ইতিহাস

ত্বরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধঃ ভারতের মুসলিম শাসনের সূচনা

মাত্র ১ বছর আগেই ত্বরাইনের প্রান্তরে ঘুরী সেনাদের হারিয়ে জয়ী হয়েছিলেন দিল্লী,আজমীর ও পাশ্ববর্তী এলাকার শাসক পৃথ্বীরাজ চৌহান। সেবার যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে আহত অবস্থায় প্রাণ নিয়ে বেঁচে ফিরেছিলেন সুলতান মুহাম্মদ ঘুরী। যাত্রাপথে প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তাদের তাড়া করে রাজপুত সেনারা। এই পরাজয় সহজভাবে নিতে পারেননি মুহাম্মদ ঘুরী। তিনি সুস্থ হবার পর,পণ করেন,দিল্লী দখল করে ছাড়বেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করেন,পৃথ্বীরাজকে না হারানো পর্যন্ত কোন নারী বা বিলাস দ্রব্য স্পর্শ করবেন না। শুরু হয়,তার যুদ্ধযাত্রা।

মুহাম্মদ ঘুরী একটি নতুন সেনা বাহিনী গঠন করা শুরু করেন। যারা আগের সেনাদের চেয়ে ক্ষিপ্র এবং যাদের মবিলিটি বেশি। সেই লক্ষ্য একদল দক্ষ ঘোড়সাওয়ার তীরন্দাজদের নিয়ে আলাদা বাহিনী গঠন করেন। সম্মুখযুদ্ধে রাজপুত সেনাদের পারদর্শীতার কথা বিবেচনা করেই তিনি একদল ‘গোলাম’ সেনাদের নিয়ে আলাদা বাহিনী গঠন করেন।যারা সুলতানের জন্য যে কোন কিছু করতে প্রস্তুত। এই গোলামরা মূলত সুলতানের দাস হলেও,তাদের প্রশিক্ষণ ও সুষম খাদ্য দিয়ে,সুঠামদেহী সম্মুখ সেনায় পরিণত করা হয়েছিল। সবমিলিয়ে তিনি প্রায় ৪০,০০০ সেনার একটি বাহিনী দাঁড় করাতে সক্ষম হন।

অপরদিক গত যুদ্ধের বিজয়,পৃথ্বীরাজ চৌহানের আত্মবিশ্বাস বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি মুহাম্মদ ঘুরীর চিন্তাবাদ দিয়ে অন্য দিকে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে থাকেন। তবে একই সময়,তার নিজের ঘরে শত্রু বাড়তে থাকে। বিশেষত কনৌজের রাজা জয়চান্দের সাথে তার শত্রুতা বৃদ্ধি পায়। এর কারণ হিসেবে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন,আগের যুদ্ধে সাহায্যের বিনিময়ে জয়চান্দ আশা করেছিলেন। পৃথ্বীরাজ তার এক কন্যাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করবেন। কিন্তু পৃথ্বীরাজ তার এই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। এই নিয়ে জয়চান্দ আর তার সম্পর্কে শীতলতা নেমে আসে।

শিল্পীর তুলিতে মুহাম্মদ ঘুরী

১১৯২ খ্রিষ্টাব্দে, রাজপুত সেনারা মুহাম্মদ ঘুরী বাইথান্ড দূর্গ অবরোধ করে। বাইথান্ডের পরেই মুলতান অবস্থিত। দূর্গের সেনারা লম্বা সময় ধরে প্রতিরোধ করে। তবে তাদের খাবার পানি শেষ হয়ে গেলে,তারা গোপনে দূর্গ ছেড়ে পালিয়ে যায়। আর রাজপুত সেনারা সহজেই দূর্গটি দখল করে নেয়। এই ঘটনার পর, পৃথ্বীরাজের আত্মবিশ্বাস আরো বেড়ে যায়। তবে তিনি জানতেন না, মুহাম্মদ ঘুরী এরই মাঝে তার যাত্রা শুরু করে দিয়েছেন। সপ্তাহের ব্যবধানেই তারা বাইথান্ডে এসে পৌঁছায়। আর এই বিশাল সেনাবহর দেখে রাজপুত সেনারা দূর্গ ছেঁড়ে পালিয়ে যায়। অতি আত্মবিশ্বাসের কারণে,কোন ধরনের স্কাউট বা সীমান্তরক্ষী মোতায়েন করেননি পৃথ্বীরাজ। যদি করতেন তবে অনেক আগেই মুহাম্মদ ঘুরীর যুদ্ধযাত্রার খোঁজ পেয়ে যেতেন। মুহাম্মদ ঘুরী আগের পথ ধরেই, ত্বরাইনের কাছে এসে পৌছান। আর তড়িঘড়ি করে সংগ্রহ করা এক বিশাল সেনাদল নিয়ে হাজির হন পৃথ্বীরাজ চৌহান।

রাজপুত সেনারা সংখ্যায় ছিল প্রায় ১,২০,০০০।সাথে অন্তত ১০,০০০ ঘোড়া ও ৩০০ রণহাতি ছিল। তবে তাদের মধ্যে ছিলেন অনেক সেনানায়ক,গোত্রপ্রধান। কনৌজ থেকে জয়চান্দ এবার যোগ দেননি। পৃথ্বীরাজের কয়েকজন জেনারেলও অন্য ফ্রন্টে থাকায় সময়মত পৌঁছাতে পারেননি। তাই,বিশাল সেনাদল থাকা সত্বেও তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ছিল। যুদ্ধের আগের দিন, পৃথ্বীরাজ মুহাম্মদ ঘুরীকে বেশ কড়া ভাষায় একটি পত্র প্রেরণ করেন। সেখানে তিনি বলেন,“ঘুরের সুলতান,তোমার হয়ত নিজের জীবনের প্রতি মায়া নেই। তবে তোমার সেনাদের কথা ভেবে হলেও,তুমি এখান থেকে চলে যাও। নয়তো আমার দুর্দান্ত সেনারা তোমাদের কেটে টুকরো টুকরো করবে। আমাদের বিশালাকার রণহাতির পায়ের চাপায় পিষ্ট হয়ে যাবে।”

সুলতান মুহাম্মদ ঘুরী এই পত্রের বিষয়ে কোন প্রতিক্রিয়া দেখাননি। রাতের আঁধারে একদল সেনা,রাজপুতদের দৃষ্টি এড়িয়ে ত্বরাইনের পাশের জঙ্গলে এসে আশ্রয় নেয়। রাত গভীর হলে,তারা রাজপুত শিবিরে হামলা চালায়। ঘুমন্ত রাজপুত সেনারা কিছু বুঝে উঠার আগেই,একদল ঘুর সেনা তাদের রসদে আগুন ধরিয়ে দিয়ে চলে যায়।

পরদিন বিধ্বস্ত শিবির থেকে যুদ্ধ যাত্রা শুরু করে রাজপুতরা।তবে এবার কৌশল বদল করেন মুহাম্মদ ঘুরী। তিনি একদল ঘোড়সাওয়ার তীরন্দাজ পাঠান। তারা জঙ্গলের কভারে তীর ছুঁড়ে আবার নিজেদের অক্ষে ফিরে আসে। এভাবে একের পর এক দল পাঠাতে থাকেন মুহাম্মদ ঘুরী। রাজপুত সেনারা তাদের তাড়া করে। তবে তাদের নাগালে আসার আগেই,ঘুরী সেনারা পালিয়ে যায়। এভাবে সারাদিন কয়েকদফা ধাওয়া করার পর,রাজপুত সেনারা ক্লান্ত হয়ে যেতে শুরু করে। শত্রুর ছোঁড়া তীরে তাদের অনেকেই প্রাণ হারায়। দিনের শেষভাগে তীর শেষ হয়ে আসতে নিলে,মুহাম্মদ ঘুরী আক্রমণের নির্দেশ দেন। রাজপুত সেনারা এর অপেক্ষায় ছিল। শুরু হয় দু’পক্ষের দ্বন্দ যুদ্ধ।

গোলাম সেনা

দ্বন্দ যুদ্ধের বিশেষ পারদর্শী রাজপুতদের আক্রমণের মুখে ঘুর সেনারা বেশ বিপদে পড়ে। তবে তারা দাঁত চেপে যুদ্ধ করতে থাকে। ঘুর সেনাদের চাপে পড়তে দেখে,অতি আত্মবিশ্বাসী পৃথ্বীরাজ তার সব সেনাদের ঘুরীদের দুপাশ দিয়ে ঘিরে ধরতে চেষ্টা করেন।এতে তার মাঝখান ফাঁকা হয়ে যান। এর অপেক্ষাতেই ছিলেন মুহাম্মদ ঘুরী। তিনি সাথে সাথেই তার গোলাম সেনাদের পাঠিয়ে দেন। সুঠামদেহী আর তাজা সেনারা দ্রুতগামী ঘোড়ায় চেপে প্রবল গতিতে রাজপুতদের উপর ভেঙ্গে পড়ে। ঐতিহাসিকদের মত, তারা এক অর্থে রাজপুতদের কচুকাটা করে দেয়। রাজপুত শিবিরে আতঙ্কের সূত্রপাত হয়। অনেক গোত্রপ্রধান নিজ সেনাদের নিয়ে রণক্ষেত্র থেকে চলে যান। কিছু রাজপুত ঐতিহ্য অনুযায়ী,মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লড়াই করে যান।

পৃথ্বীরাজ চৌহান যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে ঘোড়ায় চড়ে পালিয়ে যান। তাকে ত্বরাইনের কাছে সুরসুতী জেলায় বন্দি করে ঘুর সেনারা। পরবর্তীতে তার শিরচ্ছেদ করা হয়। তবে মধ্যযুগের অনেক সূত্র দাবী করে, তাকে ঘুরের করদ শাসক হিসেবে বাঁচিয়ে রাখার ইচ্ছে ছিল মুহাম্মদ ঘুরীর। এজন্য বন্দি অবস্থায় তাকে আজমীরে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু সে কিছুদিন পর, বিশ্বাসঘাতকতা করলে,তাকে হত্যা করা হয়।

মাত্র ১০০ বছর স্থায়ী ঘুর সাম্রাজ্য তার জয়রথ জারি রাখে। একটা সময় পুরো উপমহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল তাদের দখলে চলে যায়। আর এভাবেই ত্বরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধের মাধ্যমে উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের সুচনা হয়।   

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button