জীবনী

লীলা নাগঃ নারী জাগরণের অগ্রদূত এবং দীপ্তিময়ী এক বিপ্লবী নারী

লীলা নাগ! এই নাম টি শুনলে প্রথমেই যে নামটি মাথায় আসে, সেটা হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী লীলা নাগ, এই তথ্যটি কমবেশি সবার জানা। তাঁরই অনুপ্রেরণাতে পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের আগমন ঘটে।

কিন্তু শুধু এই একটি কারণেই নয়, লীলা নাগ তার ঘটনাবহুল সংগ্রামী জীবনের কারণেও বহুলাংশে পরিচিত। তিনি একাধারে একজন সাংবাদিক, জনহিতৈষী ও রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

জন্ম ও পরিবার

লীলা নাগ ১৯০০ সালের ২১শে অক্টোবর, আসাম প্রদেশের গোয়ালপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা রায়বাহাদুর গিরীশচন্দ্র রায় আসাম সরকারের একজন ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন এবং মাতা কুঞ্জলতা নাগ ছিলেন গৃহবধূ। পিতার চাকরির সুবাদে তিনি আসামেই থাকতেন এবং সেখানেই লীলার জন্ম হয়। 

তার পিতৃ পরিবার ছিল সিলেটের মৌলভীবাজারের সংস্কৃতিমনা, শিক্ষিত ও উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবার। পারিবারিকভাবেই তারা ছিলেন স্বদেশ প্রেমের মন্ত্রে দীক্ষিত। এই পরিবারের ছায়াতলে থেকেই তিনি শিক্ষা, রাজনীতি সকল ক্ষেত্রে সমান অবদান রাখতে পেরেছেন। ১৯১৬ সালে, বাবা অবসরগ্রহণ করার পর তিনি আসাম থেকে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৩৯ সালের ১৩ই মে, তিনি ঢাকায় বিপ্লবী নেতা অনিল রায়ের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর তার নামের পর রায় পদবী যুক্ত হয়।

শিক্ষাজীবন 

১৯০৫ সালে,  আসামের দেওগড় বিদ্যালয়ে লীলার শিক্ষাজীবন শুরু হয়। সেখানে দু’বছর পড়াশোনার পর ভর্তি হন কলকাতার ব্রাহ্ম গার্লস স্কুলে। ১৯১১ সালে, তিনি ভর্তি হন ঢাকার ইডেন হাইস্কুলে। ১৯১৭ সালে, পনের টাকা বৃত্তি নিয়ে সাফল্যের সাথে সেখান থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্যে কলকাতার বেথুন কলেজে ভর্তি হন তিনি। 

১৯২১ সালে, বেথুন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করায় ‘পদ্মাবতী’ স্বর্ণপদক লাভ করেন লীলা। সেই বছরেই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আবেদন করেন। কিন্তু তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহশিক্ষার প্রচলন ছিল না। তিনি তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর ডঃ পিজে হার্টজের কাছে আবেদন জানালে তার মেধার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে প্রথম ছাত্রী হিসেবে মাস্টার্স শ্রেণিতে ইংরেজি বিষয়ে ভর্তির সুযোগ দেন। ১৯২৩ সালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় বিভাগে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।

নারীর অগ্রযাত্রায় ভূমিকা 

১৯২৩ সালের ডিসেম্বরে, তার ১২ জন সঙ্গী নিয়ে নারীশিক্ষা প্রসারের মূল উদ্দেশ্য নিয়ে ‘দীপালি সঙ্ঘ’ নামে নারীদের একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন লীলা নাগ। প্রীতিলতার মতো সুপরিচিত নারী বিপ্লবীরাও এই দীপালি সংঘের মাধ্যমেই বিপ্লবের পাঠ নিয়েছিলেন লীলা নাগের কাছ থেকে। এ প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় তিনি ঢাকার ১২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র ও শিল্পশিক্ষা কেন্দ্র গড়ে তোলেন। তার স্থাপিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রথম ইংরেজি বিদ্যালয় ‘দীপালি স্কুল’ যার বর্তমান নাম কামরুন্নেসা গার্লস হাইস্কুল, শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয় এবং আরমানীটোলা বালিকা বিদ্যালয় অন্যতম।

ভারত ভাগের পর লীলা কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে আরো কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ছাত্রীদের সুবিধার জন্য তিনি কলকাতায় একটি মহিলা হোস্টেলও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সাধারণ জনতার পর্যায়ে নারী শিক্ষা প্রসারের জন্য তিনি ‘গণশিক্ষা পরিষদ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছিলেন। ১৯২৭-২৮ সালের বিক্ষুব্ধ বছরগুলিতে, যখন নারীরা শারীরিক আক্রমণের লক্ষ্যে পরিণত হয়, তখন লীলা নাগ ‘মহিলা আত্মরক্ষা ফান্ড’ নামে একটি ফান্ড গঠন করেন। নারীদের প্রতি অন্যায় অত্যাচার রোধকল্পে এবং নারীদের শিক্ষিত করার লক্ষ্যেই তিনি এসকল প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিলেন।

এছাড়াও তৎকালীন প্রভাবশালী সাময়িক পত্রিকা ‘জয়শ্রী’ এর সম্পাদক ছিলেন তিনি। নারীদের দ্বারা স্বতন্ত্রভাবে পরিচালিত এ সাময়িক পত্রিকাটি নারী কর্তৃক লিখিত নিবন্ধাবলি প্রকাশ করত। লবণ সত্যাগ্রহের একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে লীলা ঢাকা মহিলা সত্যাগ্রহ কমিটি গঠন করেন। 

তার এক ক্লাস উপরের ছাত্র ছিলেন সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেন। লীলা নাগ সম্পর্কে তিনি তার স্মৃতিকথা নামক প্রবন্ধ সংকলনে লেখেন, “এর মত সমাজ-সেবিকা ও মর্যাদাময়ী নারী আর দেখি নাই। এর থিওরী হল, নারীদেরও উপার্জনশীলা হতে হবে, নইলে কখনো তারা পুরুষের কাছে মর্যাদা পাবে না।”

রাজনৈতিক অঙ্গনে ভূমিকা 

নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর বক্তব্যে উৎসাহী হয়ে বিপ্লববাদকে পন্থা হিসেবে গ্রহণ করেন লীলা নাগ। সেই উদ্দেশ্যে অনিল রায়ের বিপ্লবী দল ‘শ্রীসংঘে’ যোগ দেন তিনি। ১৯৩০ সালে, অনিল রায়কে প্রেপ্তার করা হলে শ্রীসংঘের দায়িত্ব পুরোটাই এসে পড়ে লীলার উপর।

১৯৩১ সালে, এপ্রিলে পাঁচজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিহত হওয়ায় দুজন তরুণীর দিকে সন্দেহের তীর উঠে। ২০ ডিসেম্বর, এ সন্দেহের জের ধরে লীলা নাগকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর থেকে ১৯৩৭ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত লীলা ঢাকা, রাজশাহী, সিউড়ী, মেদিনীপুর জেল ও হিজলী বন্দিশালায় আটক ছিলেন। ভারতবর্ষে বিনা বিচারে আটক হওয়া প্রথম নারী রাজবন্দী লীলা। তিনি গ্রেফতারের পর তার অনেক নারী সহকর্মীও গ্রেফতার ও বন্দী হন।  কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি আবারো বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পরবর্তীতে আরও অনেকবার কারাভোগ করতে হয় তাকে।

১৯৩৬ সালে, কংগ্রেসের প্রার্থীরূপে সাধারণ নির্বাচনে মনোনয়ন পেলেও ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় প্রতিদ্বন্দিতা করতে পারেননি তিনি। তখন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোসের পরামর্শে ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব নেন।

১৯৪০ সালের জুলাই মাসে, লীলা নাগ ও অনিল রায়কে পুনরায় কারাদন্ড দেওয়া হয়। ১৯৪৬ সালে, জেল থেকে ছাড়া পেলে আবার ‘ফরোয়ার্ড ব্লক’ ও ‘জয়শ্রী’ পত্রিকা চালু করেন এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পরবর্তীতে তিনি স্বামীসহ ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় এসে তার সমর্থকদের নিয়ে ‘ন্যাশনাল উইমেন সলিডারিটি কাউন্সিল’ গঠন করে দুস্থ মহিলাদের পুনর্বাসনের কাজে মনোযোগী হন।

১৯৪৭ সালে, নেতাজির অনুসারী হিসেবে দেশভাগের ‘ন্যাশনাল সার্ভিস ইনস্টিটিউট’ নামক একটি জনকল্যাণমূলক সংগঠনও তিনি স্থাপন করেন। 

জীবনের শেষ সময়গুলো

বিয়ের পর লীলা ও তার স্বামী পূর্ববঙ্গে বসবাস করার সিদ্ধান্ত নিলেও তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকারের কোপানলে তাঁরা ১৯৪৭ সালে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। ১৯৫২ সালে, লীলা রায়ের স্বামী অনিল রায় ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বিয়ের মাত্র ১৩ বছরের মাথায় স্বামীকে হারিয়ে তিনি শারিরীক ও মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েন।

১৯৬৬ সাল থেকে লীলা নাগের স্বাস্থ্যহানি ঘটতে থাকে। ১৯৬৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি, তাকে পি.জি. (বর্তমান বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ২৩ দিন পর সংজ্ঞা ফিরে এলেও বাকশক্তি ফিরে আসেনা তার। ডানদিক সম্পূর্ণ অচল হয়ে যায়। ৪ আগস্ট শেষ সেরিব্রাল আক্রমনে তাঁর সংজ্ঞা লোপ পায়। আড়াই বছর সংজ্ঞাহীন থাকার পর ১৯৭০ সালের ১১ জুন, ভারতে এই মহিয়সী নারীর জীবনাবসান ঘটে।

বাঙালি নারীদের অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে লীলা নাগের ভূমিকা অপরিসীম। তার দেখানো পথেই নারীরা আজ নিজেদের স্বাবলম্ভী হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা শুরু করেছে। তাই আজও তিনি বাংলার নারী সমাজের কাছে পরম পূজনীয় একজন ব্যক্তি। এভাবেই যুগ যুগ ধরে তিনি বেঁচে থাকবেন শত মানুষের হৃদয়ে।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button