আন্তর্জাতিকইতিহাসসংবাদসাম্প্রতিক

বাবরি মসজিদের পর এবার ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীদের লক্ষ্য জ্ঞানব্যাপী মসজিদ

এবার কাশীতে মসজিদের ভেতর মন্দিরের অস্তিত্ব খুঁজতে সার্ভের বিতর্কিত নির্দেশ দেয়ার পর হতে ফের উত্তাল হয়ে উঠেছে ভারত। 

বিশেষজ্ঞরা ভাবছেন এ ঘটনা আবারো অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে। 

ঘটনাটি শুরু হয় বছর দেড়েক আগে। বিজয়শঙ্কর রাস্তোগী নামক এক হিন্দু আইনজীবী এটা দাবি করে রিট করেন যে, কয়েক’শত বৎসর আগে কাশীর বিশ্বনাথ মন্দিরের একাংশ ভেঙে জ্ঞানব্যাপী মসজিদকে গড়ে তোলা হয়েছিল, এখন হিন্দুদের জমি হিন্দুদের ফিরিয়ে দেয়া হোক। 

এরই পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের একটি দেওয়ানি আদলত সম্প্রতি ভারতের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগকে নির্দেষ দিয়ে রায় দিয়েছে , মসজিদটিকে কি আদৌ কোন মন্দির ভেঙে গড়ে তোলা হয়েছিল কিনা সেটি পরীক্ষা করে দেখতে। 

উল্লেখ্য,ভারতের সুপ্রাচীন এবং সবচেয়ে সম্মানিত ভাবা হয়ে থাকা শহর গুলোর একটি এই কাশী। যাকে অবশ্য ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী “নরেন্দ্র মোদীর” সংসদীয় কেন্দ্রও বলা চলে। সে শহরটিতেই হিন্দুদের কাশী বিশ্বনাথ মন্দির ও মুসলিমদের জ্ঞানব্যাপী মসজিদ একেবারে লাগোয়াভাবে দাঁড়িয়ে আছে গত কয়েকশ বছর ধরে। এমনকি দুই ধর্মের এই দুটি উপসনালয়ের মাঝে অভিন্ন দেয়াল পর্যন্ত রয়েছে! 

হিন্দুরা অনেকেই বহুকাল যাবৎ বিশ্বাস করে আসছেন মোঘল বাদশাহ আওরঙ্গজেবের হুকুমেই কাশীর বিশ্বনাথ মন্দিরের একাংশ ভেঙে এ মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী পুরো কাশী জুড়েই শিবের জ্যোতীর্লিঙ্গ মন্দির ছিল। তাই আজ কয়েকশ বছর বাদে এখন তারা নিজেদের জমি নিজেদের কাছে আবারো ফেরত চান! 

ঘটনাটি নিয়ে ইতিমধ্যেই ভারতীয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম উত্তাল হয়ে উঠেছে। ভারতের প্রখ্যাত মুসলিম রাজনীতবিদ আসাদুদ্দীন ওয়াইসি হতে শুরু করে সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড, অল ইন্ডিয়া মুসলিম ল বোর্ড সহ ভারতীয় মুসলিমদের কেন্দ্রীয় নিয়ন্তা সংস্থাগুলো এ রায়কে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এবং একইসাথে এটিকে অযোধ্যার বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ঘটনার পুনরাবৃত্তি বলছেন । 

শুধু মুসলিম নিয়ন্তা সংস্থাগুলোই নয় ভারতীয় ইতিহাসবিদ সহ, বিশেষজ্ঞরাও এটিকে অযোধ্যার ঘটনার ফিল্ড ওয়ার্ক প্রসেস হিসেবে দেখছেন। 

তারা বলছেন,  কাশীর জ্ঞানব্যাপী মসজিদের ঘটনা প্রবাহ বাবরী মসজিদ ঘটনারই স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে। বাবরী মসজিদে ঘটে যাওয়া ঘটনাটিও কট্টর হিন্দুত্ববাদী বিজেপী সরকার পৃষ্ঠপোষকতাতেই  মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। 

৯১ সনে প্রথম বাবরি মসজিদ অবস্থিত উত্তর প্রদেশের ক্ষমতায় আসে বিজেপি সরকার। যার ঠিক বছর খানেক বাদেই ১৯৯২ সনে শিবসেনা ও বিজেপি সমর্থক গোষ্ঠীর তত্বাবধানে ধবংস করা হয় বাবরি মসজিদ, বেধে যায় দাঙ্গা হাজারো মানুষ হতাহত হয়। ১৯৯৮ সনে এবার অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে বিজেপী সরকার পুরো ভারতের ক্ষমতায় আসার পর হতে বাবরী মসজিদ কে কেন্দ্র করে সংহিসতা দিনকেদিন বাড়তেই থাকে, পরিস্থিতির  সংবেদনশীলতার কারণে কিছু দিনের মাঝেই ঘটনাটি ভারতের হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। মাঝে কংগ্রেস সরকার ভারতের ক্ষমতায় এলে আদালতের কার্যপ্রবাহ বারংবার পেছাতে থাকলেও মোদী’র নেতৃত্বে  বিজেপী ভারতের ক্ষমতায় আসলে ফের বাবরী মসজিদ ইস্যু মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। অবশেষে যার শেষ ফলাফল হিসেবে ২০১৯ সনে আদালতের দেয়া রায় অনুযায়ী আজ ভারতের অযোধ্যায় বাবরী মসজিদের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে রাম মন্দির। 

আজ সেখানে মন্দির দাড়িয়ে থাকলেও হিন্দু-মুসলিম এ দাঙ্গা মাঝের দু’দশকে কেড়ে নিয়ে গিয়েছে হাজারো প্রাণ, বিশেষজ্ঞদের মতে ঘটনাক্রম যেভাবে রং বদলাচ্ছে এ ঘটনা সঠিক ভাবে না সামলানো গেলে নিঃসন্দেহে তা ফের ভারত ব্যাপী হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা শুরুর কারণ হয়ে দাঁড়াবে।  

অনেক বিশেষজ্ঞ আবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন ভারতের রাম মন্দির আন্দোলন চলাকালীন সময়ের তখনকার এক প্রখ্যাত হিন্দি স্লোগান সম্পর্কে যার বাংলা করলে দাঁড়ায় ;

“রাম মন্দির ত সবেমাত্র শুরু কাশী-মথুরা ত এখনো বাকি আছে “

ভারতীয় কট্রর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএস এবং বিজেপির কর্মপন্থা দেখলে যেকোন বিশেষজ্ঞই আরো একটি অযোধ্যা ঘটনার পুনরাবৃত্তি’র আশংকা করতেই পারেন। 

এমনকি অনেক বিশেষজ্ঞ ত বলেই ফেলছেন বিজেপি সরকার আবারো হিন্দুত্ববাদের এ নয়া ইস্যুকে তাদের নতুন নির্বাচনী ইশতেহার হিসেবে ব্যবহার করে ভোট বাগাতে যাচ্ছে। 

অবস্থা যাইহোক না কেন, ভারতীয় আদালতের এরকম সংবেদনশীল একটি রায় নিঃসন্দেহে আবারো  ভারতের হিন্দু -মুসলিম সম্পর্কে টানাপোড়েনের কারণ হতে যাচ্ছে। 

মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ খাঁন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) 

আরো পড়ুন;

নাউরো;সকালে ধনী বিকালে ফকির-https://cutt.ly/2cBq8mi

Show More

MK Muhib

A researcher,An analyst,A writer,A social media activist,student at University of dhaka.

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button