জীবনী

ভারতের আলোচিত বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এর জীবনী

অমিত শাহ ভারতের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং একজন আলোচিত রাজনীতিবিদ। যিনি ২০১৪ সালের ৯ জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত ভারতীয় জনতা পার্টির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও ২০১৭ সাল পর্যন্ত গুজরাটের রাজ্যসভা সদস্য ছিলেন তিনি। অমিত শাহকে বিজেপির প্রধান কৌশলী ও এবং নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উত্তর প্রদেশের বাইরে বিজেপির নির্বাচনী প্রচারাভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। 

জন্ম ও পরিবার

আধুনিক যুগের চাণক্য হিসেবে খ্যাত অমিত শাহ ১৯৬৪ সালের ২২ অক্টোবর, ভারতের মুম্বাইয়ে এক গুজরাটি হিন্দু বেনিয়া পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম অমিত অনিলচন্দ্র শাহ। তার বাবার নাম অনিল চন্দ্র শাহ, যিনি পেশায় একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। তার মায়ের নাম শ্রীমতী কুসুমবেন শাহ। সমাজসেবিকা সোনাল শাহের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। এই দম্পতির জয় নামে একটি পুত্রসন্তান রয়েছে। 

প্রাথমিক জীবন 

অমিত শাহ সি ইউ শাহ বিজ্ঞান কলেজ থেকে প্রাণ রসায়ন নিয়ে স্নাতকোত্তর অর্জন করেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি আহমেদাবাদে শেয়ার বাজারের পরামর্শক হিসেবে ও সেখানকার সমবায়ী ব্যাংকে কাজ করেছেন। এর পাশাপাশি বাবার ব্যবসায় কাজ শুরু করেছিলেন।

রাজনৈতিক জীবন 

১৯৮২ সালে, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের মাধ্যমে নরেন্দ্র মোদির সাথে পরিচয় ঘটে তার। ১৯৮৩ সালে, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের ছাত্র শাখা অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের নেতা হিসেবে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন তিনি। ১৯৮৭ সালে, যোগদান করেন বিজিপি তে। তিনি সংগঠনটির ওয়ার্ড সম্পাদক, থানা সম্পাদক, রাজ্য সম্পাদক, সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। দুর্দান্ত পরিচালনার জন্য সবার নজরে আসেন তিনি। 

১৯৯৯ সালে, অমিত শাহ ভারতের সবচেয়ে বড় সমবায় ব্যাংক আহমেদাবাদ জেলা সমবায় ব্যাংকের সভাপতি পদে নির্বাচিত হন। তখন ব্যাংকটি ২৭ কোটি রুপির ক্ষতি নিয়ে দেউলিয়া হবার পথে ছিল। অমিত শাহের আমলে মাত্র এক বছরে ব্যাংকটি ২৭ কোটি রুপি লাভ করে। 

২০০৯ সালে, গুজরাট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি পদে অধিষ্ঠিত হন অমিত শাহ। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে, এই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে মোদি তার প্রভাব খাটিয়ে অমিত শাহকে বড় দায়িত্বে অধিষ্ঠিত করেন। তিনি কেশুভাই প্যাটেলকে অনুরোধ করে অমিত শাহকে গুজরাট রাজ্য আর্থিক সংঘের সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত করান। ১৯৯৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে, অমিত শাহ উপনির্বাচনে জিতে বিধায়ক পদে অধিষ্ঠিত হন। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও সারখেজের বিধায়ক হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি।

২০০১ সালের অক্টোবরে, বিজেপি কেশুভাই প্যাটেলকে শাসনব্যবস্থার অবনতির জন্য অপসারণ করে নরেন্দ্র মোদিকে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী পদে নিযুক্ত করে। এর কয়েক বছরের মাঝে মোদি ও শাহ ধীরে ধীরে তাদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের আড়ালে নিয়ে যান। এরপর ২০০২ সালের গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনে আহমেদাবাদের সারখেজ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন অমিত শাহ। তখন বিপুল ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত হন তিনি। ২০০২ সালের নির্বাচনে জেতার পর তিনি রাজ্য সরকারের সর্বকনিষ্ঠ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই সময়ে তিনি স্বরাষ্ট্র, আইন ও বিচার, কারাগার, সীমান্ত নিরাপত্তা, বেসামরিক প্রতিরক্ষা, আবগারি শুল্ক, পরিবহন, মদ্যপাননিরোধ, রাজ্যরক্ষক বাহিনী, গ্রাম রক্ষক ফল ও বিধানসভা ও সংসদ সংক্রান্ত বিষয়সহ মোট ১২টি বিষয়ের দায়িত্বে ছিলেন। ২০০৭ সালের গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনে তিনি আবার ও সারখেজ থেকে বিধায়ক হিসেবে নির্বাচিত হন।

২০১৪ সালের জুলাই, বিজেপির কেন্দ্রীয় সংসদীয় বোর্ড সর্বসম্মতভাবে অমিত শাহকে বিজেপির সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করে। পুনরায় ২০১৬ সালের ২৪ জানুয়ারি, সর্বসম্মতভাবে বিজেপির সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি।

২০১৯ সালের ৩০ মে, কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন তিনি। পরবর্তীতে ওই বছরের ১ জুলাই, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন অমিত শাহ। 

উল্লেখ্য ১৯৮৯ সাল থেকে অদ্যাবধি অমিত শাহ স্থানীয় সরকারসহ ২৮টি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। ২০১৯ সাল পর্যন্ত, তিনি কোনো নির্বাচনে পরাজিত হন নি।

গ্রেফতার ও নির্বাসন

২০১০ সালের ২৫ জুলাই, অমিত শাহ কে সোহরাবুদ্দিন নামক এক চাঁদাবাজ হত্যা মামলায় গ্রেফতার করা হয়।  তার বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, অপহরণসহ অন্যান্য অভিযোগ আনা হয়। যার কারণে তার রাজনৈতিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গুজরাট সরকারের অনেক মন্ত্রী তার সাথে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করেন।

পরবর্তীতে অমিত শাহকে বলপূর্বক গুজরাট ত্যাগ করে ২০১০ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বাইরের রাজ্যে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সুপ্রিম কোর্ট তাকে জামিন ও গুজরাট প্রবেশের অনুমতি প্রদান করে। এরপর তিনি ২০১২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নারানপুরা থেকে বিধায়ক হিসেবে নির্বাচিত হন।

অমিত শাহ ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ভারতের সবচেয়ে বড় ও রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ উত্তর প্রদেশের দায়িত্বে ছিলেন। 

অন্যান্য অভিযোগ 

অমিত শাহ বিভিন্ন সময়ে নানা কারণে বিতর্কিত হয়েছেন। অনেক গুলো অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোঃ-

 -গুজরাট দাঙ্গা ও ভুয়া এনকাউন্টারের বিরুদ্ধে তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের হয়রানি;

-অমিত শাহকে এক প্রতারকের নিকট থেকে আড়াই কোটি রুপি নিয়ে নিয়ে তাকে জামিন প্রদানের দায়ে অভিযুক্ত করার জন্য এক ডিজিপি কে পুলিশ বিভাগ থেকে গুজরাট রাজ্য ভেড়া ও উল উন্নয়ন বিভাগে বদলি;

– ২০০৯ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত থাকাকালীন সময়ে এক মহিলার প্রতি অবৈধ নজরদারি;

-অতিরিক্ত ডিজিপি আর. বি. শ্রীকুমার যিনি নানাবতী-শাহ কমিশনের নিকট গুজরাট দাঙ্গা সম্পর্কিত প্রমাণ জমা দিয়েছিলেন, তাকে পদোন্নতি হতে বঞ্চিত করা;

– সম্প্রতি শীতলকুচিতে ভারতের কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলি চালনার পিছনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অমিত শাহের চক্রান্ত রয়েছে বলে দাবি করা হয়।

বিশেষ তথ্য

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে, অমিত শাহ ভারতীয় আইনসভায় নাগরিকত্ব সংশোধন আইন পেশ করেন, যা পরবর্তীতে আইনে পরিণত হয়। এতে ২০১৫ সালের পূর্বে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে অবৈধভাবে আসা হিন্দু, খ্রিষ্টান, পার্সি, বৌদ্ধ ও জৈন শরণার্থীদের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রদানের কথা বলা হয়েছে। এই আইনটিকে মুসলমানদের প্রতি বৈষম্যমূলক বলে অভিহিত করছেন অনেকেই।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button