্যক্তিরা খাদিজাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে খাদিজা তা নাকচ করে দেন। রাসূল সা. চাচার অনুমতি নেন এবং উভয়ের সম্মতিতে দুজনের বিবাহ সম্পন্ন হয়৷ নবীজি সা. মোহরানা হিসেবে বিবি খাদিজাকে ২০ টি উট দিয়েছিলেন। তখন খাদিজার বয়স ছিল ৪০ এবং মুহাম্মদ সা. এর ২৫। ইবরাহীম ব্যতিত রাসূল সা. এর সব সন্তানই বিবি খাদিজার গর্ভজাত।

রাসূল সা. ৩৫ বছরে উপনীত হলে পবিত্র কাবাঘর পুননির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। নির্মাণের পর অনেক সময় কেটে যাওয়া, পুরাতন হওয়ায় দেয়ালে ফাটল ধরা, মহাপ্লাবন সহ আরো নানা কারণে কুরাইশরা এর সংস্কারকার্যে হাত দেন। সব কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর হাজরে আসওয়াদ পাথর স্থাপনের সময় বিভিন্ন গোত্রপতিদের মাঝে কোন্দল শুরু হয়। সব গোত্রই বলছে যে আমরা হাজরে আসওয়াদ পাথর স্থাপন করবো। ৪-৫ দিন যাবত এ বিষয়ে ঝগড়া চলতে থাকলো এবং তা খুন খারাবির দিকে রুপ নেয়ার উপক্রম হলো। আবু উমাইয়া মাখযুমি নামের এক ব্যক্তি একটা প্রস্তাব রাখলেন যে আগামীকাল ভোরে যিনি মসজিদে হারামের দরজা দিয়ে প্রথম প্রবেশ করবেন তিনিই এর ফয়সালা করবেন। রাসূল সা.ই সবার আগে প্রবেশ করলেন এবং তিনি বিচারক নিযুক্ত হলেন। রাসূল সা. একটি চাদর বিছিয়ে ঐ পাথরটি চাদরে রাখলেন এবং গোত্রপতিদের সকলকে বললেন চাদরের বিভিন্ন অংশে ধরে পাথরটি যথাস্থানে নিয়ে যেতে। তাঁরা পাথরটি যথাস্থানে নিয়ে গেলে রাসূল সা. নিজ হাতে পাথরটি সেখানে স্থাপন করলেন। এতে সকল গোত্রই খুশি ছিলো।

কাবাঘর নির্মাণের পর একদা রাসূল সা. হযরত আব্বাস রা. এর সাথে পাথর ভাঙছিলেন। একপর্যায়ে হযরত আব্বাস রাসূল সা. কে বললেন তহবন্দ খুলে কাঁধে রাখো, ধুলোবালি থেকে রক্ষা পাবে। তিনি তহবন্দ খোলার সাথে সাথে মাটিতে পড়ে গেলেন। তারপর আকাশের দিকে তাকালেন এবং বেহুশ হয়ে গেলেন। খানিক পরে হুঁশ ফিরলে তিনি বলতে থাকেন আমার তহবন্দ, আমার তহবন্দ। এরপর তাঁর তহবন্দ তাঁকে পরিয়ে দেয়া হয়। এ ঘটনার পর আর কখনো রাসূল সা. এর লজ্জাস্থান দেখা যায়নি।

রাসূল সা. এর বয়স যখন চল্লিশ ছুঁইছুঁই, তখন থেকেই স্বজাতিদের সাথে তার মানসিক ও চিন্তার দূরত্ব বেড়ে যেতে লাগলো। মক্কা থেকে দুই মাইল দূরে হেরা পর্বতের গুহায় তিনি একান্ত নির্জনে সময় কাটাতে লাগলেন। পুরো রমজান মাস তিনি ঐ গুহাতে কাটাতেন। মাঝেমধ্যে বিবি খাদিজা সেখানে খাবার নিয়ে যেতেন। রাসূল সা. এই নির্জনতায় কখনো কখনো টানা একমাস ধ্যানমগ্ন থাকতেন।

রাসূল সা. এর বয়স যখন ৪০ বছর ৬ মাস ১২ দিন এমতাবস্থায় আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন জিবরাইলের মাধ্যমে তাঁর নিকট ওহী প্রেরণ করেন। জিবরাইল আ. রাসূল সা. এর কাছে এসে বললেন পড়ো। তিনি বললেন আমি তো পড়তে জানি না।
জিবরাইল আ. তাঁকে বুকে জড়িয়ে জোরে চাপ দিলেন। রাসূল সা. বলেন মনে হচ্ছিলো আমার সব শক্তি নিংড়ে নেয়া হয়েছিলো। ফেরেশতা জিবরাইল আবার বললেন পড়ো। তিনি বললেন আমি পড়তে জানি না। জিবরাইল আবার তাঁকে বুকে জড়িয়ে চাপ দিলেন এবং তৃতীয় বার বললেন ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাজি খালাক। পড়ো তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমায় সৃষ্টি করেছেন। এবার রাসূল সা. জিবরাইলের সাথে পড়লেন। ঘরে ফিরে তিনি খাদিজাকে বললেন আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত করে দাও। আমার নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কা হচ্ছে। বিবি খাদিজা তাঁকে সাহস জোগালেন। তিনি নবীজি সা. কে বললেন আল্লাহ আপনাকে অপমান করবেন না।

পরবর্তীতে এ ঘটনা খাদিজার চাচা ওয়ারাকা বিন নাওফালের কাছে বললে তিনি তাদের নিশ্চিত করেন যে ঐ লোকটি ছিল ওহী নিয়ে আগমনকারী ফেরেশতা জিবরাইল। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন আপনাকে নবুয়ত দিয়েছেন। এরপর রাসূল সা. এর ভয় কেটে গেলো।

তারপর দীর্ঘদিন আর কোন ওহী আসেনি। তিনি আবারও চিন্তায় পড়ে গেলেন। অনেকবার তিনি পাহাড়ের চূড়ায় উঠেছিলেন নিচে লাফিয়ে পড়ার জন্য। কিন্তু কোত্থেকে যেন আওয়াজ আসত হে মুহাম্মদ আপনি আল্লাহর রাসূল। তিনি থমকে যেতেন। অনেক প্রতীক্ষার পর জিবরাইল আ. আবার ওহী নিয়ে আসলেন। রাসূল সা. এর সকল ঘোর ও ভয় কেটে গেলো। তিনি অবগত হলেন যে আল্লাহ তাঁকে পয়গম্বর বানিয়েছেন।

মমক্কাবাসীদের মাঝে যাতে হঠাৎ কোন কোলাহল তৈরি না হয় সেজন্য রাসূল সা. শুরুর দিকে গোপনে ইসলামের প্রসার ও দাওয়াতের কাজ চালানো শুরু করেন। প্রথমেই তিনি নিজ আত্মীয় স্বজন ও বন্ধু বান্ধবদের মাঝে ইসলামের বানী প্রচার করা শুরু করেন। তাঁর আহবানে সাঁড়া দানকারী প্রথম ব্যক্তি খাদিজা। এরপর ধীরে ধীরে হযরত আলী রা., হযরত আবু বকর রা. সহ আরো অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করেন।

এরপর আল্লাহ তায়ালা আয়াত নাজিল করলেন প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের জন্য। রাসূল সা. সাফা পাহাড়ের উপরে আরোহন করে লোকদেরকে একত্রিত করে বললেন আমি তোমাদেরকে এক ভয়াবহ আযাবের ব্যাপারে সতর্ক করছি। অর্থাৎ তাদেরকে দ্বীনে ইসলামের ছায়াতলে আসার আহবান জানান। তারপর থেকে কাফের সম্প্রদায় মুহাম্মদ সা. এর পেছনে লেগে গেলো। তারা নানাভাবে তাঁর সাথে সমোঝোতা করতে চাইলেও তিনি তাঁর জায়গা থেকে এক চুলও নড়েন নি।

ধীরে ধীরে অনেক সময় অতিবাহিত হলো৷ কাফেরদের নানা জুলুম নির্যাতন অত্যাচার সহ্য করেছেন রাসূল সা.। তায়েফের জমিনে পাথরের আঘাতে তাঁকে রক্তাক্ত করা হয়েছে। তারপরও তিনি এ জাতির হেদায়েতের দোয়া করে গেছেন।

কিছুদিন পরই রাসূল সা. চাচা আবু তালিব প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তিনি পরলোকগমন করেন। তার তিনদিন পরই স্ত্রী খাদিজাও ইন্তেকাল করেন। দুজন আপন মানুষের বিদায়ে রাসূল সা. শোকে কাতর হয়ে পড়লেন। এবার কাফেররা রাসূল সা. এর উপর নির্যাতন অত্যাচার এর মাত্রা বাড়িয়ে দিলো।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে শোকাহত ও দুঃখে কাতর মুহাম্মদ সা. এর জন্য সান্তনা আসে। নবুয়তের দশম বছর ২৭ রজব তারিখে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হযরত জিবরাইলকে পাঠান বোরাক নিয়ে। জিবরাইল আ. রাসূল সা. কে বোরাকে করে মসজিদে হারাম থেকে জেরুজালেমের মসজিদে আকসায় নিয়ে যান। সেখানে সকল নবীগণের উপস্থিতিতে রাসূল সা. নামাজের ইমামতি করেন।

এরপর অন্য একটি বাহনে তিনি আবার চলতে থাকেন। যেতে যেতে প্রত্যেক আসমানে বেশ কয়েকজন নবীদের সাথে তাঁর দেখা হয় এবং সবাই তাঁকে অভিবাদন জানায়। সর্বশেষ প্রিয়নবী সা. সিদরাতুলমুনতাহা অতিক্রম করে আরশে আযীমে পৌঁছে যান। সেখানে মহান আল্লাহর সাথে একান্ত সাক্ষাতে মত্ত হন। জান্নাত জাহান্নাম সহ সৃষ্টির অনেক রহস্যই তাঁকে দেখানো হয়৷ সর্বশেষ ফিরে আসার সময় উম্মতের জন্য ৫ ওয়াক্ত নামাজ হাদিয়া স্বরুপ নিয়ে আসেন। মিরাজের এ ঘটনা শুনার পর মক্কার কাফেররা রাসূল সা. কে নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করা শুরু করে। হযরত আবু বকর রা. সর্বপ্রথম এ ঘটনাটি একাগ্রচিত্তে বিশ্বাস করেন। যেকারণে নবীজি সা. কে সিদ্দিক উপাধি দিয়েছিলেন।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button